করোনা ভাইরাস: জীবাণু যুদ্ধের ছায়া?


 দিলীপ  মজুমদার

 

পঞ্চশরকে দগ্ধ করে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মহাদেব । তেমনি ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস ( কোভিদ-১৯ ) । ফ্লু, পোলিও, জিকা, ইবোলা ভাইরাসের মতো । অদৃশ্য অথচ অমোঘ । শুরু চিনের উহানে । তারপর ছড়িয়ে পড়ল  বিশ্বময় । ইতালি, ইরাণ, দঃ কোরিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকা, সুইজারল্যাণ্ড, নরওয়ে, জাপান, নেদারল্যাণ্ড, সুইডেন, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, ইস্রায়েলে ত্রাহি ত্রাহি রব । বন্ধ হাটবাজার, স্কুলকলেজ, অফিসাদালত । স্তব্ধ জনজীবন । এক দেশ থেকে আর এক দেশে যাওয়া চলবে না । নিষেধাজ্ঞা । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জারি করেছে জরুরি অবস্থা । উহান থেকে ছড়িয়ে পড়ল যে ভাইরাস, তার পাখায় যেন বিমানের গতি । উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব-পশ্চিমে সে এগিয়ে যাচ্ছে ঝড়ের বেগে । ছড়াচ্ছে করোনা, ছড়াচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে ।

কিন্তু কে ছড়ালো ? ইচ্ছে করে ছড়ালো ? সচেতনভাবে না অচেতনভাবে !নাকি প্রকৃতির নিয়মে ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস ? যুক্তরাজ্যের ‘ডেইলি স্টার’ আর আমেরিকার ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’এ প্রকাশিত হল একটা সংবাদ । বলা হল চিনের উহানের ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে চলছিল গোপন গবেষণা । জৈব রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে । সেখান থেকে অনবধানবশত ছড়িয়েছে মারণ ভাইরাস । কেউ আবার দায়ী করলেনচিনের মানুযের খাদ্যাভ্যাসকে । তাঁদের মতে উহানের ‘সি ফুড মার্কেট’ থেকে ছড়িয়েছে এই ভাইরাস । চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দায়ী করলেন মার্কিন সামরিক বাহিনিকে । বললেন তাঁরাই ছড়িয়েছেন ভাইরাস। বৃটিশ মেডিকেল ম্যাগাজিন ‘ল্যানসেট’এর মতে উহানের ফোড মার্কেটের সঙ্গে করোনার সম্পর্ক নেই । সাউথ চায়না ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির দুই তরুণ গবেষক ড. বোটাও জিয়াও ও ড. লি জিয়াওএর মতে চিনের দুই গবেষণাগার [ উহান সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল আ্যন্ড প্রিভেনশন ও ইনস্টিটিউট আফ ভাইরোলজি] থেকে অসাবধানতাবশত এই ভাইরাস ছড়িয়েছে উহান মার্কেটে । উহান মার্কেট থেকে প্রথম গবেষণাগারের দূরত্ব ৩০০ মিটার, আর দ্বিতীয়টির দূরত্ব ১২ কিলো মিটার । বিশিষ্ট লেখক আলতাফ পারভেজ বললেন যে চিনকে অকারণে দোয দিয়ে লাভ নেই, বিশ্বের যে কোন জায়গায় জন্ম নিতে পারত এই ভাইরাস । অস্ট্রেলিয়ার কুইনসল্যাণ্ড চাইনিজ ইউনাইটেড কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল সামাজিক মাধ্যমে চিনের বিরুদ্ধে যে বর্ণবাদিতার দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে তার সমালোচনা করলেন ।

চাপান-উতোর চলছে চলবে । অন্ত্যহীন । কূটনীতিবিদ আর রাজনীতিবিদদের মুখের কথা আর মনের কথা একেবারে আলাদা । এঁরা চতুর । এঁরা ছলনাময় । বারে বারে পৃথিবী এঁদেরই লোভ আর হিংসার শিকার হয়েছে । এই লোভ আর হিংসাকে চরিতার্থ করার  জন্য যুদ্ধ । যুদ্ধের জন্য যুদ্ধাস্ত্র । দিনে দিনে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম হয়েছে যুদ্ধাস্ত্র । নিপুণ থেকে নিপুণতর । দৃশ্য থেকে অদৃশ্য । অদৃশ্য এবং নিঃশব্দ । অদৃশ্য সেই যুদ্ধাস্ত্রের নাম জৈব রাসায়নিক অস্ত্র । আর সে যুদ্ধের নাম জীবণু যুদ্ধ ।

জীববিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতির সঙ্গে জীবাণু  অস্ত্রের উৎপাদন মানুষের করায়ত্ত । সে অস্ত্রের উপাদান প্যাথোজেন, টক্সিন, সাইটোটক্সিন, জৈব রাসায়নিক যৌগ, আর প্রিয়ন । এখন প্রয়োজনীয় জীবাণুতে জিনগত পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সহজেই করতে পারেন বিজ্ঞানীরা । কোন কাজ দেবে না প্রতিষেধকে । জৈব রাসায়নিক পদার্থবাহী এই জীবাণু অস্ত্রের প্রয়োগ হবে নিঃশব্দে । এর প্রতিক্রিয়া চাহিদামতো তাৎক্ষণিক অথবা বিলম্বিত । প্রাচীনকাল থেকে এ অস্ত্রের প্রয়োগের উদাহরণ পাওয়া গেলেও আগে যা স্থূল ছিল এখন তা সূক্ষ্ম হয়েছে । ১৯৪০ সালে প্রথম জীবাণু অস্ত্রের বেসরকারি গবেষণাগার খুললেন স্যার ফ্রেডারিক ব্যান্টিং । আমেরিকায় । ইনি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী, ইনসুলিনের আবিষ্কর্তা ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানের প্রতিপক্ষ ছিল চিন । চিনকে জব্দ করা দরকার । চিনের উপর জীবাণু অস্ত্রের প্রয়োগ করার চেষ্টা করে জাপান । নিউইয়র্কের রকফেলার ইনস্টিটিউট থেকে অনৈতিকভাবে ইয়েলো ফিভারের জীবাণু হাতিয়ে নেবার চেষ্টা করে । জাপান তার গবেষণাগারে ২৫ রকমের রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু তৈরি করতে সক্ষম হয় । সেসব জীবাণু প্রয়োগ করে কারাগারের বন্দিদের উপর । জাপানকে জব্দ করার জন্য আমেরিকাও প্রস্তুতি নেয় জীবাণু যুদ্ধের । পরীক্ষা করার জন্য নতুন এক ব্যাকটিরিয়া ছড়ায় ভার্জিনিয়া ও সানফ্রান্সিকোর উপকূলে । প্রাণ হারায় ৮ লক্ষ মানুষ ।

১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত হয় বায়োলজিকাল আ্যন্ড টক্সিন উয়েপন কনভেনশন ( BTWC) । আমেরিকার মতো রাশিয়াও জীবাণু যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত হবার চুক্তিপত্র সই করে । কিন্তু রাজনীতিবিদদের মুখের কথা ও মনের কথা এক নয় । তাই দেখা যায় রাশিয়া তার গবেষণাগারে গোপনে চালিয়ে যায় জীবাণু অস্ত্র তৈরির কাজ । প্রায় ৫০ হাজার কর্মীকে নিযুক্ত করে তারা । জমা করে আ্যনথ্রাক্স ব্যাসিলি, স্মল পক্স, হেমারেজ ফিভারের ভাইরাসএর বিপুল ভাণ্ডার । হয়তো শক্তিধর  অন্য দেশও গোপনে এসব পরীক্ষা  করে চলেছে । ধরা পড়ে নি, এই যা ।

তাই করোনা ভাইরাস যে মানুষের তৈরি নয়, হলপ করে সেকথা বলা যাবে না । চিনের হতে পারে, আমেরিকার হতে পারে, হতে পারে অন্য কোন শক্তিধরের । এত চাপান-উতোর দেখে গন্ধটাকে সন্দেহজনক বলেই মনে হয় । আর এই ভাইরাস রাজনীতি করার সুযোগও দিয়েছে দেদার । যেসব দেশের অর্থনীতি বেহাল হয়েছিল ও জনরোষে বিপাকে পড়েছিলেন শাসকেরা, তাঁরা আপাতত দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে দিন কাটাতে পারবেন । চিনের তৈরি জিনিস দখল করে ফেলছিল বিশ্ব বাজার, সামনের বেশ কয়েক বছর ‘মেড ইন চায়না’ জিনিস লোকে ছুঁয়েও দেখবে না ।

(লেখক: কলকাতার অধিবাসী, সত্যবাণীর কন্ট্রিবিউটিং কলামিষ্ট। ফেলোশিপপ্রাপ্ত সিনিয়র গবেষক।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.