বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব


রায়হান আহমেদ তপাদার

চীন পৃথিবীর সবচাইতে বেশি জনসংখ্যার দেশ।পৃথিবীর ১৯.৪৮ শতাংশ মানুষ এই দেশে বসবাস করে।দেশটি পৃথিবীর দ্বিতীয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশও।গ্লোবার জিডিপির ৯.৩ শতাংশ এই দেশের কৃতিত্ব।সেই দেশে গত কয়েকদিনে করোনা ভাইরাস যেভাবে সুনামির মতো শক্তি নিয়ে হানা দিয়েছে তাতে শুধু চীনই নয় সারা পৃথিবীতেই সুনামির ধাক্কা আসতে শুরু করেছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন।চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ,যাতায়াত,এই সময়ে এত বেশি যে সেগুলোর অনেকই ধীরে ধীরে বা দ্রুত বন্ধ হতে চলেছে। উড়োযান অনেকেই আর চীনমুখী করছে না।চীন থেকে নেয়ারও উড়োযান তেমন বেশি ভিনদেশে উড়ছে না।হাজার হাজার উড়োযান এই একটি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলে কত-শত কোম্পানি অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বন্ধ হওয়ার উপক্রম হচ্ছে, আবার লাখ লাখ ব্যবসায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নিজ দেশে বা অন্য কোনো দেশে চলে যাচ্ছে- যা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও বড় ধরনের বিপর্যয় ঢেকে আনার ব্যবস্থা করছে বললে অত্যুক্তি করা হবে না।অনেক দেশের সঙ্গে চীনের পণ্য সামগ্রীর প্রাত্যহিক বাজার যেভাবে সচল ছিল তা কমে আসতে শুরু করেছে। অনেকেই জাহাজ চীনা বন্দরে নোঙর করতে সাহস পাচ্ছে না। চীনের বাতাস ও মানুষ করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের যে ধারণা সৃষ্টি করেছে তাতে কার সাহস আছে সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে চীনে যাতায়াত আগের মতো স্বাভাবিক রাখার। সবার মধ্যেই করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক, মৃত্যুর আতঙ্ক! অথচ মৃত্যুর পরিসংখ্যান এখনো এমন নয় যে সবাই এভাবে নিজস্ব নিরাপত্তা নিয়ে সবকিছু গুটিয়ে বসে থাকবেন। কিন্তু থাকতে তো দেখা যাচ্ছে।

অনেক দেশেই এখন করোনা ভাইরাসের প্রতিরোধে নানা ধরনের চেকআপ করা হচ্ছে।সর্বত্রই বাড়তি আয়োজন, বাড়তি খরচ, বাড়তি সতর্কতা। অজানা এই করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব চীনের পাশাপাশি পড়তে শুরু করেছে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে। সংকুচিত হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিধি আর সরবরাহ ব্যবস্থা। বহুজাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো চীন থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে বাধ্য হচ্ছে। উহান শহর নিষিদ্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরেই ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি তেল সরবরাহ। পুরো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারে সূচকের দরপতন হচ্ছে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যান লাখ লাখ চীনা পর্যটক। চীনা পর্যটকদের অন্য দেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় চলতি বছর নিউইয়র্ক আর ক্যালিফোর্নিয়া লোকসান গুণতে হতে পারে ৫৮০ কোটি ডলার।চীনা পর্যটকরা অন্য যেসব দেশের পর্যটন খাতে অনন্য অবদান রাখেন প্রায় সব দেশকেই এবার গুণতে হবে কঠিন লোকসান। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনেও আসতে পারছেন না পর্যটকরা।এরই মধ্যে ধস নামতে শুরু করেছে দেশটির পর্যটন খাতে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ আর এশিয়া চীনাদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।আমেরিকান এয়ারলাইন্স, ডেল্টা এয়ারলাইন্স, ইউনাইটেড এয়ার- লাইন্স চীনে ফ্লাইট বাতিল করেছে।সিঙ্গাপুর তো চীনের পর্যটক নিষিদ্ধ করার চিন্তাভাবনা করছে। এদিকে, হংকং চীন সংলগ্ন সীমান্তই বন্ধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করছে।দেশটির অন্যতম জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ক্ষেত্র উহান শহর লকডাউন থাকায় জ্বালানি কেনা কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। ক্রমাগত দর হারাচ্ছে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার।সেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিশ্ব শেয়ারবাজারে।

অপরদিকে করোনা ভাইরাস আতঙ্কে নিজ বাসস্থান ছাড়ছেন অনেক চীনা। কমছে শিল্পখাতের কার্যক্রম ও খুচরা বিক্রি। বেড়ে যেতে পারে বেকারত্ব আর মূল্যস্ফীতি। এর আগে ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসে পুরো বিশ্বে ৪ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল।২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের ইবোলায় ক্ষতি হয়েছিল ৫ হাজার ৩শ’ কোটি ডলার। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই করোনার কারণে চীনের ক্ষতি ৬ হাজার কোটি ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, করোনাভাইরাসে দেশটিতে এ পর্যন্ত আট শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে।বেশির ভাগ মৃত্যু ও নতুন সংক্রমণের ঘটনাই ঘটেছে হুবেই প্রদেশে, যার উহান শহরকে এ ভাইরাসের ‘উৎসস্থল’ বলা হচ্ছে।এ ছাড়া এ পর্যন্ত চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে হংকংয়ে একজন এবং ফিলিপাইনে একজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।বিশ্বের অন্তত ২৫টি দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে চীনের বেশ কয়েকটি শহর অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে কয়েক হাজার লোককে কোয়ারেন্টিন করে রাখা হয়েছে। ট্রেন স্টেশন ও বিমানবন্দরের পাশাপাশি রাস্তাগুলোও বন্ধ করে দেয়ায় চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশ প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। প্রথমে এই প্রদেশেই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছিল। প্রাদেশিক রাজধানী উহানের একটি সি-ফুড মার্কেট থেকে ভাইরাসটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গেছে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যেকার এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে আমদানি-রফতানি। নতুন করে এলসি তো খোলা হচ্ছেই না, পূর্বে এলসি করা পণ্যের জাহাজীকরণও বন্ধ। বন্ধ রয়েছে ব্যবসায়ী এবং কর্মরতদের আসা-যাওয়াও।

এমনকি বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই যুক্ত রয়েছে চীন। রফতানিমুখী এবং স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানা গুলো কাঁচামালের জন্য অনেকাংশেই চীনের ওপর নির্ভরশীল। বতর্মানে বাংলাদেশের ১২টি প্রকল্পে ৯০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে চীন। এসব প্রকল্পে কাজ করছে দুই হাজারের বেশি চীনা বিশেষজ্ঞ।করোনাভাইরাসের কারণে একরকম নিথর হয়ে আছে বিশ্ব অর্থনীতি। এর বিস্তৃতি ও ব্যাপকতা আরও বাড়লে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।বিভিন্ন গণমাধ্যমের জরিপ থেকে দেখা যায়, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, বাংলাদেশকে তার অনেক বেশি মূল্য দিতে হবে। বিশেষ করে কাঁচামালের অভাবে শিগগির অনেক ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক নতুন ফ্যাক্টরি চালু করা সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে চীনা নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা বন্ধ রয়েছে। অনেক প্রতিনিধি তাদের সফর বাতিল করেছেন। এতে কারিগরি কর্মকর্তারাও আসতে পারছেন না। এতে প্রস্তুতি শেষ হলেও কারিগরি কর্মকর্তার অভাবে অনেক শিল্পকারখানা চালু হতে পারবে না। ফলে পূরণ হবে না রফতানির ল্য। আটকে গেছে শত শত এলসি। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণও বাড়বে। পণ্য শিপমেন্টের অপেক্ষায় আছে বহু ব্যবসায়ী। উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় পুরোটাই আমদানি করা হয় চীন থেকে। এর বাইরেও কাপড়, আদা, রসুন, বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যসামগ্রী,মেশিনারি,খুচরা যন্ত্রাংশ, খেলনা, মোবাইল, বৈদ্যুতিক সামগ্রী মিলিয়ে শত শত আইটেমের পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। সবচেয়ে বড় বাণিজ্য হচ্ছে তৈরী পোশাক ও এর কাঁচামাল আমদানি। যা চীনের বাইরে প্রত্যাশা করাটাও অসম্ভব।

বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ চীনের ব্যাপার নয়। অন্যান্য দেশের সঙ্গেও চীনের বাণিজ্য আষ্টেপৃষ্ঠে এভাবেই জড়িয়ে আছে। সেটির ভবিষ্যৎ কী হবে- তা কেউ এখনই বলতে পারছে না। তবে সময়টি যদি বেশি নেয়া হয়, করোনা ভাইরাস যদি আরো দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে শুধু চীনই নয় অন্যান্য দেশও এই রোগের প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। যদি দেশটি চীন না হয়ে ছোটখাটো কোনো দেশ হতো তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এতটা প্রভাব নাও পড়তে পারত। যেহেতু দেশটি চীন, তাই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের চাইতেও অর্থনীতির সংকট অধিকতরও দ্রুত সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে যাচ্ছে। সে কারণে অনেক দেশেই নানা দুর্ভাবনা সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর ভেতরে শুরু হয়েছে। করোনা ভাইরাস একটি রোগ, এর আতঙ্ক সংক্রমণের, তাতে মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু এই রোগের কারণে চীন যেভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তাতে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে যুক্ত পৃথিবীর প্রায় সব ছোট-বড় দেশও অর্থনৈতিক সংকটে সংক্রমিত হতে যাচ্ছে- এটি বড় বিপদের কথা। সম্ভবত নিকট অতীতে অর্থনৈতিক কোনো সংকটই পৃথিবীকে এতটা আতঙ্কিত করেনি যতটা করোনা ভাইরাসের কারণে এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি আঁতকে ওঠার মতো পর্যায়ে যেতে বসেছে। তবে বিশ্ব সংস্থা যত দ্রুত নিজেদের মধ্যকার দ্ব›দ্ব সংঘাত প্রতিযোগিতা, ‘বাণিজ্য-যুদ্ধ’ একপাশে টেলে রেখে যদি করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র করে যে সংকটের দুর্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে সেটি মোকাবিলায় সব প্রজ্ঞাবান মানুষ আত্মনিয়োগ করেন, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের ওষুধ ও পরিষেবা দ্রুত নিয়ে আসতে পারেন,একই সঙ্গে নিজেদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে আর্তমানবতার সেবায় হাতে হাত রেখে এগিয়ে আসেন, তাহলে এই ভাইরাস বেশিদিন টিকে থাকার কথা নয়।

পৃথিবীতে এর আগে নানা ভাইরাসের কথা শোনা গেছে, মৃত্যুর খবরও শোনা গেছে। দ্রুতই সেসব অঞ্চলে চিকিৎসার সুযোগ ঘটেছে। আক্রান্ত মানুষ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই ভাইরাস পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। ঘটেনি এমন আতঙ্ক যা চীনের করোনা ভাইরাস নিয়ে ঘটেছে। চীন থেকে এখন বিদেশিরা দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ভাইরাসটি এমনই যে সরে যাওয়ারও উপায় নেই। মানব স্পর্শেই এই ভাইরাস দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে। যদিও এই পর্যন্ত মৃত্যু খুব বেশি ঘটেছে তা বলা যাবে না। আক্রান্তের সংখ্যাও এখনো পর্যন্ত অর্ধ লাখে পৌঁছায়নি।তারপরও পৃথিবীব্যাপী চীনা করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়েছে যে, মানুষ এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকিতে আছে বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। কারণ এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার খবর যেভাবে প্রচারিত হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে চিকিৎসক,নার্স, নিকটাত্মীয়- কেউই স্বাভাবিকভাবে আক্রান্ত রোগীকে নিরাপদে রেখে চিকিৎসা দেয়ার কথা ভাবতে পারছে না। চিকিৎসা দেয়ারও কোনো স্বীকৃত ওষুধ, টিকা বা ব্যবস্থা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত দিতে পারছে না। সে ধরনের চিকিৎসার উদ্ভাবন রাতারাতি ঘটানো সম্ভবও নয়। দিন যতবেশি গড়াচ্ছে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ও আতঙ্ক ততবেশি দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।লেখক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.