ছান্দসিকের পরিবেশনায় একাত্তরে চা বাগানের নারকীয় গণহত্যা


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান
বার্তা সম্পাদক, সত্যবাণী

লন্ডন : অলীক কল্পনার জাল বুনে দোলাচলে চলেছেন সকিনা আবদাল, স্বামী কি ফিরবে না কি ফিরবেনা? ৪৮ বছর আগে লাক্কাতুরা চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক ছিলেন সিরাজুল আবদাল। দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালের মে মাসে পাক হানাদার বাহিনী সিরাজুল আবদালকে ধরে নিয়ে যায় বন্দিশালায়, সেখানে চালায় অমানষিক নির্যাতন। বন্দি থাকাকালীন সময়ে আবদালের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আহত সেনাদের চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন মিটানো হতো। একাত্তরের ১৯শে মে আবদালকে চোখ বেঁধে বন্দীশালা থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। আর কোন খবর পাওয়া যায়নি আবদালের। এইরকম বহু পরিবারের মত আবদালের স্ত্রী সকিনা আজও স্বামীর অপেক্ষায় আছে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সাংবাদিক অপূর্ব শর্মার ‘চা বাগানে গণহত্যা-১৯৭১‘ গ্রন্থ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পাঠ করেছেন ছান্দসিকের কর্ণধার বাচিক শিল্পী মুনীরা পারভীন। আলোচনা, আবৃত্তি ও গানের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের হানাদারদের নৃসংশতাকে তুলে ধরে লন্ডনের আবৃাত্তি সংগঠন ছান্দসিক আবারো দর্শকদের করেছে আবেগতাড়িত।

গত ১৬ নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের কবি নজরুল সেন্টারে টাওয়ার হ্যামলেটস এর সিজন অব বাংলা ড্রামার আয়োজনে ছান্দসিক পরিবেশন করেছে “জেনসাইড ইন টি এস্টেটস ইন নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান“। গত পহেলা নভেম্বর শুরু হওয়া মাসব্যাপী এই নাট্য উৎসব চলবে আগামী ২৪ শে নভেম্বর পর্যন্ত। মুনিরা পারভীনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন গবেষক অপূর্ব শর্মা, মুক্তিযোদ্ধা ইসহাক কাজল এবং মুক্তিযোদ্ধা আবু মুসা হাসান।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু বছর ধরে গবেষণা করছেন অপূর্ব শর্মা। দীর্ঘ আট বছর গবেষণার ফসল ‘চা বাগানে গণহত্যা-১৯৭১‘ গ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা, তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে লেখার কাজটি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক কষ্ট স্বীকার করে, জীবনের ঝুঁকিকে পরোয়া না করে এই কনটকাকীর্ণ পথ কিভাবে পাড়ি দিয়ে ‘চা বাগানে গণহত্যা-১৯৭১‘ বইতে মুত্তিযুদ্ধে শহীদদের ইতিহাস তুলে ধরেছেন বক্তৃতায় তারই বর্ণনা দিয়েছেন অপূর্ব শর্মা।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দুঃশাসনের মাত্রা বেড়ে গেলে চা শ্রমিকদের মধ্যেও দ্রোহি চেতনার স্ফুরণ ঘটে। অসহযোগ আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী। পাকা হানাদার বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতন নেমে আসে চা বাগানের বাসিন্দাদের উপর, রক্তে লাল হয় চা বাগানের সবুজ ভূমি কিন্তু প্রচারের আলো থেকে বঞ্চিত হয় এখানকার মুক্তিযোদ্ধারা। দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য চা বাগানের যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের অবদানকে তুলে ধরার দায়িত্ব বোধ থেকেই চা বাগানের গণহত্যা নিয়ে বই লিখেছেন। সারা জীবন মুক্তিযুদ্ধকে নিয়েই কাজ করে যাবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন কলমযোদ্ধা অপূর্ব শর্মা।
মুত্তিযুদ্ধের উপর তাঁর “বীরাঙ্গনার কথা“ বই লেখার পটভূমিও তুলে ধরেন অপূর্ব শর্মা। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনাতা যুদ্ধে যে সকল নারীদের উপর নির্মম অত্যাচার হয়েছে তাদেরই একজন সিলেটের প্রভা রাণী। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় অর্ধশত বছর পরেও সেই প্রভা রাণী ও তার সন্তানকে আশেপাশের লোকজন যেভাবে অপমান করছে, সেটা সহ্য করতে পারেননি অপূর্ব শর্মা। তাই বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণা করেন, বই লিখেন। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার বীরাঙ্গণাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই প্রভা রাণী এখন মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাচ্ছেন। অপূর্ব শর্মা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম আমরা। মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে আমাদের একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছে। সেই যুদ্ধে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশী। তারা রণাঙ্গনে যেমন অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, গেরিলা হিসেবে কাজ করেছেন, তেমনি স্বামী-সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে নারীরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অপূর্ব শর্মা বলেন, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করার সুযোগ হয়নি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করছি, কাজ করছি এটাই আমার পরম পাওয়া। চা বাগানের বাসিন্দাদের অনেক বেদনার পাশাপাশি আশার বাণীও শুনিয়েছেন অপূর্ব শর্মা, চা শ্রমিকদের সন্তানেরা এখন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, বিভিন্ন পেশায় কাজ করছে।
চা শ্রমিকদের বিভিন্ন সময়ের আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে সাংবাদিক ইসহাক কাজলের লেথা ‘সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক আন্দোলন : অতীত ও বর্তমান‘ বই প্রকাশিত হয়েছে ২০০৬ সালে। বক্তৃতায় ইসহাক কাজল স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনের সময়ের সস্মৃতিচারনের পাশাপাশি চা বাগানের শ্রমিকদের ইতিহাস তুলে ধরেন। দূর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকা থেকে অভাবগ্রস্থ লোকজনকে এনে বৃটিশ আমলে চা বাগানে কাজ দেয়া হয়। শ্রমিক আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার সুবাধে চা শ্রমিকদের সাথে কাছে থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তার। শ্রমিকদের বঞ্চণা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন উল্লেখ করে ইসহাক কাজল আরো বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চা শ্রমিকদের অনেক অবদান আছে। বহু শ্রমিক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু এই সকল যোদ্ধাদের আত্মদানের স্বীকৃতি নেই। আজো চা বাগানের বাসিন্দাদের অনেকেই নায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত।
মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক আবু মুসা হাসান বলেন, এতক্ষণ ছান্দসিকের পরিবেশনায় ১৯৭১ সালে সিলেটে চা বাগানের বাসিন্দাদের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যে বর্বর নির্যাতনের কাহিনী শুনলাম, সেই ধরনের নির্মমতা সারা দেশেই ঘটেছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলাম তাদের চাইতেও নির্যাতনের শিকার বেশী হয়েছিল দেশের জনগণ। জনগণের সহযোগিতা ছাড়া গেরিলা যুদ্ধ সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহযোগিতা দেবার কারনে এবং যাদের আত্মীয় স্বজন