জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারবে?


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সহিংসতার শিকার লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিমের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে আজ আরো পরের দিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এক জরুরী আলোচনা হবে।

এই বৈঠকের একদিন আগেই জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান বলেছেন, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান বলতে যা বোঝায় – রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাদের আক্রমণে ঠিক তাই ঘটছে।

তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাধারী স্থায়ী সদস্যদের অন্যতম চীন ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছে যে তারা মিয়ানমারের সরকারের তাদের ভাষায় ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার’ পদক্ষেপকে পুরোপুরি সমর্থন করে।

এমন অবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করতে পারবে?

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. আলী রীয়াজ মনে করেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উঠছে, এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

“যে পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে পাঠ্যবইয়ে ‘জাতিগত নিধনের’ উদাহরণ হয়ে উঠছে এই ঘটনা। এর মানবিক দিকের পাশাপাশি কূটনৈতিক দিকও আছে। আর বিরল ঘটনা হলো জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছে নিরাপত্তা পরিষদকে আলোচনায় বসতে।শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিকীকরণ হলো। এর আগেও আলোচনা হয়েছে তবে এই আলোচনার গুরুত্ব অপরিসীমকিন্তু ভেটো ক্ষমতাধারী স্থায়ী সদস্য চীন যখন মিয়ানমারের সরকারকে স্পষ্টভাবেই সমর্থন দিয়েছে, ফলে এখানে কি আসলে কোন প্রস্তাব পাস করানো যাবে?

রীয়াজ বলছেন “এমন সম্ভাবনা কম। ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে আলোচনা উঠেছিল, চীন ও রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করেছিল। চীনের আজকের অবস্থানও স্পষ্ট। কিন্তু জাতিসংঘে কোনো প্রস্তাব পাশ না হলেও আলোচনাটা গুরুত্বপূর্ণ”।এটা স্পষ্ট হচ্ছে এ মানবিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের এককভাবে যতটুকু করার তারা করছে বটে, এ অবস্থায় গোটা আন্তর্জাতিক সমাজের একটা ভূমিকা আছে এবং সেই ভূমিকার স্বীকৃতি আজকের বৈঠকটা”-বলছিলেন মি: রীয়াজ।তাহলে নিরাপত্তা পরিষদে যদি কোন নিন্দা প্রস্তাব পাস না-ই হয়, তাহলেও কি বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো অন্য কোনভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে?

আলী রীয়াজের মতে “পারবে, যদি তারা উৎসাহী হয় পারবে। বিভিন্ন রকম কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া যেতেই পারে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভর করতে হবে তা নয়। সাধারণ পরিষদের বৈঠক হতে যাচ্ছে। বেশিরভাগ সদস্য যদি নিন্দা প্রস্তাব দেয় তাহলে একটা চাপ তৈরি হবে।এছাড়া আসিয়ান এক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্নভাবে চাপ তৈরি করা যেতে পারে-অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক চাপ হতে পারে।তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান নিতে হবে।আলী রীয়াজ মনে করছেন বাংলাদেশ অত্যন্ত দুর্বল কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে।এখন পর্যন্ত তাদের উদ্যোগ আমার দুর্বল মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ যে মানবিক ভূমিকা নিয়েছে সেটা নি:সন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক হলেও নিউইয়র্কে কেন বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি নেই?

সেখানে তারা উপস্থিত থাকলেও সেটা স্পষ্টভাবে কেন বলা হচ্ছে না -আমরা,বাংলাদেশ সেখানে উপস্থিত হয়েছি, এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় আর নেই-এটা বাংলাদেশকেই বলতে হবে। আর কেউ বলবে না।অন্য দেশের কাছ থেকে সমর্থন আদায় করা, তাদের মধ্য থেকে চাপটা আরো বেশি তৈরি করা-এই উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশের আরো বেশি দৃশ্যমান কূটনৈতিক উদ্যোগ দরকার। এখনও সময় আছে , অব্যাহতভাবে এটি করতে হবে”- বলেন আলী রীয়াজ।

শরণার্থী রোহিঙ্গা পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কোথায়?

সপ্তাহখানেক আগে টেকনাফের কুতুপালং ক্যাম্পে এসেছেন আলমাস খাতুন। এখনো থাকার বন্দোবস্ত হয় নি। ক্যাম্পে এক পরিচিতজনের সাথে আছেন। জানতে চেয়েছিলাম তার সাথে পরিবারের আর কে কে এসেছেন বাংলাদেশে।আলমাস খাতুন বলছিলেন তার স্বামী এবং একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এরপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ধরে নিয়ে গেছে। তিনি জানেন না আদেৌ তারা বেঁচে আছেন কিনা।আলমাস খাতুনের মত অনেক নারী ও শিশু বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবারের পুরুষ সদস্যরা তাদের সাথে আসে নি। তাহলে তাদের পরিণতি কি হয়েছে?

রাখাইন রাজ্য থেকে আসা আরেক জন নারী শরণার্থীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমার সাথে কথা বলার সময় তিনি কান্নায় ভেংগে পড়ছিলেন।এই নারী বলছিলেন তার স্বামী এবং তার তিন ছেলেকে তার সামনেই হত্যা করা হয়েছে। দুই ছেলে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে গুলি করা হয়। সেখানেই মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়ে।তিনি আরো বলছিলেন পৃথিবীতে এখন আমার কেউ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে।গত ২৫শে অগাষ্ট হতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজারের বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে বলে ধারণা করছে ত্রাণ সংস্থাগুলো। কিন্তু স্থানীয় মানুষ এবং জনপ্রতিনিধিরা বলছে শরণার্থীর সংখ্যা আসলে সাড়ে ৫ লাখের বেশি।

এই বিপুল সংখ্যাক শরণার্থীর বড় অংশই নারী এবং শিশু।পালিয়ে আসা এসব মানুষ বলছে তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বেশির ক্ষেত্রেই হত্যা করা হয়েছে। অথবা নিখোঁজ আছে।মোহাদ্দেসা নামে এক নারী বলছেন তার স্বামী, এক ছেলে এবং শ্বশুরকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। তিনি বলছিলেন সেনাবাহিনীর সন্দেহ ছিল তার স্বামী আল ইয়াকিন নামের একটি গ্রুপের সদস্য।মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের উপর হামলার কারণ হিসেবে আরাকান রোহিংগা স্যালভেশন আর্মি বা আরসাকে দায়ি করছে। এই সংগঠনটি স্থানীয় ভাবে হারাকাহ আল ইয়াকিন নামে পরিচিত ছিল।তবে স্থানীয় ভাবে একটা গুঞ্জন রয়েছে বেশ কিছু পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মিয়ানমারে রয়ে গেছেন তাদের ভাষায় লড়াই এ অংশ নেয়ার জন্য। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছেন আবুল কালাম। তিনি অবশ্য এই তথ্যকে নাকচ করে দিলেন।তিনি বলছিলেন তাকে গুলি করার সময় তারা বলেছে এই দেশ মুসলমানদের জন্য নয়।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *