স্থগিত ভ্যাট আইন, কাটছাঁট হচ্ছে এডিপি


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

মনোয়ার হোসেন  Monowar Hussain

ঢাকা থেকে লিখেছেন সত্যবাণী’র জন্য: অন্যান্য বছরের মত নয়, এবার আর্থিক বছরের শুরু থেকেই সরকারের প্রধান রাজস্ব সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে এবং কতদূর জাতীয় বাজেটের ঘাটতি কমিয়ে আনা যায় –তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে। কী কী পন্থা বা পথ অনুসরণ করে কতদূর বা কত পরিমাণ রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে -সেটাই এখন রাজস্ব বোর্ডের মুখ্য বিষয়। জাতীয় সংসদে বাজেট অনুমোদনের শেষ মূহুর্তে রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় এক বিরাট পরিবর্তনের কারণেই এই পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে।

অপরদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়েও চলছে রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের মধ্যে কীভাবে একটা সামঞ্জস্য বা ভারসাম্য আনা যায় -সে প্রচেষ্টা। কারণ রাজস্ব প্রাপ্তির উপর ভিত্তি করেই অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারিত হওয়ার কারণে রাজস্ব প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা কমে যাওয়ায় এখন পুরো ব্যয় পরিকল্পনাতেই পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল বিধায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজেট অনুশাখাতে চলছে এক ধরনের অস্থিরতা। অতি সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, ঘোষিত বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে অর্থ বছরের শুরুতেই নতুন ভাবে চিস্তা-ভাবনা করতে হচ্ছে।

সংগূহীত তথ্য থেকে যা প্রতীয়মান হয়, তা হচ্ছে- উন্নয়ন বাজেট, যার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি)-ও রয়েছে, বেশ কিছু কাটছাঁট করে রাজস্ব প্রাপ্তি ও ব্যয়ের মধ্যে একটা সমন্বয়ের প্রচেষ্টা নেয়া হচ্ছে। বাজেট সংশোধনের এই প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। ফলে পূর্ণোদ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হতেও সময় লাগবে। এই পরিস্থিতিতে কিছুটা হলেও বাজেট বাস্তবায়ন একটা ধাক্কা খেতে যাচ্ছে। কোন রকম ধাক্কা ছাড়াই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এফিশিয়েন্সি বা দক্ষতার ওপর।

বাজেটে প্রস্তাবিত ভ্যাট আইনের কার্যকারিতা দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখার কারণে শতকরা ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রাপ্তির যে পরিকল্পনা সরকারের ছিল, তা-ও স্থগিত হয়ে পড়েছে। সেবা ও পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত হারে ভ্যাট আরোপিত হলে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হতো বলে হিসাব করা হয়েছিল। পরিকল্পনাটি স্থগিত হওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরে এই পরিমাণ রাজস্ব রাষ্ট্রের কোষাগারে আসছে না। এ পরিস্থিতে ঘাটতি পূরণে ব্যক্তি খাতের আয়কর ও কর্পোরেট ট্যাক্স প্রাপ্তির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। ফলে ধরে নেয়া যায়, এ খাতে রাজস্ব আদায় বাড়াতে বহু নতুন সম্ভাব্য আয়কর দাতা ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও সম্পদের রেকর্ড এবং আনুষঙ্গিক দলিল-দস্তাবেজ খতিয়ে দেখবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ব্যক্তি আয়কর খাতে বহু লোক রয়েছেন, যারা শুধু রিটার্ণ জমা দেন কিন্তু কর দেন না। এখানে উল্লেখ্য, আয় না থাকলে আয়কর দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আবার আয়কর সীমার নীচে বা করযোগ্য আয় না থাকলেও একজন নাগরিক রিটার্ণ জমা দিয়ে থাকেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, এই ক্যাটাগরির ব্যক্তিরা কর সংগ্রাহকদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। অন্যদিকে কর্পোরেট ট্যাক্সের বিষয়টি হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। কারণ দেশের বিশাল অংশের (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা জোন) বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্পোরেট করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এই তিনটি জোনের সকল কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান-ই যে কর দিচ্ছে, তা গ্যারান্টি দিয়ে রাজস্ব বোর্ড কর্মকর্তারাও বলতে পারবেন না।

সার্বিক বিশ্লেষণে ও অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনিশ্চিত রাজস্ব প্রাপ্তি ও ব্যয়ের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে বা ভারসাম্য বজায় রাখতে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে আনা ছাড়া উপায় নেই। সরকারের আকার বিশাল হওয়ার কারণে এবং প্রতি বছর অনুন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতে ব্যয় সংকোচন বাস্তবে সম্ভব হয় না। ফলে কাটছাঁট যা করার উন্নয়ন ব্যয়ের খাতেই করতে হয়। সরকারের অগ্রধিকারমূলক প্রকল্পগুলো ছাড়া অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে কমিয়ে দেয়া বা প্রয়োজনে বাদ দেয়া -এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ব্যাপার। তবে এখানে যে প্রশ্নটি এসে যায়, সেটি হচ্ছে- এই সাধারণ প্রকল্পগুলো মূলত: বিভিন্ন এলাকা ভিত্তিক। প্রতিটি জনপ্রতিনিধিরই নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার জন্য কিছু না কিছু উন্নয়নমুলক প্রকল্প থাকে এবং এসব প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সরকারের ওপরও এক ধরনের নির্বাচনী অঙ্গীকার ও চাপ থাকে। সুতরাং এসব সাধারণ অথচ জনগুরুত্ব সম্পন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ কমিয়ে দিলে কিংবা প্রকল্প স্থগিত করলে এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের মধ্যে বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা যে কোন রাজনৈতিক সরকারের জন্য খুব অস্বস্তিদায়ক। এ কারণে প্রকল্প কাটছাঁট করতে হলেও এক্ষেত্রে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয়।

বাজেট ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক সাহায্যের একটি ভূমিকা আছে। তবে তা ব্যাপক নয়। শুধুমাত্র বৈদেশিক সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি পূরণ একটি উদ্ভট পরিকল্পনা। জানা যায়, বর্তমানে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ, যা পাইপ-লাইনে আছে, প্রায় ৭শ কোটি ডলার। তবে সময় মতো এই সাহায্য পাওয়া কঠিন।

সাধারণত অর্থ বছরের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট সংশোধন করা হয়। এ বছরও তা অবশ্যই করা হবে। তবে এবার বাজেট সংশোধন করা হবে প্রথম অর্ধ-বার্ষিক (ছয় মাস) তথা আগামী ডিসেম্বরের আগেই। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেই জানিয়েছেন এ কথা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত বৃহত্তম বাজেট হচ্ছে চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের, চার লাখ কোটি টাকারও অধিক। এর মধ্যে রাজস্ব বোর্ডের আওতাধীন রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। আর এর মধ্যে ভ্যাটের পরিমাণ হচ্ছে ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ও ভ্যাট আহরণ স্থগিত করায় বর্তমান পরিস্থিতির উদ্ভব।

মনোয়ার হোসেন: বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ক সিনিয়ার সাংবাদিক

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *