নেশা থেকে পেশায় ফেরার প্রত্যাশায় সম্প্রীতি বাংলাদেশের পথ চলা


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

ডা.মামুন-আল-মাহতাব স্বপ্নীল

আপনারা যে ক্লাসমেট সেটাতো জানতাম না’, লাঞ্চের টেবিলে খেতে বসে দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দার কণ্ঠে বিস্ময়!। আমরা যে ঢাকা কলেজের ক্লাসমেট, সেটাতো ভুলে গিয়েছিলাম আমরা নিজেরাই। শ্যামলদার কথাটা শোনার পর থেকে অনেকবার মনে করার চেষ্টা করেছি শেষ কবে আমরা চারজন একসাথে হয়েছিলাম। ৮৭- তে ঢাকা কলেজ ছেড়ে আসার পর চারজনের যোগাযোগ ছিল, কম বেশি, দেখাও হয়েছে বহুবার, কিন্তু এভাবে একসাথে ৮৭-র পর সম্ভবত এই প্রথম। পেশাগত বিভিন্নতা এর একটা বড় কারণ। মনিরুল পুলিশের বড় কর্তা – ‘ফেস অব কাউন্টার টেররিজম ইন বাংলাদেশ’। পিন্টু ডিবিসি টিভির বার্তা প্রধান, দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক আর জাকারিয়া স্বপন এদেশের ইন্টারনেটের জনক। ঢাকা কলেজ ছাড়ার ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর আমাদের চারজনের একসাথে হওয়াটাও সহসা এবং একটু অন্যরকমভাবে। মনিরুলের অফিসের কনফারেন্স হলে উগ্র মৌলবাদ প্রতিরোধে সিভিল সোসাইটির সাথে একটা মতবিনিময় সভা। আমন্ত্রিত অনেক সুধীজনের সাথে তালিকায় আমাদের তিনজনের নামও। কাজেই কাকতালীয়ভাবেই ঢাকা কলেজ ছাড়ার তিন দশকেরও বেশি সময় পর একসাথে আমরা চারজন।

গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্প্রীতি বাংলাদেশের সাথে পথ চলায় আমার যে অভিজ্ঞতা, মনিরুলের অফিসে মত বিনিময়ের সময়ে আর পোস্ট-লাঞ্চ আড্ডাতেও ঘুরেফিরে শেয়ার করছিলাম সেটা। আপাতদৃষ্টিতে ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ আর দশটি সংগঠনের মতই একটি সামাজিক সংগঠন। গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সমমনা কিছু বুদ্ধিজীবী আর সাথে পেশাজীবীদের একটি মিলনমেলা। প্রাণের তাগিদে এক হয়ে প্রাণের প্রবাহকে ধরে রাখার আর সম্ভব হলে তা প্রচার আর প্রসারের আরেকটি সৎ উদ্যোগ। মোটাদাগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ হয়তো তেমনই একটি সংগঠন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সম্প্রীতি বাংলাদেশের যে লক্ষ্য, তা বাস্তবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমাদের চলার পথে বাধা তারাই যারা বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পণ করেছে।

আজকে আমাদের এই যে বাংলাদেশ, এর ইতিহাস না হলেও হাজার বছরের। এমনটা বলছি এ কারণে যে, বাঙালির সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের বয়স যখন হাজার বছর, তখন বাঙালি আর বাংলাদেশের ইতিহাসও তো এক হাজার বছরের কম হতে পারেনা। কিন্তু বাঙালি জাতির, জাতি হিসেবে এই যে হাজার বছরের পথ চলা, এই দীর্ঘ সময়টায় বাঙালির ‘বাঙালি নেতৃত্বে’র কোন সাক্ষ্য ইতিহাস দেয় না। বাঙালি অধ্যুষিত কোনও ভূখণ্ড গত হাজার বছরে কখনই কোন স্বাধীন বাঙালি নৃপতির শাসনাধীন ছিল না। বাঙালিকে শাসন আর শোষণ করেছেন অনেকেই। দীর্ঘ এই তালিকায় আছে পারস্য, আরব, ইউরোপীয় আর এমনকি আফ্রিকার হাবশি শাসকও, নাই শুধু কোন বাঙালি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি অধ্যুষিত প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ, যার প্রথম স্বাধীন বাঙালি শাসক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের চরিত্রটা এককথায় অনন্য সাধারণ। এটি পৃথিবীর বিরলতম জাতি রাষ্ট্রগুলোর একটি যার মূল জনগোষ্ঠি একই জাতিসত্ত্বার, অর্থাৎ বাঙালি। কাজেই এমন একটি রাষ্ট্র যে শুধু এগিয়ে যাবে না, বরং ছুটবে সেটাই তো প্রত্যাশিত। এর প্রমানও আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের স্বল্পস্থায়ী শাসনামলে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এদেশের প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ ছুঁয়েছিল আর ‘বাকশাল’ নামের এক অসাধারণ রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে দেশটির খুব দ্রুতই বিশ্ব নেতৃত্বে উঠে আসার প্রতিশ্রুতি দেখা যাচ্ছিল।

তবে বুঝতে হবে এমন একটি রাষ্ট্র অনেকের কাছেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। যে কারণে পঁচাত্তরের ১৫ অগাস্টের আগে-পরে আমরা কাছের-দূরের অনেক কুশীলবকেই সক্রিয় হতে দেখেছি এবং শুনেছি। অনেককেই বলতে শুনেছি ১৫ অগাস্ট ছিল ‘কিছু বিভ্রান্ত সেনা কর্মকর্তার অ্যাডভেঞ্চারের ফসল’। অনেকে আবার তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন এই মনে করে যে, কিছু সেনা কর্মকর্তার বিচারের মধ্যে দিয়ে ১৫ অগাস্টের দায়ীদের আদালতের কাঠগরায় দাঁড় করানোর দায়িত্বটা আমরা পালন করতে পেরেছি। আসলে যা করা হয়েছে তা আইসবার্গের চূড়াটুকু মাত্র। যা দেখেছি আর যা জেনেছি তাও সেটুকুই। আজ যথার্থই দাবি উঠছে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে ১৫ অগাস্টের নেপথ্যের খলনায়কদের চিহ্নিত করে ইতিহাসকে ইতিহাসের সঠিক জায়গায় নিয়ে আসার। এটি অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ।

যা বলতে চাচ্ছিলাম তা হলো বাংলাদেশকে ব্যর্থ করার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির আর প্রতিক্রিয়াশীলতার কোনও ঘাটতি কোনকালেই ছিল না। ‘এক জাতির এক ভূখণ্ড’ যার আজকের নাম বাংলাদেশ, গতকাল হয়তো ছিল অন্যকিছু- এর মূলশক্তি আর দুর্বলতা কিন্তু একটি জায়গাতেই, আর তা হলো আমাদের ধর্মানুভূতি। একদিকে আমাদের মূল শক্তি আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি। বাঙালির মূল সৌন্দর্য এই যে বাঙালি মুসলমানই হোক আর হোক হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান, হোক তাদের ধর্মীয় পার্বনগুলো ভিন্ন ভিন্ন, বাঙালি মুসলমান আর বাঙালি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐতিহাসিকভাবেই তাদের পার্বণের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে এসেছে। বাঙালির শক্তি হচ্ছে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’, যেমনটি বলে গেছেন শ্রী চৈতন্য দেব হাজার বছর আগে। এ কারণেই পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় উৎসব, এ কারণেই বাঙালি মুসলমানের ঈদ-আনন্দে ভাসে বাঙালি হিন্দুও, এ কারণেই বনানী কিংবা কলাবাগানের দুর্গাপূজার মণ্ডপে আর পাঁচতারকা হোটেলে বড়দিনের উৎসবে থাকে বাঙালি মুসলমানের উপচে পরা ভিড় এবং এ কারণেই বাড্ডা কিংবা সবুজবাগের বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবারণাা পূর্নিমার রাতে যখন সারি সারি ফানুস উড়তে থাকে তখন সেই বাঁধভাঙ্গা আনন্দে সামিল হয় হাজারো বাঙালি মুসলমানও।

আবার বাঙালি শক্তিকে যখন খণ্ডিত করার অপপ্রয়াস দেখি, তখন দেখতে পাই আঘাতটা এসেছে এই বিশেষ জায়গাটিতেই, অর্থাৎ আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি আর বিশ্বাসের মূলে। সে কারণেই একের পর এক ঘটতে থাকে মালোপাড়া, নাসিরনগর কিংবা বোরহানউদ্দিন ‘কাণ্ড’। সরলমতি বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় আবেগে এক চিমটি গুজব আর একমুঠ মিথ্যার স্যালাইন ঢেলে দিয়ে দেশকে আমরা অশান্ত হতে দেখেছি দফায় দফায়। আর এই জায়গাটাতেই কাজ করে সম্প্রীতি বাংলাদেশ।

সম্প্রীতি বাংলাদেশের ‘গাহি সাম্যের গান’ মূল মন্ত্রকে অন্তরে ধারণ করে সম্প্রীতির ফেরিওয়ালারা ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এরা পেশায় কেউ রাজনীতিবিদ, কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, কেউ সাবেক আমলা, কেউ শিল্পী, কেউ সমাজসেবী, কেউ সাংবাদিক কিংবা কেউ অন্য কোন কিছু। ‘সম্প্রীতি’ এদের পেশা নয়, নেশা!। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের আগে সম্প্রীতি বাংলাদেশ ছুটে গেছে দেশের বিভাগীয় সদরগুলোয়, সাথে জেলা আর উপজেলা সদরেও। আবার বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীকে সামনে রেখে সম্প্রীতি বাংলাদেশের খোঁজে আমরা ছুটে গেছি দেশের একের পর এক মফস্বলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সাম্প্রতিক ‘বোরহানউদ্দিন কাণ্ড’ এর পর এখন আমরা ছুটছি কখনো কুমিল্লা-নোয়াখালীতে তো কখনো সিলেট-মৌলভীবাজারে। সাড়াও পাচ্ছি যেমনটা প্রত্যাশিত তেমনটাই। স্থানীয় সুশীল কিংবা সাধারণ মানুষ, সবার কি এক অপরিসীম আগ্রহ! যতবার যাই ঢাকার বাইরে, একটি অসাম্প্রদায়িক, সাম্যের বাংলাদেশের প্রতি মানুষের শর্তহীন সমর্থন মুগ্ধ করে, অনুপ্রাণিত হই, বেড়িয়ে পড়ি আবারো সাতটি দিন না পেরোতেই। ছুটি আর ভাবি যে দেশের মানুষের অস্তিত্বের এতটা গভীরে কথিত অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা, তাদের আর কদিনইবা বিভ্রান্ত করতে পারবে ওই অশুভ কজন। এই ছুটে চলার শেষ বোধহয় সামনেই। সেই দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয় যেদিন আমরা, সম্প্রীতি বাংলাদেশের এই সবাই, আবার ফিরতে পারবো নেশা ছেড়ে যার যার পেশায়।

মামুন আল মাহতাব: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সম্প্রীতি বাংলাদেশ- এর সদস্য সচিব।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.