গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা ও বাকস্বাধীনতার পথে অশনি সংকেত


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

IMG_4862  অসীম চক্রবর্তী

 

গত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিয়ে নানা ধরণের সমালোচনা হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম সমালোচনা হলো “প্রশ্ন পত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ে নানা ধরণের ধারাবাহিক পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং পরিবর্তন । অনেকের মতো আমিও বিশ্বাস করি শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ আরও শক্ত হাতে প্রশ্ন পত্র ফাঁস বিষয়টাকে দমন এবং প্রতিকার করতে পারতেন। এর জন্য সাফাই গাইবনা। আমি এখনো বিশ্বাস করি প্রশ্ন পত্র ফাঁস বিষয়টাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও শক্ত হাতে দমন করতে পারতো। তবে গত নয় বছরের মন্ত্রীত্বকালীন সময়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিকে দুর্নীতির অভিযোগে কেউই অভিযুক্ত করতে পারেনি।বাড়ি গোলাপগঞ্জ হবার সুবাদে চোখের সামনে দেখেছি নুরুল ইসলাম নাহিদ সাহেবের সাদামাটা জীবন যাপন এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কিছু করার একটা দুর্দান্ত আকুতি। কিন্তু কি জানি কি ঘটলো হটাৎ করেই যুগান্তর পত্রিকা গত সপ্তাহে একটি ছয় পর্বের সংবাদ প্রকাশ করে একটা হৈ চৈ ফেলার চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু আদতে তাদের উদ্দেশ্য আদৌ সফল হয়নি। কারণ নুরুল ইসলাম নাহিদ এখন পরীক্ষিত সৎ নেতা। একজন মন্ত্রী হিসাবে উনি কতটা সফল অথবা কতটা বিফল সেটা আলোচনা করা যেতেই পারে। তাই বলে ভিত্তিহীন অভিযোগে অভিযুক্ত করে একজন মানুষের নৈতিক চরিত্র হরণ কতটা যৌক্তিক তা আলোচনা করবো লেখার পরবর্তী অংশে।

অভিযোগ করতে পারে যে কেউ। আপনি চাইলে যে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারেন। এটা আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার। তার মানে এই নয় যে অভিযুক্ত মানুষটি আপনার অবান্তর অভিযোগের কারণে দোষী সাবস্ত হয়ে গেছেন।

চলুন যুগান্তর পত্রিকার “সিলেটের শিক্ষা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রীর ‘তিন খলিফা’” শিরোনামের সংবাদের একটি অংশ ব্যাবচ্ছেন করে দেখে আসি আসলে যুগান্তরের অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত।

যেমন কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ের রেজিস্টার বদরুল ইসলাম শোয়েবের নামে যুগান্তর পত্রিকা লিখেছে

“এদিকে নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর অনেকটা প্রভাব খাটিয়ে একাডেমিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে সিলেটে কৃষি বিদ্যালয়ের (সিকৃবি) রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়া বদরুল ইসলাম শোয়েবকে। কারণ তিনি মন্ত্রীর আস্থাভাজন। নিয়োগ পেয়েই বদরুল ইসলাম শোয়েব বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই ‘এডহক’ ভিত্তিতে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।”

এই অভিযোগের উত্তরে যুগান্তর পত্রিকার প্রতিবেদক কে বলতে চাই “অনেকটা প্রভাব” এই শব্দবন্ধ দিয়ে আসলে প্রতিবেদক কি বুঝাতে চেয়েছেন? একজন ডেপুটি রেজিস্টার পদোন্নতি পেয়ে রেজিস্টার পদ লাভ করতেই পারে। এতে নীতিমালা লংঘন কি করে হলো তা কিন্তু যুগান্তর পত্রিকা পরিষ্কার ভাবে বর্ণনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরের লাইনেই যুগান্তর পত্রিকা অভিযোগ করে বদরুল ইসলাম শোয়েব রেজিস্টার পদে আসীন হয়েই নাকি ছাত্রলীগকে নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। যুগান্তর পত্রিকার মতো একটি পত্রিকা যখন এমন হাস্যকর দুর্বল অভিযোগে কাউকে আক্রান্ত করতে চায় তখন বিষয়টা আর হাস্যকর থাকেনা বরং ঘৃণার উদ্রেক করে বৈকি। বদরুল ইসলাম শোয়েব যদি মন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়েই থাকেন তবে তো উনি ডেপুটি রেজিস্টার থাকা কালেও প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য করতে পারতেন। মন্ত্রীর আস্থাভাজন বলে কথা। যুগান্তর পত্রিকা এর পরের অভিযোগে বলেছে মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়াই এডহক ভিত্তিতে নাকি কর্মকর্তা কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন সিকৃবির রেজিস্টার বদরুল ইসলাম শোয়েব। মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ছাড়া যদি কেউ অবৈধ ভাবে নিয়োগ দিয়ে থাকে তবে সেটা কেনো মঞ্জরী কমিশন বাতিল করলোনা। অধিকন্তু, মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন নেই এই মর্মে কেনো কোনো প্রজ্ঞাপনের নতি যুগান্তর তাদের সংবাদে উপস্থাপন করলো না। সুতরাং এই বিষয়েও খটকা থেকেই যায়।

যে কোনো সংবাদের সব চেয়ে দুর্বল অংশ হলো “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” অনলাইনে মিথ্যা অসত্য বানোয়াট সংবাদ পত্রের ভুয়া নিউজে আমরা অহরহ দেখতে পাই “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বিষয়টি। এর অর্থ হলো নাম প্রকাশের অনিচ্চুকের দোহাই দিয়ে প্রতিবেদক মনগড়া যা ইচ্ছা তাই লিখে নিতে পারেন।

সংবাদের একটা অংশে প্রতিবেদক বলেছেন বদরুল ইসলাম শোয়েব পেশী শক্তি দেখিয়ে ১০ জন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা নিয়োগ করেছেন, এর মধ্যে নাকি দুই জন কোনো এক ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মেয়ে, আর আরেকজনের পরিবার নাকি বিএনপি মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমার ভাবতেই অবাক লাগে দেশের একটি তথাকথিত প্রধান দৈনিক পত্রিকা ধরেই নিচ্ছে যে কোনো মেয়ের বাপ যদি কোনো ইউনিয়নের সাবেক বিএনপির সভাপতি হন এবং তার মেয়ে যদি মেধাবী এবং যোগ্য হয় তবুও সে চাকুরী থেকে বঞ্চিত থাকবে।

সারা সংবাদে বলা হয়েছে বদরুল ইসলাম শোয়েব ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে দলীয় প্রভাব এবং মন্ত্রীর আস্থাভাজন হিসাবে পেশী শক্তি দেখিয়ে অবৈধ নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন । আবার সংবাদের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে বদরুল ইসলাম শোয়েব নাকি বিএনপি ভাবাপন্ন মানুষদের চাকুরী দিচ্ছেন । যা প্রতিবেদনের স্ববিরোধিতার সামিল। একজন লোককে এক দিকে অভিযোগ করা হচ্ছে তিনি দলবাজি করছেন ছাত্রলীগ কে ব্যবহার করে, অন্যদিকে তাকে অভিযুক্ত করছেন বিএনপি পরিবারের দুজন লোক নিয়োগ দান করেছেন বলে। যা পরিষ্কার প্রতিবেদকের উদ্দেশ্য কে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পুরা সংবাদ পরে মনে হলো আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত পুরো সংবাদটি অসামঞ্জ্যতায় পূর্ন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বেসর্বা হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন রেজিস্টারকে। যেখানে ভিসি প্রো ভিসি, নিয়োগ কমিটি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিষয় পরিচালনার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা কমিটি। এই এতো সব কমিটির মধ্যে কি একজন ও শিক্ষক নাই যিনি হুইসেল ব্লোয়ার হিসাবে বদরুল ইসলাম শোয়েবের সকল দুর্নীতির স্বাক্ষ্য দেবেন ? এতো বড়ো একটি দৈনিকের প্রতিবেককে কেনো তবে ” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” নামক দুরভিসন্ধি মূলক শব্দবন্ধ ব্যবহার করে অসামঞ্জস্যপূর্ন সংবাদ পরিবেশন করতে হবে ?