যুদ্ধে গিয়েছে সেই সকল পরিবারের উপর নির্যাতন হয়েছে সবচেয়ে বেশী। বাড়ী-ঘরে আগুন দিয়েছে, মা-বোনদের ধর্ষণ করেছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর। প্রবাসে ছান্দসিক মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়কার নির্যাতনকে বার বার তুলে ধরছে। তিনি বলেন, আশা করি ছান্দসিক তাদের এই উদ্যোগ চালিয়ে যাবে। ছান্দসিক যখন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে আরো কয়েকটা অনুষ্ঠান করেছে প্রতিটিতে আসার সুযোগ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আবৃত্তিগুলো ইংরেজীতে প্রচার করার জন্য মুনিরা পারভিনকে অনুরোধ জানিয়ে আবু মুসা হাসান বলেন, তাহলে বিলেতের নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারবে তাদের মাতৃভূমী বাংলাদেশ কত কষ্টের বিনিময়ে পাওয়া।
গবেষক অপূর্ব শর্মার লেখা ‘চা বাগানে গণহত্যা-১৯৭১‘ গ্রন্থ থেকে সিরাজুল আবদাল ছাড়াও আরো যারা নির্মমতার শিকার হয়েছেন তাদের কাহিনী ছান্দসিকের বাচিক শিল্পীদের বর্ণনায় এসেছে, দর্শক অশ্রুসিক্ত হয়ে তম্ময় হয়ে শুনেছে সেই সব ঘটনা।
খেজুরীছড়া চা বাগানের ফ্যাক্টরীর পাহারাদার ভগি সিং ভূমিজ ছোট্ট দুই মেয়ে গংঙ্গা ও যমুনাকে নিয়ে ফ্যাক্টরির বাইরে বসেছিলেন। দুটি জীপে করে বাগানে আসে পাকিস্তানী আর্মী, ফ্যাক্টরীর চাবি চায় ভূমিজের কাছে। ভূমিজ চাবি দিতে আপত্তি জানালে তার দুই মেয়ে গঙ্গা যমুনাসহ তাকে টেনে হিঁচড়ে হায়েনারা জীপে উঠায়। কিছুদূর নিয়ে দুই মেয়েকে ফেলে কালিঘাটে নিয়ে ভূমিজকে হত্যা করে। মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার অপরাধে বাগানের গিরিন্দ বুনাজী, মনিলাল ঘোষ, হরমুজ তাঁতী, রথি প্রধানসহ আরো অনেককে ধরে নিয়ে একইভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
বাগানের গোপাল সবরের মেয়ে লক্ষ্মী সবরকেও ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনী, রাতভর চলে তার উপর নির্যাতন। লক্ষ্মীর রক্তক্ষরণ শুরু হলে বিবস্ত্র লক্ষ্মীকে ক্যাম্পের বাইরে ফেলে রাখা হয়। সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে লক্ষ্মী। বাগানের বাসিন্দা রাজাকার গফুর মিয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়নি মুরতীয়া কৈরী, তাকে নিয়ে যায় ক্যাম্পে, ল´ীর মতই পরিণতি হয় মুরতীয়া কৈরীর।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে দেওয়াছড়া চা বাগানের কাজকর্ম বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হয় শ্রমিকেরা। দিনটি ছিল একাত্তরের তেশরা মে। মৌলভী বাজারে রেশন দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে বস্তিতে ঢুকে সব যুবকদের আর্মীর গাড়িতে উঠানো হয়। কিছুদূর নিয়েই বাগানের ছোট বাংলোর সামনে সকলকে নামানো হয়। সারিবদ্ধভাবে তাদেরকে দড়ি দিয়ে বেঁধে গুলিতে ঝাঁঝড়া করে দেওয়া হয় তাদের শরীর। ফিনকি দিয়ে বের হতে থাকে রক্ত। ছটফট করতে করতে নিথর হয়ে যায় তাদের শরীর।
এই রকম নৃশংস গণহত্যা ও ধর্ষণের কাহিনীগুলোর বর্ণণা শুনে কবি নজরুল সেন্টারের দর্শকরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। মুনীরা পারভীনসহ যারা আবৃত্তি করেছেন তারা হলেন শতরূপা চৌধুরী, রাজ দাস, সমভা বিশ্বাস, সাবরিনা এনি, তানভীর আহমেদ এবং আমিন খান।
সবশেষে দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেণ অপূর্ব শর্মা ও মুনীরা পারভীন। দুজনই প্রতিশ্রুতি দেন যত বাধাই আসুক, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনাগুলো বারবার সবার সামনে তুলে ধরবেন।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.