লন্ডনের বাতাসে বাংলার সুবাস: শেষ হলো দুই দিনের বইমেলা


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
সত্যবাণী

লন্ডন: প্রবাসের বাতাসে বাংলা ও বাংলা বইয়ের  সুবাস ছড়িয়ে  শেষ হয়েছে লন্ডনের ২দিনব্যাপী বইমেলা, আত্মার তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরেছেন বাংলা প্রেমী প্রবাসীরা।

আপাত দৃষ্টিতে এই বঙ্গমেলা সাঙ্গ হলেও, মূলত এটি হলো বছর পরে আরেকটি মেলার অপেক্ষার শুরু। বাংলা বইয়ের সমাগম যে মেলায় তাকে  বাঙালী, বাংলাদেশ বা বঙ্গের মেলাতো বলাই যায়। রবি ও সোমবার এই দুদিন মেলায় আগতরা ছুটিয়ে প্রেম করেছেন। এই প্রেম বইয়ের সাথে পাঠকদের প্রেম। এই প্রেম বঙ্গের সাথে প্রবাসী বাঙালির প্রেম, যে প্রেম তাদের তারিয়ে নিয়ে গেছে ফেলে আসা নিজ বাসভূমে।

বইপ্রেমি মানুষ, কবি, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মীদের পদভারে রবি ও সোমবার পুরো দুটো দিনই মূখরিত ছিলো বাংলা টাউনের ব্রাডি সেন্টারে আয়োজিত বাংলাদেশ বইমেলা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব’২০১৯।

মেলা শেষে লাভ-ক্ষতির হিসেব না কষেই বাংলাদেশ থেকে আগত প্রকাশকরা বলছেন ‘আমরা সন্তুষ্ট। এমন একটি প্রাণের মেলায় আত্মার সন্তুষ্টি লাভের হিসেবই কষতে হয়, ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসেব নয়। প্রবাসের এই মানুষগুলোর হৃদয় উজার করা ভালোবাসার লোভে হলেও আমরা বারবার  আসতে চাই এই মেলায়’। মেলা কর্তৃপক্ষ ও প্রকাশকদের কাছ থেকে জানা গেছে বই বিক্রি ভালোই হয়েছে।

সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্য আয়োজিত দুইদিনব্যাপী এই মেলার শেষদিন সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি সেমিনার। প্রথম সেমিনারের বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে সরকারের পরিকল্পনা। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি ড. শেখ মুসলিমা মুন। দ্বিতীয় সেমিনারের বিষয় ছিল অনাবাসী সাহিত্য। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হামিদ মোহাম্মদ। আর তৃতীয় সেমিনারের বিষয় ছিল লেখক ও প্রকাশক সম্পর্ক। সেমিনার তিনটিতে আলোচনায় অংশ নেন ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী, ড. শাহাদুজ্জামান, শামীম আজাদ, ওসমান গণি, ড. মুকিদ চৌধুরী, এমদাদুল হক চৌধুরী ও মিলটন রহমান।

সেমিনারের পাশাপাশি সারাদিনই চলে কবিদের কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গুচ্ছ গুচ্ছ আড্ডা। মেলায় দীর্ঘদিন পর দেখা হয় এক বন্ধুর সাথে আরেক বন্ধুর। আড্ডায় বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল নিয়ে স্মৃতি রুমন্থন করেন প্রবীন কবি সাহিত্যিকরা।

সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে অতিথি আলোচকরা বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতা ও কষ্ট অতিক্রম করে মেলায় এসে একটি বিষয় উপলব্ধি করেছি যে, বাংলাদেশ আজ আর শুধু বাংলাদেশের মধ্যে নেই। পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বাঙালীর এই দেশটি। এই উপলব্ধি এবারের মেলায় আমাদের পরম পাওয়া’।

তারা বলেন, অনেক বড় বড় অনুষ্ঠানে আলোচনার সুযোগ হয়েছে, সেগুলোতে দর্শক-স্রুোতা দেখেছি হাতেগোনা। কিন্তু লন্ডনের মত জায়গায় আজ যখন দেখি সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা ও কবিতা পাঠের প্রতিটি পর্বে শতাধিক মানুষের উপস্থিতি, তখন উৎফুল্ল হই, বই সাথে নিয়ে আরো দীর্ঘদিন বাঁচার ইচ্ছে হয়। এবারের লন্ডন বইমেলা থেকে আমরা বেঁচে থাকার সেই ফুয়েলই নিয়ে যাচ্ছি’।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্যের সভাপতি ফারুক আহমেদ সত্যবাণীকে বলেন,  ‘প্রতিটি মেলার সফলতা আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রবাসের বইপ্রেমী মানুষ ও বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কবি-সাহিত্যিকদের এমন একটি মিলন মেলা প্রতি বছরই যাতে অনুষ্ঠিত হয় সেই গুরুদায়িত্বই যেন সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, যুক্তরাজ্যের কাঁধে তুলে দিয়ে গেলেন এবারের মেলায় আগতরা। এই দায়িত্ব পালনে সকলের সহযোগিতা কামনা করি’।

এর আগে রবিবার স্থানীয় সময় দুপুরে পূর্ব লন্ডনের ব্রাডি আর্টস সেন্টারে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিংবদন্তী সাংবাদিক আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর ভিডিও ম্যাসেজের মাধ্যমে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ এমপি, ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী, লেখক ড. শাহাদুজ্জামান, আগামী প্রকাশনীর কর্ণধার ওসমান গণি, সাবেক সরকারী কর্মকর্তা খোন্দকার রাশিদুল হক ও কবি শামীম আজাদ সহ অন্যান্য অতিথিরা। এরপর সম্মিলিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সভাপতি ফারুক আহমেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বুলবুলের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা ছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কার্যকরী কমিটির সদস্য ড. মুকিদ চৌধুরী, প্রবীন সাংবাদিক ইসহাক কাজল, আবুল কালাম আজাদ ছোটন, একেএম আব্দুল্লাহ, কাউন্সিলার সায়েমা আহমেদ ও কাউন্সিলার সুহেল আমীন প্রমূখ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, বাংলা ভূখন্ডের বাইরেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রসারে অভিবাসী বাংলাদেশিরা যেভাবে ভূমিকা রাখছেন, তাতে বাংলা ভাষা ও বই যে কখনো হারিয়ে যাবে না এটি নিশ্চিত করে বলা যায়। যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই ধরনের মেলায় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু প্যাভেলিয়ন’ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৯টায় মেলা সমাপ্তির সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও বইপ্রেমীরা যেন হল ত্যাগ করতেই চাচ্ছিলেননা। হল কর্তৃপক্ষের চাপে শেষ পর্যন্ত বাড়ীর পথ ধরতে হয় সবাইকে। 

দুই দিনব্যাপী এই বইমেলাকে ঘিরে কমিউনিটিতে তৈরি হয় ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য। ব্রিটেনে বিভিন্ন শহর থেকে ছুটে আসেন বইপ্রেমীরা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে উৎসর্গকৃত এবারের বইমেলায় অংশ নেয় বাংলা একাডেমি, আগামী প্রকাশনী, অন্যপ্রকাশ, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশসহ বাংলাদেশের মোট ১৪টি প্রকাশনা সংস্থা।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে মেলায় ছিল ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’। ‘বইমেলার’ উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে মেলার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’। আগত দর্শকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের এবং তার জীবন ও কর্মের ওপর লেখা বিভিন্ন বই গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখেন।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.