বিদেশে স্বদেশ চাষ: লন্ডনে বইমেলা শুরু


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
সত্যবাণী

লন্ডন: সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে যে টুকরো টুকরো বাংলাদেশ, সেগুলোর পারস্পরিক সংযোগ সৃষ্টি করে দেয় যে মাধ্যম সেটি হলে বই, বইমেলা। প্রবাসে বইমেলা বা সাংস্কৃতিক উৎসব অনেকটা বিদেশের মাটিতে স্বদেশের চাষের মত। এই চাষ ফলন কেমন দেবে, সেটি কোন বিষয় নয়। এর মাধ্যমে ভেতর থেকে উঠে আসে এমন একটি  অনুভূতি, যা তারিয়ে তারিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা নিজ বাসভূমিতে।

সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে রবিবার লন্ডনে শুরু হওয়া ৯ম বাংলাদেশ বইমেলা ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক উৎসবে ভেতর থেকে উঠে আসা এমন অনুভূতি নিয়েই জড়ো হয়েছিলেন শিকড় প্রেমিক প্রবাসীরা।

জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে উৎসর্গকৃত এই মেলায় অংশ নিয়েছে বাংলা একাডেমি, আগামী প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, আহমেদ পাবলিশিং হাউস, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, অনিন্দ্য প্রকাশ, উৎস প্রকাশন, অনার্য পাবলিকেশন্স, পরিজাত প্রকাশনী, পুঁথিনিলয়, নালন্দা, শব্দশৈলী, বাসিয়া প্রকাশনী এবং পাণ্ডুলিপি প্রকাশনসহ বাংলাদেশের মোট ১৪টি প্রকাশনা সংস্থা। রয়েছে বিলাতের বঙ্গবন্ধু বইমেলা, প্রবাস প্রকাশনী, মেট্রোমেঘ, কবিতাস্বজন, স্পন্দনসহ বেশকিছু স্টল। বাংলাদেশ হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’।

বাংলাদেশ হাই কমিশনের ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’ বইমেলায় যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। ৯ম এই বইমেলার উদ্বোধনের সাথে সাথেই মেলার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’। আগত দর্শকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের এবং তার জীবন ও কর্মের ওপর লেখা বিভিন্ন বই গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখেন। বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পোস্টার ও ব্যানারে সাজানো এই স্টলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা বইগুলোও প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। দর্শকরা এসব বই কেনার ও সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশকের তথ্য এই স্টল থেকে নেন।

স্থানীয় সময় দুপুরে পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিংবদন্তী সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভিডিও ম্যাসেজের মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি, ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী, লেখক ড. শাহাদুজ্জামান, আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গণি, সাবেক সরকারী কর্মকর্তা খোন্দকার রাশিদুল হক ও কবি শামীম আজাদ সহ অন্যান্য অতিথিরা। এরপর সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি ফারুক আহমেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বুলবুলের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা ছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কার্যকরী কমিটির সদস্য ড. মুকিদ চৌধুরী, প্রবীন সাংবাদিক ইসহাক কাজল, আবুল কালাম আজাদ ছোটন, একেএম আব্দুল্লাহ, কাউন্সিলার সায়েমা আহমেদ ও কাউন্সিলার সুহেল আমীন প্রমূখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, বাংলা ভূখন্ডের বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে ধরে রাখা ও এর প্রসারে অভিবাসী বাংলাদেশীরা যেভাবে ভূমিকা রাখছেন, তাতে বাংলা ভাষা ও বই যে কখনও হারিয়ে যাবেনা এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে তাঁর উদ্দেশ্যে উত্তাপিত দাবী দাওয়া সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি জানান, লন্ডনে কমিউনিটি লাইব্রেরীতে বাংলাদেশের জন্য একটি কর্ণার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই কর্ণারে আগামী প্রকাশণীর কর্ণধার ওসমান গণি ৫লক্ষ টাকার বই প্রদান করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মন্ত্রী জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের বাইরে সবচেয়ে বড় প্রোগ্রাম লন্ডনে করার পরিকল্পনার কথাও জানান তাঁর বক্তৃতায়।

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই ধরনের মেলায় হাই কমিশনের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু প্যাভেলিয়ন’ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন আগামী বছর বাংলাদেশ ও অন্যান্য  দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যেও বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী পালন করা হবে।’ বইমেলায় বঙ্গবন্ধু কর্ণারতারই একটা পূর্ব প্রস্তুতি বলা যায়। তিনি বইমেলার আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান এবং যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষা সংস্কৃতি প্রসারে অভিবাসী বাংলাদেশিরা যে ভূমিকা রেখে চলেছেন তার প্রশংসা করেন

