ভালোবাসা সবসময়, শুধুমাত্র বিজয়ে নয়


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

IMG_4209 জেসমিন চৌধুরী

 

খেলা তো টিভিতে দেখেছেন। যা দেখেননি, সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি।

আমি ক্রিকেটের তেমন বড় ফ্যান না কিন্তু বাংলাদেশ খেলছে ইংল্যান্ডের মাটিতে, সেই হিসেবে এবার আমি একটু বেশিই উত্তেজিত ছিলাম। কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টাইগারদের অসাধারণ খেলা চর্মচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা সেই উত্তেজনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিল, একটা টাইগার কস্টিউমও কিনে ফেললাম।

সেদিন সকাল সকাল বেরিয়েও প্রচন্ড ট্রাফিক জ্যামের কারণে পৌঁছুতে দেরি হলো, তারপর দেখা দিল পার্কিং এর সমস্যা। স্ট্যাডিয়াম থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে গাড়ি রেখে দৌড়াতে দৌড়াতে গেটে পৌঁছলাম। গেটের বাইরেই দেখা এক পাকিস্তানী ফ্যান এর সাথে যার সাথে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ওয়ার্ম আপ ম্যাচের সময় বাংলাদেশী ফ্যানদের তুমুল বাদানুবাদ হয়েছিল। সেদিন দুই স্ট্যান্ড নিচে বসা যে লোকটাকে মনে হয়েছিল অতিশয় অভদ্র সেই লোকটাই আমাদের দেখে খুশিতে আটখানা হয়ে তার বিশাল বপু নিয়ে দুলতে দুলতে এগিয়ে এল। অপুকে বুকে জড়িয়ে ধরল, আমার সাথে হাত মেলাল। কুশলাদি জানতে চাইল। বুঝলাম ক্রিকেট উন্মাদনা মানুষের ব্যক্তিত্বকেও কিছুক্ষণের জন্য পাল্টে দিতে পারে। লোকটা আদতে এতটা খারাপ নয়।

IMG_4208বিজয়ের উচ্চাশা নিয়ে জাতীয় পতাকা দোলাতে দোলাতে বাঘ বেশে গ্যালারিতে বসে দেখি সামনে, পেছনে, ডানে, বায়ে মানচিত্রের মতই ঘিরে আছে ইন্ডিয়া। শুরু থেকেই তাদের এগ্রেসিভ চিয়ারিং চলছিল, তাল মেলাতে গিয়ে গলা ভেংগে যাচ্ছিল আমাদের। দু’দুটো উইকেট পড়ে গেছে, তবু বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলে চেচাচ্ছি। ধারে কাছে একজন বাংগালিও নেই। ছোট ছোট কয়েকটা গ্রুপ চোখে পড়ল অন্যান্য স্ট্যান্ডে, আমাদের থেকে বেশ দূরে।

এর মধ্যে সাদা চামড়ার ক্রিকেট-প্রেমীও ছিল বেশ কিছু, সম্ভবত সেমি ফাইনাল থেকে বাদ পড়ে যাওয়া সাউথ আফ্রিকা বা অস্ট্রেলিয়া সাপোর্টার যারা আগেই টিকিট কিনে ফেলেছিল কিন্তু রিটার্ন করতে পারেনি। আমাদের বাঁয়ে ছিলেন এদের কয়েকজন, ডানে অল্পবয়েসী ইন্ডিয়ান ছেলেমেয়েদের একটা দল, পেছনে দু’টো ইন্ডিয়ান পরিবার। এরা সবাই খুব ভদ্র ছিল, বেশ গালগল্প হচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পতনের কষ্ট অন্তত চোখে তেমন জ্বালা দিচ্ছিল না কারণ ভাল করে খেলাই দেখতে পারছিলাম না। তিনটা ওয়াকওয়ের মোহনায় ছিল আমাদের সিট, সামনা দিয়ে ক্রমাগত মানুষের স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। সাজুগুজু করা সুন্দরীরা অহেতুক এদিক সেদিক করছিল। মনে আবারো প্রশ্ন, ‘এরা মাঠে আসে ক্যান?’

হঠাৎ করেই আমাদের পাশের স্ট্যান্ডে মারামারি লেগে গেল এক ইংরেজ যুবক আর কয়েকজন ভারতীয় ফ্যানের মধ্যে। কিছু বুঝে উঠবার আগেই দেখলাম ইংরেজ যুবকটি মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, এদিক ওদিক উড়ে যাচ্ছে ভারতীয় ফ্যানদের হাতের বিয়ারের গ্লাস। ঘটনা ছিল এরকম- ভারতীয় ফ্যানগুলো দর্শক সারির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে বিয়ার খেয়ে খেয়ে চিয়ার করছিল, ইংরেজ ছেলেটা তাদেরকে সরে যেতে বলাতেই মারামারির সূত্রপাত। স্টুয়ার্ডরা পুলিশ ডেকে আনলে ইন্ডিয়ান ফ্যানরা পুরোটা দোষ ইংরেজ যুবকটার উপরেই চাপিয়ে দিল, অধিক জনবলের এটাই সুবিধা। যাক, ভাগ্যিস ঘটনা বেশি দূর গড়ায়নি।

Bangladesh Supportersপেছনে বসা ভারতীয় পরিবারটির ছোট বাচ্চাটা আমাদের টাইগার কস্টিউম আর কোলের বাঘ দেখে বেশ আমোদিত বোধ করছিল, ‘মাম্মি, আন্টি কিউ টাইগার কস্টিউম পেহনকে আয়ি হ্যা?’ মা তাকে বুঝিয়ে বলছিল আমাদের জাতীয় পশু বাঘ তাই আমরা আমাদের খেলোয়াড়দের বাঘ বলে ডাকি। তাদের গল্প শুনতে ভালই লাগছিল।

বাংলাদেশের পরাজয় যখন প্রায় নিশ্চিত, তখন দু’জন চারজন করে বাংলাদেশী ফ্যানরা উঠে যেতে শুরু করলেন। এরা যে অশ্রদ্ধা থেকে এমনটা করছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। হয়তোবা ইন্ডিয়ান ফ্যানদের চিয়ারিং আর নিতে পারছিলেন না, অথবা খেলা শেষের ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে চাইছিলেন। সে যা’ই হোক, প্রতিটা প্রস্থানরত বাংলাদেশী ফ্যানের পেছনে শতশত ইন্ডিয়ান ফ্যান ‘বু উ উ’ করছিল।

অপু আর আমি এ পর্যন্ত একবারও উঠে দাঁড়াইনি যাতে পেছনের দর্শকদের অসুবিধা না হয়। এই প্রথম উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে পতাকা দোলাতে লাগলাম। কেউ তাকাচ্ছিল না তবু আমি এই প্রথম আমার পোস্টারটি মেলে ধরলাম। এক পিঠে- ‘ভালবাসা সবসময়, শুধুমাত্র বিজয়ে নয়’, অন্যপিঠে- ‘Sunny or rainy days, love you always.’

খেলা শেষ হলে ইন্ডিয়ানদের চেঁচামেচিতে কানে তালা লাগবার উপক্রম। কষ্ট লাগছিল, কিন্তু রাগ হচ্ছিল না। জিতলে আমরাও নিশ্চয়ই এমনটাই করতাম। আমার পাশে বসা অল্পবয়েসী ভারতীয় ছেলেটি আমার সাথে হাত মিলিয়ে বলল, ‘I admire you for staying till the end in spite of being surrounded by us crazy Indian fans.’

একজন এডমায়ার করলে কী হবে, স্ট্যাডিয়াম থেকে বের হবার পথে টাইগার কস্টিউম পরা দুই বাংলাদেশী ক্রিকেট-প্রেমীকে ইন্ডিয়ান ফ্যানদের হাতে কী পরিমাণ বিদ্রুপের শিকার হতে হল, তা কল্পনাও করতে পারবেন না। আমি প্রতিটি বিদ্রুপের উত্তর একইভাবে দিচ্ছিলাম, ‘Good luck for the final’। ভাল ব্যবহার বেশির ভাগ সময়ই ম্যাজিকের মত কাজ করে। প্রায় প্রতিবারই জবাব এল, ‘You’ve done well too, better luck next time.’

গেট দিয়ে বেরোবার সময় দেখি এক ইংরেজ গায়ক গান গেয়ে বাস্কিং করছে। বেটা মহা চালাক, গাইছে ‘Oh Ravi Jade…..ja….’ আর সেন্টিমেন্টাল হয়ে ইন্ডিয়ানরা তার বাটিতে পয়সা ছুঁড়ে দিচ্ছে। দেখা হয়ে গেল সময় টিভির রিপোর্টারদের সাথে, তারা ছোটখাটো একটা ইন্টারভিউ নিলেন আমাদের।

পথে পথে অসংখ্যবার আমাদেকে থামিয়ে সেলফি তুলল সাদা,বাদামি সব চামড়ার লোকে, টাইগার কস্টিউমটাই মূল আকর্ষন। আজ নিশ্চয়ই বহু অপরিচিত লোকের ফেসবুক পেইজে শোভা পাচ্ছে আমাদের টাইগার পরিবারের ছবি।

গাড়ির দিকে হেঁটে যাবার পথে ফেসবুক পেইজে দেখেছি্লাম সিজনাল ফ্যানদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, বাঘ আর বিড়ালের ছবির নিচে ‘বিফোর দ্য ম্যাচ, আফটার দ্য ম্যাচ’ ক্যাপশন। আমাদের নিজেদের লোকদের এসব আচরণে যে কষ্ট পেলাম ততটা ইন্ডিয়ানদের ‘বু উ উ’ তে পাইনি। দল ভুল করে, আমরাও অবশ্যই সমালোচনাও করব কিন্তু কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কেন? বিষন্ন মন এসব দেখে বিষন্নতর হয়ে উঠল।

এমন সময় আমাদের থামিয়ে এক শিখ লোক বলে উঠল, ‘It’s great to see you’re still flying your flag. The flag must keep flying whether you win or lose.’ এই একটা কথায় মন ভাল হয়ে গেল। ঠিক কথা, একদিন জিতব একদিন হারব কিন্তু ‘দ্য ফ্ল্যাগ মাস্ট কিপ ফ্লাইং’ ওলওয়েজ।

লেখক: শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক

 

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *