বিলেতে বাংলা আবৃত্তির সমাদর বাড়ছে


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

 উদয় শঙ্কর দাশ

 

এখনো মনে আছে মাত্র সাত বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটি মঞ্চে আবৃত্তি করেছিলাম। বাবা শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর থেকে আবৃত্তির প্রতিএকটা ভালোলাগা জন্মে উঠেছিল  স্কুলে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানেছড়া   কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করলাম নিয়মিতসেটাই শুরু, তারপর থেকেই আবৃত্তির সঙ্গে গড়ে উঠল একনিবিড় সম্পর্ক যা এখনো অটুট

আমি মনে করি আবৃত্তি একটা বিশাল বিষয়, তাই আবৃত্তির কয়েকটা মাত্র দিক নিয়ে খুব সংক্ষেপে আমার কিছু চিন্তাভাবনা এখানে তুলে ধরবো। সেই সঙ্গে থাকবে এই সব বিষয়ে গুণীজনদের কথাও।

টা মানতে হবে যে আবৃত্তি একটা সৃজনশীল  প্রয়োগশিল্প। আবৃত্তি সত্যি কোনো শিল্পমাধ্যম কী না সেই আলোচনা পরে। যে কোনো প্রয়োগশিল্পে কিছু উপাদান থাকেই। কবিতা সৃষ্টির বেলায় তার উপাদান হল শব্দ, তেমনি  আবৃত্তিকারের বেলায় সেই উপাদান কন্ঠস্বর। এই বিষয়ে উৎপল কুণ্ডু লিখেছেন , আবৃত্তির ক্ষেত্রে কবিতার ভাব ও ছন্দের গণ্ডির মধ্যে তার একটা মাপ আছে, সেটা ঠিক রাখতে গেলে প্রথমেই স্বরকে দখলে আনতে হবে, চিনতে হবে, খুঁজে দেখতে হবে কোথায় কোন স্বরের প্রয়োগ যথোপযুক্ত ……প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রয়োগের ভাণ্ডার বাড়ানো যায়, তার আগে স্বরকে তার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কৌশলটা আয়ত্ত করতে হবে

আবৃত্তির মূল শর্ত শুদ্ধ উচ্চারণ শিক্ষা, এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলা উচ্চারণের নিয়মগুলো কিন্তু তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। অনেক শব্দের উচ্চারণ আমরা অজান্তেই সঠিকভাবেই করি। কিন্তু মূল নিয়মগুলি যদি শিখে নিয়মিত চর্চা করি এবং আবৃত্তি করার সময় প্রয়োগ করি, তাহলে কাজটা অনেক বেশি সহজ হয়ে যায়এই দিকটাই নজর দেয়া সব আবৃত্তিশিল্পীর প্রধান কাজ বলে আমি মনে করি।

 আবৃত্তি শিল্প কী না, আবৃত্তিকার শিল্পী কী না, এ নিয়ে বিতর্ক হতে দেখি। অনেক খ্যাতিমান আবৃত্তিকারের কণ্ঠে যখন আবৃত্তি শুনে মুগ্ধ হই তখন মনে হয়, এটা এমন একটা অভিজ্ঞতা যা আগে কখনো হয়নিএকজন ভালো কণ্ঠশিল্পী হতে যেমন বোধ, সাধনা, অধ্যাবশায়, অনুশীলনের দরকার তেমনি আবৃত্তির বেলায়ও এইগুলির প্রয়োজন রয়েছেশুধু সুকণ্ঠের অধিকারী হলেই আবৃত্তিকে শিল্পের স্তরে নিয়ে যাওয়া যাবেনা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “কবিতা নির্বাচন, কবিতা নিজে বুঝে নেওয়া ও তার পুন:রচনা করার যোগ্যতা অবশ্যই আয়ত্তে থাকা চাই …… একজন কবির মতই আবৃত্তিকার তা নিজের মধ্যে ধরে নেবেন ……… হাত পা ছুঁড়ে, গলায় বিকট আওয়াজ তুলে একশ্রেণীর আবৃত্তিকার আসর জমান, তারা ধরে নেন আবৃত্তিও নাটকসুতরাং, আবৃত্তিকে শিল্পের মর্যাদা দিতে হলে আবৃত্তিকারদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যে কোনো শিল্প বা শিল্পীরই জনপ্রিয় হবার অবকাশ  রয়েছে। অমিয় চট্টোপাধ্যায়ের মতে, “ প্রয়োগকৌশলে বৈচিত্র আনতে পারলে এবং সমকালীন শিল্প প্রেক্ষাপটকে স্বীকার করে নিয়ে বিশিষ্টতা রচনা করতে পারলে আবৃত্তিশিল্পের মর্যাদা বা জনপ্রিয়তা বাড়তে পারে……”।

পাঠ না আবৃত্তি ? এই প্রশ্নটা অনেকবার শুনেছিবই দেখে আবৃত্তি না কি মুখস্থ করে? এই প্রশ্নও। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলছেন,”পাঠ আর আবৃত্তি বোধহয় আদতে কবিতা পড়ার রীতির তফাৎ। তবে যখন স্মৃতির থেকে কবিতা বলি একটি ব্যক্তিগত সুবিধা আমি নিজে অনুভব করি তখন কবিতার অর্থের কাছে মন যেন আরও তাড়াতাড়ি  পৌঁছায়”। একই বিষয়ে আরেকজন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় অন্য মত পোষণ করেন। তাঁর মতে, অনেক আবৃত্তিকার  “স্মৃতির প্রতারণায় পড়ে কখনো দু’একটা শব্দ বা কখনো দু’একটা পঙতি বাদ দিয়ে যান, আবার কখনো নিজের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব খাটিয়ে বিস্মৃতি-ধ্বস্ত শব্দ বা পঙতির বিকল্প হিসেবে সে মুহূর্তে যা মনে পড়ে যায় তা-ই দিয়ে শুন্যস্থান ভরাট করে নেন”। তাঁর মতে বই-খাতার সাহায্য নেয়া শ্রেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমিও এই মতে বিশ্বাসী, বই-খাতা হাতে থাকলে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করি। দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আরও  বলছেন, “বই-খাতা যদি হাতে থাকে, স্মৃতিস্খলনের ভয় যদি না থাকে তাহলে আবৃত্তিকার পরম নিশ্চিন্তে আবৃত্তির রকমফের করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে সাহসী হতে পারেন। সর্বোপরি, একজন নিপুণ আবৃত্তিকারের পাঠে আর আবৃত্তিতে তফাৎ থাকে না, তাঁর কাছে সম্যক বোধযুক্ত পাঠই আবৃত্তি”

সবশেষে, বিলেতে আবৃত্তি-চর্চা নিয়ে দু-একটা কথা। ১৯৭৫ সনে পড়াশুনার জন্য লন্ডনে আসার পর, প্রথম কয়েক বছর তাই নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। আশির দশকের গোড়ার দিকে এখানকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। ট্রাফাল্গার স্কোয়ারে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠান পরিচালনা, আবৃত্তি, নাটক ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনা-সহ বিভিন্ন  সাংস্কৃতিক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে শুরু করি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তখন আবৃত্তি করার মত লোক ছিল হাতে গোণা কয়েকজন। তবুও আশির দশকের শেষের দিকে  সম্মেলক আবৃত্তি করার মত সাহস করেছিলাম। এরপর, আবৃত্তিতে উৎসাহী বেশ কিছু লোক এলেন বিলেতে। আবৃত্তির প্রসার ঘটতে থাকলো। খুব উৎসাহিত বোধ কোরলাম। ভাবতে অবাক লাগে, দর্শনীর বিনিময়ে আবৃত্তি অনুষ্ঠান করেছি লন্ডনে আজ থেকে বলতে গেলে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। আর এখন তো লন্ডন এবং অন্যান্য শহরেও আবৃত্তি সংগঠন গড়ে উঠেছে। আবৃত্তির অনুষ্ঠান উপভোগ করেন মিলনায়তন ভর্তি দর্শকশ্রোতা। হচ্ছে আবৃত্তি উৎসবও। তাদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।

আনন্দের কথা, বিলেতে বাংলা আবৃত্তি এখন সমাদহচ্ছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকবে, মান সম্পন্ন ও শুদ্ধ আবৃত্তি-চর্চার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে এই বিশ্বাস আমার জন্মেছে।

 

(লেখক:  সিনিয়র সাংবাদিক, সত্যবাণীর কন্ট্রিবিউটিং কলামিষ্ট। চার দশক ধরে বিলেতে বাংলা সংস্কৃতি চর্চায় সম্পৃক্ত।)

 

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.