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী বই মেলার সাফল্য কামনা করে বলেন, বই মানুষকে জীবন্ত রাখে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখে বই। দেশের বাইরে আয়োজিত এমন একটি বইমেলায় অংশ নিতে পেরে আমি আপ্লুত।

ড. শাহাদুজ্জামান বলেন, সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টুকরো টুকরো বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন আমাদের প্রবাসী বাঙালিরা। প্রবাস জীবনের নানা চড়াই উতরাইয়ের মধ্যেও প্রবাসীরা যে হৃদয়ে দেশকে ধারণ করে রেখেছেন, তারই প্রমান আজকের এই বইমেলা। তিনি বলেন, যারা লেখেন তাদের কাজই হচ্ছে অক্ষর দিয়ে একটি দ্বিতীয় জীবন তৈরী করা। ব্রিটেনে বসবাসরত আমাদের লেখকরাও ঠিক সেই দ্বিতীয় জীবনই তৈরী করছেন।

প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আগামীর কর্ণধার ওসমান গণি তাঁর বক্তৃতায় ‘আগামী প্রকাশনী আব্দুর রউফ চৌধুরী পদক’ প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়ে প্রথমবারের মত কিংবদন্তী সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীকে এই পদকে ভূষিত করেন। এসময় তাঁর পাশে ছিলেন আব্দুর রউফ চৌধুরীর ছেলে ড. মুকিদ চৌধুরী। ঐদিন বিকেলেই  সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও হাই কমিশনার হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ্য আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর হাতে তুলে দেন ‘আগামী প্রকাশনী আব্দুর রউফ চৌধুরী পদক’।

অন্যান্য বক্তা বলেন, মানবিক গুণের বিকাশের স্বার্থেই দরকার মননের চর্চ্চা। এই চর্চ্চার পথে, বই পড়া খুব দরকারী। লন্ডনে আয়োজিত এই বইমেলা মনন চর্চার সেই সুযোগই সৃষ্টি করেছে প্রবাসীদের জন্য।

তারা বলেন, ‘অনেকে মনে করেন আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বইয়ের প্রয়োজনীতা কমে গেছে। আসলে সেটি ঠিক নয়।  জ্ঞানের অন্বেষণের জন্য বইয়ের আবেদন থাকবে এবং থাকবে। বইয়ের বিকল্প শুধু বই। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসারে ব্রিটেনের বাংলাদেশী কমিউনিটির অবিরাম চেষ্টার প্রশংসা করে তারা বলেন, ব্রিটেনের মত দেশে বাংলাদেশ বই মেলার মত এমন একটি আড়ম্বর আয়োজন আমাদের আরও দীর্ঘদিন বেচেঁ থাকার প্রেরণা জোগাবে।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্যের সভাপতি ফারুক আহমদ বই মেলার বিপুল উপস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে  বলেন, যে উৎসবের সাথে লেখক ও পাঠকের আবেগ অনুভূতি জড়িত তা নিয়ে কোন ব্যবসা চলেনা। মনের তাগিদ থেকেই আমরা আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে বিগত বছরগুলোতে বই মেলা করে এসেছি, ভবিষ্যতেও করবো। মেলা আয়োজনে সহযোগীতা করায় সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

বইমেলার শেষদিন সোমবারের কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে ৩টি সেমিনার। প্রথম সেমিনার শুরু হবে দুপুর বারোটায়। বিষয়: বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে সরকারের পরিকল্পনা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. শেখ মুসলিমা মুন, ডেপুটি সেক্রেটারী, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। দ্বিতীয় সেমিনার শুরু হবে বিকেল ২:৩০ মিনিটে। বিষয়: অনাবাসী সাহিত্য। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিলেতবাসী কবি হামিদ মোহাম্মদ। তৃতীয় সেমিনার শুরু হবে বিকেল ৩:৩০ মিনিটে। বিষয়: লেখক ও প্রকাশক সম্পর্ক। সেমিনার ৩টিতে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করবেন ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী, ড. শাহাদুজ্জামান, শামীম আজাদ, নঈম নিজাম, ওসমান গণি, ড. মুকিদ চৌধুরী, এমাদদুল হক চৌধুরী ও মিলটন রহমান।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.