কোন এক মনীষী বলে গেছেন “আগের যুগে ধনী মানুষ ধনসম্পদ এবং জানমাল রক্ষার জন্য কুকুর পোষতো, আর এখন পোষে সাংবাদিক” আমার এই উদ্বৃতিতে হয়তো আমার অনেক সাংবাদিক সহকর্মী আছেন যারা অন্তরে ব্যাথা পাবেন। তাদের কাছে আমি আগেই ক্ষমা প্রার্থী। তবে এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে এই দেশে প্রবীর শিকদারের মতো দেশপ্রেমিক সাংবাদিক যেমন আছেন তেমনি মাহমুদুর রহমানের মতোও সাংবাদিক আছে যারা দলীয় স্বার্থে দেশের ক্ষতি করতে পিছপা হবে না।

কোনো ধরণের ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কাউকে হেয় প্রতিপন্নকরা সাংবাদিকতার কোনো সংজ্ঞায় পড়ে না বলেই জানি। দেশের একটি প্রধান দৈনিক থেকে তো নয়ই। হয়তো আপনাদের অনেকেই বলবেন যে যুগান্তরের বিরুদ্ধে কেনো অভিযুক্ত মানুষটি মামলা করছেন না। এই বিষয়ে আমার একটি গল্প মনে পড়লো। তখন আমি মেসে থাকি। সুনামগঞ্জের একেবারে শেষ প্রান্তের উপজেলা ধর্মপাশা। সুনামগঞ্জ শহর থেকে ধর্মপাশা যাওয়ার একমাত্র বাহন লঞ্চ। যা আটঘন্টায় পৌঁছতো ধর্মপাশা গিয়ে। তো ওই এলাকার এক মামলাবাজ কুমতলবি লোক ছিলো। যে যেকোনো কাজে সুনামগঞ্জ এলে তার নিজের এলাকার কারো নামে একটা মামলা করে যেতো। মামলা করেই তো সে খালাস। কিন্তু আসল কষ্টটা ভোগ করতো সেই নির্দোষ অভিযুক্ত ব্যাক্তি। নিজের নানা ধরণের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ফেলে কয়েকমাস তো তাকে হাজিরা দিতেই হতো। আট ঘন্টা জার্নি করে কোর্টে আসা যাওয়াই হতো সবচেয়ে বেশি কষ্টের।

আগেই বলেছি অভিযোগ যে কেউ করতে পারে। তবে দোষী প্রমান করতে হয় অভিযোগকারীকেই। কিন্তু ভিত্তিহীন অসামঞ্জস্যপূর্ণ সংবাদ পরিবেশন করে যুগান্তর তাদের অপেশাদার ও অবান্তর সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছে যা দেশের গণমাধ্যমের জন্যঅশনি সংকেত বহন করছে। দেশের একটি প্রধান দৈনিকের যদি এই অবস্থা হয় তবে বাকিদের অবস্থা কি তা সহজেই অনুমেয়। সারা দেশের সুস্থধারার গণমাধ্যম কর্মীরা যেখানে বাক স্বাধীনতার জন্য ক্রমাগত আওয়াজ তুলছে সেখানে যুগান্তরের এহেনো স্ববিরুধী এবং প্রোপাগান্ডা মূলক সংবাদ আসলে গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে করি।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী ও ব্লগার

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *