করোনা দাপাচ্ছে : দেখছি এক আশ্চর্য স্বপ্ন


দিলীপ মজুমদার

 

 

 

 

দাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা ভাইরাস।আতঙ্কিত মানুষ।মৃত্যুভয়ে ধনী-দরিদ্র সমান হয়ে গেছে।দুনিয়ার ব্যস্ত শহরগুলো স্তব্ধ।স্তব্ধ যান-বাহন।প্রায় শ্মশানের স্তব্ধতা।স্তব্ধ মানুষের সভ্যতার অহমিকা।এখনও গ্রাম ছোঁয়নি করোনা।ছুঁলে যে কি হবে কে জানে!বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব।এ ওকে দায়ী করছে।জীবাণু যুদ্ধের ছায়া দেখতে পাচ্ছে কেউ কেউ।এই পটভূমিতে কাল এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলাম।হয়তো আমার অবচেতন মনের ভাবনা স্বপ্ন হয়ে উঠে এল।স্বপ্নের ব্যাখ্যায় ফ্রয়েড সাহেব সে কথাই বলেছেন ।

আপনাদের সেই স্বপ্নের ছবিটা দেখাই।বিশ্বের প্রতিটি দেশের বিজ্ঞানী সমবেত হয়েছেন ইতালির ভেনিস শহরের একটি মঞ্চে । ইতালিকে বেছে নেওয়ার কারণ আছে।ইতালি করোনার থাবায় সবচেয়ে বেশি বিধ্বস্ত । হাহাকার আর ত্রাসে সেখানকার শ্বাস রুদ্ধ হবার উপক্রম।বিজ্ঞানীদের এই সম্মেলনে আলোচ্য বিষয় : ‘বিজ্ঞান শুধু মানুষেরই জন্য’ । এক সাংবাদিক ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘ স্কুলের পড়ুয়ারা যে বিষয়ে রচনা লেখে, সেই বিষয় নিয়ে তা-বড় বিজ্ঞানীরা আলোচনা করছেন, এটা কি পরিহাসরসিকতা !’ কিন্তু ফ্রান্সের একজন প্রৌঢ বিজ্ঞানী সাংবাদিককে ধমক দিয়ে বললেন, ‘স্কুলের পড়ুয়া যে বিষয় নিয়ে রচনা লেখে, সেই বিষয়টি আমাদের মতো জ্ঞানবৃদ্ধরা বারবার উপেক্ষা করেছে । বিজ্ঞান মানুষের জন্য- এটা কথার কথা হয়ে থেকেছে, তাকে পুরোপুরি কাজে পরিণত করতে পারি নি ।যুগ যত এগিয়েছে, ততই বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের কুক্ষীগত করার চেষ্টা হয়েছে, এটা করেছেন নানা দেশের রাষ্ট্রনেতারা । বুঝতে পারছেন ?’

বিশাল মঞ্চে বসে আছেন নানা দেশের বিজ্ঞানী । কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির মার্টিন কার্লপ্লাস, ভাইরোলজির ডেভিড বাল্টিমোর, ইমিউনোলজির আ্যান্টনি ফাউসি, অনকোলজির হ্যারল্ড ভারমস, কোয়ান্টাম থিয়োরির আ্যলেন আ্যসপেক্ট, হিউম্যান জেনেটিক্সের ক্রেগ ভেন্টার, ইলেক্ট্রো কেমিস্ট্রির আ্যালেন বার্ড, ফিজিক্সের পেটার হিগস, কম্পিউটার সায়েন্সের টিমোথি বার্নাস লি, মলিকিউলার বায়োলজির জেমস ওয়াটসন, ইমিউনোলজির লুক মন্টাজিনার, মলিকিউলার মেডিসিনের ক্রেগ মেল্লো, সিস্টেমস বায়োলজির লেরয় হুড, ইভলিউশনারি বায়োলজির জন টাইলার বোনার, মলিকিউলার বায়োলজির ডেনিস ব্যারি, ফিজিক্সের গর্ডন মূর, ডি এনে এ কেমিস্ট ক্যারি মুলিস, জেনেটিকসের পিয়েরি চ্যামবন, ইভলিউশনারি প্যালিওবায়োলজির সিমন কনওয়ে, কার্বন সায়েন্সের মিলড্রেড ড্রেসলহানস, নিউরোসায়েন্সের জেরাল্ড এম. এডেলম্যান, মলিকিউলার জেনেটিকসের রোনালড ইভানস, নিউরোডিজেনারেশনের স্ট্যানলি প্রুসিনার….. এমনি আরও কতজন ।

আমাদের ভারত ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরাও এসেছেন সম্মেলনে । এসেছেন রফিকুল ইসলাম, অনুরাধা আচার্য, রবি চোপরা, কুমসুম নাহার, উদ্ভব ভারতী, অনিন্দ্য দত্ত, সমীর সাহা, এম.আফজল হোসেন, চিন্তামণি নাগেসা, আসাদুল্লা খান প্রভৃতি । বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কিছু সাহিত্যিক,শিল্পী ও সমাজকর্মীদেরও সভায় উপস্থিত থাকার আবেদন জানানো হয়েছিল । বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মথ্যে জল-অচল ভেদ যে মানা হয় নি, এটা দেখে ভালো লাগল।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রবীণ আধিকারিক ছিলেন সভার সঞ্চালক । বিকেল ঠিক তিনটেতে তিনি সভা শুরু করলেন ।বললেন,বন্ধুগণ, করোনা নামক এক ঘাতক ভাইরাসের বিশ্ব অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই সভা আহ্বান করেছি।বিশ্বের সব দেশের বিজ্ঞানীরা এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন । এটা অত্যন্ত আনন্দের কথা । করোনা প্রসঙ্গে আজ জীবাণু যুদ্ধের কথা এসে পড়ছে । বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা উড়ো কথা । সেসব নিয়েও আমাদের আলোচনা করতে হবে ।

তাঁর কথা শেষ হতে-না হতে উঠে দাঁড়ালেন আমেরিকার এক বিজ্ঞানী । তিনি চিনা বৈজ্ঞানিকদের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘এঁরা যে এঁদের ল্যাবে করোনা ভাইরাস বানাচ্ছিলেন তার প্রমাণ আছে । গতবছর কানাডার এক ল্যাব থেকে এঁদের এক এজেন্ট সেই ভাইরাস চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন । সেই ল্যাবের এক আধিকারিক সে কথা বলায়, তাঁকে মেরে ফেলা হয় ।লাফিয়ে উঠলেন চিনা বৈজ্ঞানিক, ‘তাই আপনাদের প্রেসিডিন্ট আর তাঁর সাগরেদরা গোড়া থেকে একে চিনা ভাইরাস, উহান ভাইরাস বলে চালিয়ে দিতে চাইছিলেন । আমরা যে জীবাণু অস্ত্র তৈরি করি এরকম কোন প্রমাণ কি আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পেরেছে ? বরং রাশিয়া ও জাপানের মতো আপনাদের দেশ যে জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে হাত পাকিয়েছে, তার প্রমাণ আছে । আরে মশাই, আপনাদের সেনাবাহিনী আমাদের উহানে এই ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে ।চিনা বৈজ্ঞানিকের কথায় আমেরিকার বৈজ্ঞানিকরা উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ শুরু করলেন । সঞ্চালক থামালেন তাঁদের । চিনা বৈজ্ঞানিক বলতে লাগলেন, ‘আমাদের দেশ বাণিজ্যে আমেরিকার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে, তাই আমাদের দেশের উপর তাঁদের রাগ । রাগ ইরানের উপরেও । তাই এই দুই দেশের উপর ভাইরাস ছড়িয়েছে আমেরিকা ।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রেসিডেন্ট তখন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘দেখুন, করোনা মনুষ্যসৃষ্ট কিনা তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি । কোন বিশেষ দেশের ল্যাবে এটা তৈরি হয়েছে কি না, সেটাও তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাপার । আমরা সে তদন্ত শুরু করব ।জার্মানির বৈজ্ঞানিক প্রেসিডেন্টার কথায় মৃদু হেসে বললেন, ‘বোধ হয় সে তদন্ত শুরু হলেও শেষ হবে না ।জার্মান বৈজ্ঞানিক এ কথা কেন বললেন, বাংলাদেশের এক বৈজ্ঞানিক জানতে চাওয়ায় জার্মান বৈজ্ঞানিক বললেন, ‘ গোপনে গোপনে কোন কোন দেশ যে জীবাণু অস্ত্র তৈরি করছে, এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে সে অভিযোগ গেলেও তাঁরা জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন ।’

এ কথার সমর্থন জানালেন বেশ কয়েকজন বৈজ্ঞানিক।সঞ্চালক বললেন, ‘বন্ধগণ, আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় : বিজ্ঞান শুধু মানুষের জন্য । এই বিষয়ে আলোচনা করুন আপনারা।পরস্পর কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করবেন না । মনে রাখবেন এ আমার এ তোমার পাপ ।উঠে দাঁড়ালেন ইংল্যাণ্ডের এক বৈজ্ঞানিক।পক্ককেশ, প্রৌঢ় এই বৈজ্ঞানিকের কাজের সঙ্গে পরিচিত সকলে । জিনতত্ত্ব নিয়ে অতন্দ্র গবেষণা করেছেন।নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন, এরকম একটা কথাও চালু ছিল। মাঝপথে ইনি গবেষণা থেকে হাত গুটিয়ে নিলেন । কারণ কেউ জানে না ।তবে একথা সবাই জানেন যে মানুষটি বড্ড ঠোঁটকাটা । আপোষ করতে জানেন না । ভারত, জাপান, হল্যাণ্ড, বাংলাদেশ, স্পেনের বহু বৈজ্ঞানিক তাঁর অনুরাগী । তাঁরা তাঁকে সম্মানের আসনে বসানোর বহু চেষ্টা করেছেন । তিনি তাঁদের বলে দিয়েছেন যে তাঁকে দিয়ে মানব-ব্যতীত কোন কাজ করানো যাবে না ।

সেই বৈজ্ঞানিক মঞ্চে উঠে দাঁড়াতে সব মুখরতা স্তব্ধ হয়ে গেল।কাঁপছিলেন তিনি।হয়তো দুরন্ত কোন আবেগে।তাঁকে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন দুই দেশের দুই তরুণ বিজ্ঞানী । তিনি বললেন,বন্ধুগণ,বিজ্ঞান শুধু মানুষেরই জন্য।বিজ্ঞানীর কোন দেশ নেই , নির্দিষ্ট রাষ্ট্র নেই,সব ঠাঁই তার ঘর আছে, দেশে দেশে আছে পরমাত্মীয় ।আপনারা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো এই বোধ আপনাদের হৃদয়ে লালিত হয় কিনা !নাকি,পদ ও পদকের লো্ভে, স্বার্থক্ষুণ্ণ হবার ভীতিতে আপনারা রাষ্ট্রনেতাদের অঙ্গুলি হেলন মান্য করে চলেন ! দেখুন,এই সব রাষ্ট্রনেতারা প্যারাসাইট, পরজীবী । বিজ্ঞানী, লেখক , শিল্পীদের কৃতিত্বকে আত্মসাৎ করেই এঁদের বাড়-বাড়ন্ত । এঁরাই সবল-দুর্বলের বিভাজন রেখা এঁকে দেয় । ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য পররাজ্য আক্রমণ করে।গালভরা নাম দেয় যুদ্ধের ।কখনও বলে ধর্মযুদ্ধ, কখনও বলে ন্যায় যুদ্ধ । যুদ্ধের বলি হয় সাধারণ মানুষ । আপনারা কি এঁদের নির্দেশ মেনে নেবেন ? আপনারা কি প্রকারান্তরে দাসত্ব করবেন এঁদের ?’

একটু থামলেন তিনি সমস্ত সভাঘরে তাঁর আবেগকম্পিত কণ্ঠস্বর গমগম করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।স্পর্শ করছে সমস্ত দর্শক-শ্রোতাকে। তাঁরা রুদ্ধবাক।হয়তো কারও কারও হৃদয়ে জাগছে অনুশোচনা।কারও কারও চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল ।প্রৌঢ় বিজ্ঞানী বলতে শুরু করলেন,আপনারা বিজ্ঞানী । আপনারাই তো এ যুগের ঈশ্বর।সেই ঈশ্বর কেন তুচ্ছ ক্ষমতামদমত্ত শাসকের পদলেহন করবে ?’
আর বলতে পারলেন না তিনি । প্রচণ্ড আবেগাপ্লুত হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।তাঁর মুখেচোখে জল দিয়ে তাঁকে সুস্থ করা হল।সঞ্চালক বললেন,শ্রদ্ধেয় এই বৈজ্ঞানিকের বক্তব্য যাঁরা সমর্থন করেছেন,তাঁরা হাত তুলুন ।দেখা গেল সভার সকলেই সমর্থন জানাচ্ছেন তাঁকে । তখন সঞ্চালকের পরিচালনায় তৈরি হল একটি নতুন সংগঠন।যার নাম :বিশ্বের বৈজ্ঞানিক সমাজ’।সেই নতুন সংগঠন শপথ নিল জীবাণু অস্ত্র বা মানুষের পক্ষে অমঙ্গলকর কোন কিছুর গবেষণা থেকে বিরত থাবেন তাঁরা।যুক্ত থাকবেন না কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে।মানবেন না কোন রাজনৈতিক নেতার ডিক্টাট।জয় মানুষের জয়’এই শ্লোগানে মুখরিত হল সভা।এক ভারতীয় বিজ্ঞানী ও বাংলাদেশি কবি হাসতে হাসতে বললেন,করোনাকে অভিশাপ বলে গালাগাল করেছি।এখন দেখছি তার একটা ভালো দিকও আছে।সে মিলিয়ে দিতে পেরেছে বিজ্ঞানীদের।তাঁদের মনে এই বোধ জাগ্রত করে দিতে পেরেছে যে বিজ্ঞান শুধু মানুষের জন্য । সে মানুষ দেশকালাতীত মানুষ।তাঁদের কথায় সকলে হাততালি দিয়ে উঠল মানুষ । সেই হাততালির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল আমার । বাইরে বেরিয়ে দেখলাম মানুষ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে হাততালি দিয়ে ,কাঁসর বাজিয়ে করোনা তাড়াচ্ছেন।তার মানে বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞান নয়,রাষ্ট্রনেতাকেই তাঁরা ভগবান বলে মনে করেন ।

(লেখক: কলকাতার অধিবাসী, সত্যবাণীর কন্ট্রিবিউটিং কলামিষ্ট। ফেলোশিপপ্রাপ্ত সিনিয়র গবেষক।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.