বাঙ্গালীর একুশ এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page


Matiar chowdhury  মতিয়ার চৌধুরী

 

Womenএকুশ মানে চেতনা-একুশ মানে মুক্তি, আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে একুশ বিভিন্ন ভাবে জড়িয়ে আছে। দিনটি একদিকে যেমন আনন্দের অন্যদিকে বেদনারও বটে। বাঙ্গালীর আত্মত্যাগের বিনিময়ে একুশ ফেব্রুয়ারী আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্বের সকল ভাষাভাষি  মানুষ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপন করছে।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর  বাংলাদেশের জাতীয় শোকদিবস ২১ ফেব্রয়ারীকে ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করার পর থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষ এ-দিনটিকে যার-যার মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছেন। হোক ভাষাটি বাংলা-সিলেটী গুজরাটি, হিন্দি, ইংরেজী কিংবা আরবী। আমাদের জন্যে দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যময় কেননা আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আর এই বাংলাভাষাকে তৎকালীন পূর্বপাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে  কত প্রাণের আত্যাহুতি দিতে হয়েছে।

রাষ্ট্রভাষা এবং মার্তৃভাষা

রাষ্ট্রভাষা আর মার্তৃভাষা এক জিনিষ নয়। ভাষা বিজ্ঞানীরা এভাবেই  সজ্ঞা দিয়েছেন, মানুষ জন্মের পর মায়ের কাছ থেকে  যে ভাষায় কথা বলতে শেখে তার নাম মাতৃভাষা। রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার জন্যে সকলের বোধগম্য এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার ব্যবহৃত ভাষাকে সকলের মতামতের উপর গুরুত্ব প্রদান করে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে  শিক্ষা,অফিস-আদালত সহ রাষ্ট্রীয় কাজে যে ভাষার প্রচলন করা হয় তার নাম রাষ্ট্রভাষা। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই একাধিক ভাষার প্রচলন রয়েছে । যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজী এবং হিন্দি, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, গ্রেট ব্রিটেনে ইংরেজী  ইত্যাদি ছাড়াও বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা রয়েছে।

মাতৃভাষার বিকল্প নেই

মাতৃভাষার কোন বিকল্প নেই । পৃথিবীর যে কোন ভাষাকে আয়ত্ব করতে হলে  সর্বপ্রথম প্রয়োজন মাতৃভাষার। আর একারণেই মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত আমরা বাঙ্গালীরা এ দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। ভাষার জন্যে বাঙ্গালী ছাড়া আর কোন জাতি রক্ত দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাই বিশ্ববাঙ্গালীর কাছে এ দিবসটির গুরুত্ব অসীম। কেননা ভাষার জন্যে বাঙ্গালীর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি স্বরূপ পৃথিবীর সকল মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ইউনেস্কো কর্তৃক ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ২১ ফেব্রয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।  আমাদের কাছে এ দিনটি আনন্দ এবং বেদনার। সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষা  প্রতিষ্ঠিত করতে ১৯৪৮-থেকে শুরু করে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ভাষার জন্যে যে আন্দোলন হয় সেটি ছিল মূলতঃ রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন।  অত্যন্ত দুঃখ জনক হলেও সত্যি যে কোন কোন ইতিহাসবিদ এর আসল সত্যকে আড়াল করে মনগড়া ভাবে লিখে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। আমাদের উচিত এর সঠিক ইতিহাস ভবিষৎ প্রজন্মকে জানানো। যদি আমরা এর আসল সত্য তুলে ধরতে ব্যর্থ হই তাহলে ভাষা শহীদের আত্মা কষ্ট পাবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার  স্বীকৃতি আদায়ে সরকারী তৎপরতা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার  স্বীকৃতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিশ্রমের ফসল। বিষয়টি পরিস্কার করা দরকার। না হয় ভবিষ্যৎতে তা বিকৃত হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায় করতেও আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, লবিং কুঠনৈতিক প্রচেষ্টা ছাড়া তা এমনি এমনি আসেনি। এর কৃতিত্বের দাবীদার জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় দেশে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলে হয়তোবা দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা পেতোনা। সালাম ও বরকত নামের আমেরিকা প্রবাসী দুই কৃতি বাঙ্গালী এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসেবে  স্বীকৃতি  দিতে জাতিসংঘে দাবী উত্থাপন করলে এনিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়। তারা  দেশে সরকারের সাথে যোগাযোগ করলে  তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরবর্তিতে লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার জনাব সাইদুর রহমান খানের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পাঠান এই প্রতিনিধি দল লবিং এর মাধ্যমে আমাদের দাবীটি আদায় করতে সক্ষম হয়। অধ্যাপক সাইদুর রহমান লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমি তার একটি সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তিনি আমাকে জানান,  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তারা  আন্তর্জাকিভাবে লবিং শুরু করলে কয়েকটি দেশ আমাদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে এবং পরবর্তিতে সব সদস্য দেশের সমর্থনে বাঙ্গালীর জাতীয় শোক দিবস একুশ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। শুধু এই স্বীকৃতি আদায় নয়, শেখ হাসিনার সরকার ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সিটিউিট প্রতিষ্টার মাধ্যমে ভাষা নিয়ে গবেষণারও বিরাট সুযোগ করে দিযেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে নৃতাত্বিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী সহ প্রায় চল্লিশটি‘রও বেশী ভাষা রয়েছে, বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিটি মাতৃভাষার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

 কেন ভাষার জন্যে আন্দোলন

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হলে আজকের বাংলাদেশ পূর্বপাকিস্থান হিসেবে পাকিস্থান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। তখন বর্তমান সিলেট বিভাগের একটি অংশ  গণভোটে আসাম প্রদেশ থেকে তথাকথিত  পূর্বপাকিস্তানের  সাথে যুক্ত হয়। ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যার উপর সকল দেশের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারিত হয়। জন্মলগ্নে নবগঠিত পাকিস্থান রাষ্ট্রের পূর্ব এবং পশ্চিম মিলিয়ে বাংলাভাষা ব্যবহার কারীর সংখ্যাই ছিল বেশী। সেই দিক বিবেচনায় বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র্রভাষা করাই ছিল যুক্তিযুক্ত। কিন্তু তা না-করে পশ্চিমারা  উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

পাকিস্থানের ৮% মানুষ উর্দুব্যবহার করে

আজও পাকিস্তানের মানুষ উর্দুতে কথা বলে না । অধিকাংশ পাকিস্তানী  পাঞ্জাবী-পুস্তু-বেলুচ এবং হিন্দি ভাষাতে কথা বলতে অভ্যস্থ। তাদের যুক্তি ছিল যেহেতু পাকিস্থান মুসলিম রাষ্ট্র সে কারনে রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু।  এখানে আরেকটি কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়, আজও পাকিস্তানের মানুষ উর্দুতে কথা বলেনা। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮%  উর্দুতে কথা বলে। একই সময়ে স্বাধীন হওয়া ভারতের রাষ্ট্রভাষা করা হয় হিন্দি। ধর্মান্ধ পাকিস্তানপন্থীদের অনেকেরই  ধারনা হিন্দি বলতে হিন্দুদের ভাষা বুঝায়।  এখানেই শেষ নয় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রয়ারী  পাকিস্তানের সংবিধান তৈরীর জন্য  গণপরিষদের  বৈঠকে  কুমিল্লার সন্তান বাবু শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত (পরবর্তিতে ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ)  ইংরেজী ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে সাংবিধানিক ভাষা হিসেবে অর্ন্তভুক্তির  দাবী জানান, সেখানে তার দাবী প্রত্যাখ্যাত হয়। একই সনের ১১ মার্চ তৎকালীন ছাত্র সমাজ ঢাকা শহরে প্রথম রাষ্ট্রভাষা  দিবস পালন করে।

পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্থানের বুদ্ধিজীবি মহলে এ নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠে। কিন্তু কোন ধরনের মতামতের তোয়াক্কা না-করেই  পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্না   ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এসে  ঘোষনা করলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। রমনা মাঠের জন সভায় তার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো  ( উর্দু উইল বি দি ষ্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ  অব পাকিস্তান। ) ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আবার একই কথা উচ্চারণ করেন তিনি।  জিন্নার এ বক্তব্যে বাংলার জনগণ খুবই মর্মাহত হয়। তারা  মেনে নিতে পারেননি জিন্নার অযৌক্তিক ঘোষণা। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মাতৃভাষা যেহেতু বাংলা, সুতরাং বাংলাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে  হবে, এমন দাবি সবার।  রাষ্ট্রভাষা ইস্যু নিয়ে মনোমালিন্য চলতে থাকে। ভাষা নিয়ে জিন্নার ঘোষণা  পূর্ববাংলার জনসাধারণকে  হতাশ করে। সমগ্র ঢাকা জুড়ে অনুষ্ঠিত হয় বিক্ষোভ কর্মসুচী।  পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে খাজা নাজিম উদ্দিনের একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলে আটক থাকলেও কারাগার থেকে বিভিন্ন ভাবে নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং বাংলার পক্ষে কাজ করার নির্দেশ প্রদান করেন।  এ নিয়ে সচেতন মহলে শুরু হয় চিন্তা-ভাবনা।

১৯৫১ এবং ১৯৫২

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত  বাংলার মানুষ প্রতি বছর ১১ মার্চকে রাষ্ট্রভাষা দিবস হিসেবে পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারী  পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন  মুসলিমলীগের ঢাকা অধিবেশেনে আবার উচ্চারণ করেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা  হবে উর্দু।  তার এই বক্তব্যের  পর বাংলার মানুষ একই দাবীর পক্ষে সংগঠিত হতে থাকে। এর সূত্র ধরে ৪ ফেব্রয়ারী ঢাকা শহরে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট  পালিত হয়।  ১১ ও ১৩ ফেব্রয়ারী কালো পতাকা দিবস পালিত হয়। ২০ ফেব্রয়ারী দেশব্যাপী ডাক দেয়া হয়  সাধারন ধর্মঘটের।  আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশে।  প্রতিটি জেলা এবং গ্রামেগঞ্জে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আন্দোলন গড়ে তোলে ভাষাপ্রেমীরা। ঐ দিন কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ও প্রাদেশিক সরকারের মূখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন সারাদেশে  ১৪৪ ধারা জারি করেন। ২১ ফেব্রয়ারী  ১৪৪ ধারা অমান্য করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবীতে পাকিস্তানী পুলিশের গুলিতে শহিদ হন আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত. রফিক উদ্দিন  সহ কয়েকজন।  ২২ ফেব্রয়ারী সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকায় পুলিশ অবারও মিছিরের উপর গুলি চালালে ঘটনাস্থলে শহীদ হন,  শফিউর রহমান, আব্দুল আউয়াল ও আব্দুর রহিম।  ২৩ ফেব্র“য়ারী ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা  সাঈদ হায়দারের নকশানুযায়ী ১১ ফুট দৈর্ঘ প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ২৪ ফেব্র“য়ারী শহীদ শফিউর রহমানের পিতা এর উদ্ভোধন করেন।

আসাম ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা

অনেকেই যে কথাটি জানেননা, আবার আধুনিক ইতিহাসবিদদের  কেউ কেউ যে বিষয়টি সুকৌশলে এড়িয়ে যেতে চান তাহলো ভাষার আন্দোলনে সিলেটিদের অবদান।  বাংলাদেশের বাইরে যত শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা-ও সিলেটেীদের দ্বারা। এই বিলেতের শহীদ মিনার গুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিলেত প্রবাসী ব্রিটিশ সিলেটীদের পরিশ্রমেই এগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । কোন আন্দোলনই হঠাৎ করে গজিয়ে উঠেনা।  এর পেছনে সুনিদৃষ্ট কিছু কারণ চিন্তা চেতনা জনমত গঠন এবং কর্মের প্রয়োজন হয়। প্রাথমিক পর্যায় যারা কোন একটি আন্দোলনের  বীজ বপন করেন  নিঃসন্দেহে তারা দুরদৃষ্টি সম্পন্ন। একটা প্রবাদ আছে ‘শ্রীহট্টে মধ্যমা নাস্তি’।  ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ সত্যটি প্রত্যক্ষ করা যায় । ভাষা আন্দোলন শুধু ঢাকা বা সিলেটে সীমাবদ্ধ রয়নি  এর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।  এই আন্দোলনে সিলেটের অবদানকে সাংবাদিক গবেষক আব্দুল হামিদ মানিক তিন ভাগে ভাগ করেছেন। সেটা হলো ১৯৪৮ পূর্ববর্তি, ১৯৪৮ এবং ১৯৪৮ পরবর্তি ১৯৫২ সালের মার্চ পর্যন্ত। আর এই তিন পর্যায়েই সিলেট বাসীর ভূমিকা অগ্রণী।

প্রকৃত সত্য ঘটনাটি উদ্ধারের জন্যে  আমি এখানে বিষয়টা পরিস্কার করতে চাই।  কোন কোন লেখক ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লিখছেন, সুকৌশলে আসল সত্যটাকে আড়াল করে।  সময়টা ১৯২৩ সাল।  সমগ্র ভারতে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের।  সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার মাইজবাগ গ্রামের মখফুর আলী আমিন নামে একজন খেলাফত কর্মী ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী ভুমিকার কারণে তার বাড়ীতে পুলিশী অভিযান চালানো হয়। আর যে পুলিশ কর্মকর্তা  অভিযান পরিচালনা করেন তার নাম আব্দুল হামিদ আখন্দ। পুলিশ মখফুর আলীর বাড়ী তল্লাশী করতে গিয়ে পবিত্র কোরআন শরীফের অবমাননা করে। এমনকি মাটিতে ফেলে কোরআন ছিড়ে ফেলে। এই কোরআন অবমাননার সংবাদটি সিলেট থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক জনশক্তি পত্রিকায় ছবিসহকারে  ছাপা হয়।  ঘটনার তিন বছর পর গোলাপ গঞ্জের রণকেলি গ্রামের সন্তান তৎকালীন আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য আব্দুল হামিদ চৌধুরী সোনা মিয়া আসাম ব্যবস্থাপক সভায় বিষযটি উত্থাপন করেন। তখনকার সময়ে আসাম ব্যবস্থাপক  সভায় ইংরেজীতে কথা বলার রেওয়াজ ছিল। ব্যবস্থাপক সভার সদস্য সোনা মিয়া যখন  শুদ্ধ বাংলায় বক্তব্য রাখছিলেন ¯স্পীকার তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ইংরেজীতে বলার পরামর্শ দেন। তখন ব্যবস্থাপক সভার সিলেটী সদস্যরা একযোগে উঠে স্পীকারের কথার প্রতিবাদ করে  বলেন এই অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা  সিলেটী হলেও অফিস-আদালত সহ রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলা ব্যবহার করেন। সুতরাং তাকে শুদ্ধ বাংলাতে কথা বলার  অনুমতি দেয়া হউক। অনেক যুক্তি তর্কের পর স্পীকার তাকে বাংলায় কথা বলার অনুমতি দেন। এর পর থেকে আসাম ব্যবস্থাপক সভার  সিলেটী সদস্যরা বাংলাতেই কথা বলতেন।  সেদিন যে সব সিলেটী সদস্য উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ছিলেন আব্দুর রশিদ চৌধুরী, দেওয়ান আব্দুল বাসিত, ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী, বিপীন চন্দ্র পাল, মোদাব্বির হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হমিদ চৌধুরী প্রমুখ। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা যুক্তিতর্কের পর  আসাম ব্যবস্থাপক সভায় আইন পাশ হয় ইংরেজীর পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় কাজে বাংলা ব্যাবহার করা হবে।  এদিন থেকে আসাম প্রাদেশিক ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৪৭ সালে সিলেট থেকে ভাষা আন্দোলন

১৯৪৭ সালে ভারত  বিভাগের পর সিলেট থেকেই ভাষা আন্দোলনের সূচনা করা হয়। এখানে আরেকটা কারণ ছিল যখন ভারত বিভক্ত হয় তখন গণভোটের মাধ্যমে  সিলেটের একটি অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের সাথে যুক্ত হয়,  যা বর্তমান সিলেট বিভাগ।  এমনকি এই গণভোট নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।  কংগ্রেস এবং  জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এর সমর্থকরা  সিলেটকে পাকিস্থানের অন্তর্ভূক্তি মেনে নিতে পারেননি। তাদের অভিযোগ ছিল ভোট ডাকাতির মাধ্যমে সিলেটকে পাকিস্থানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এমনকি বিবেকবান মুসলীমলীগ কর্মীরাও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তাদের যুক্তি ছিল   পাকিস্থান সরকার সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের ভাষার প্রতি সম্মান না দেখিয়ে সাম্প্রদায়িক ভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।  সিলেটের সাংবাদিক, সাহিত্যক  সচেতন ছাত্র সমাজ  গোড়াতেই  সোচ্চার হয়ে উঠেন।  সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম  সাহিত্য সংসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা  মুহম্মদ নুরুল হক সম্পাদিত মাসিক আল-ইসলাহ,  দার্শনিক দেওয়ান আজরফ সম্পাাদিত  ও মাহমুদ আলীর পরিচালনাধীন (  সুনামগঞ্জের জনাব মাহমুদ আলী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায় স্বাধীনতার পর পাড়ি জমান পাকিস্তানে, সেখানেই মৃত্যু বরন করেন।)   সাপ্তাহিক নওবেলাল সে সময় বাংলার পক্ষে  সাহসী এবং স্পষ্ট ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালে নওবেলাল যে সময়  বাংলার পক্ষে  জোর আওয়াজ তুলে তখনও ঢাকা থেকে কোন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ হয়নি। বলতে গেলে   ১৯৪৮ সনে পূর্ববঙ্গে ভাষা আন্দোলনের একমাত্র মুখপত্র হয়ে উঠে ছিল সিলেটের নওবেলাল।  এর প্রভাব সিলেট সহ সারা বঙ্গেই পড়েছিল। ১৯৪৮ সালের পূর্বে নবগঠিত পাকিস্থান রাষ্ট্রের ভাষা কি হবে সেটা নিয়ে কেউ ভাবেননি। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ জিয়া উদ্দিন দৈনিক আজাদে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করলে  ডঃ মুহম্মদ শহিদুল্লা  জিয়া উদ্দিনের যুক্তিকে খন্ডন করে একটি নিবন্ধ লিখেন। ১৯৪৭ সালের  সেপ্টেম্বরে   সিলেটের সন্তান অধ্যাপক সাহেদ আলীর পরিচালনাধীন ঢাকার তমদ্দুন মজলিশ   পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু নামক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। একই সনের ৯ই নভেম্বর  সিলেট আলীয়া মাদ্রাসা হলে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের বার্ষিক সভায়  ছাতকের ছৈলার তৎকালীন শিক্ষা অফিসার মুসলিম চৌধুরী   রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে একটি প্রবন্ধ  উপস্থাপন করেন, ।’ঐ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেটের আরেক কৃতিপুরুষ সৈয়দ মুজতবা আলী। সে দিন মুসলীমলীগ পন্থীরা অনুষ্ঠান বানচালের চেষ্ঠা করে ব্যর্থ হন।  সৈয়দ মুজতবা আলী অত্যন্ত সাহসি ভূমিকা পালন করেন। সভাস্থলে একজন অধ্যাপক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আরবী করার পক্ষে বার বার শ্লোগান দিয়ে অনুষ্ঠান পন্ড করার চেষ্ঠা করেন। একদিকে সরকারী চাকুরী অন্যদিকে শাসক দলের হুমকি  সব রকম ভয়ভীতি উপেক্ষা করে মুসলিম চৌধুরী যে প্রবন্ধটি সমাবেশে পড়েন  তা পরবর্তিতে মাসিক আল-ইসলায় প্রকাশিত হয়।  প্রবন্ধটি এখনও স্বযত্নে মুসলিম সাহিত্য সংসদে রক্ষিত আছে। আল-ইসলাহ সম্পাদক  জনাব নূরুল হক সাহেব সারা বাংলাদেশে পত্রযোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের সর্বত্র  গ্রামে-গঞ্জে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে মিছিল মিটিং অব্যাহত থাকে। প্রতিটি সভা-সমাবেশের সংবাদ আল-ইসলাহ পত্রিকায় ছাপা হয়। যা এখনও মুসলিম সাহিত্য সংসদে রক্ষিত রয়েছে। এই আন্দোলনে সে সময়কার রাজনৈতিক এবং ছাত্র নেতা যাদের প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে তাদের অনেকেই আজ  ইহজগতে নেই।  তাদের মধ্যে সাহিত্যিক মতিন উদ্দিন আহমদ, ডঃ সৈযদ মুজতবা আলী, মৌলানা ইব্রাহিম চতুলী,  মৌলানা শাখাওয়াতুল আম্বিয়া, সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী, কমরেড আসাদ্দর আলী, জননেতা পীর হবিবুর রহমান, এ  আব্দুল নূর চৌধুরী-রফিকুল হক চৌধুরী, দেওয়ান মুজিবুর রহমান, মৌলানা রেদওয়ান উদ্দিন চৌধুরী, এএইচ সা-আদাত খান, বেগম জোবেদা রহিম চৌধুরী, সৈয়দা সাহেরা ভানু, সৈয়দা লুৎফুন্নেছা খাতুন, মাহবুব আলী, আব্দুল হাই (সুনামগঞ্জ) দেওয়ান মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল বারী চৌধুরী, বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বেগম হাজেরা মাহমুদ ও দেওয়ান ওহিদুর রেজা  প্রমুখের নাম  উল্লেখ যোগ্য।

চট্রগ্রামে সাংস্কৃতিক সম্মেলন  ঢাকার পল্টন ময়দানে সমাবেশ

ঢাকাতে  ১৯৫১ সালের ২৩ ফেব্রয়ারী ডঃ শহিদ উল্লা, ইব্রাহিম খা সহ দেশের বুদ্ধিজীবিরা পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রীর কাছে স্মারক লিপি প্রদান করেন।  ১৯৫১ সালের ১৬ থেকে ১৯ মার্চ চট্রগ্রামে  পূর্বপাকিস্থান সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে দাবী তোলা হয়। ১৯৫১ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার পলটন ময়দানে  অনুষ্ঠিত হয় সমাবেশ। ৭ ফেব্রয়ারী গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।  এমনটিই ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

বর্তমানে পৃথিবীতে আট হাজারেরও বেশী ভাষা রয়েছে। বহু ভাষা রয়েছে যাদের নিজস্ব কোন লেখ্য রুপ  নেই, সেদিক থেকে আমরা বাঙ্গালীরা খুবই ভাগ্যবান। বাংলাভাষার দুধরনের বর্ণমালা রয়েছে একটি হলো বাংলা অন্যটি বাংলার দ্বিতীয় রুপ সিলেটী হরফ বা কেউ সিলেটী নাগরীও বলে থাকেন।

যারা ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তাদের অনেকেই আজ নেই। যারা জীবিত আছেন তাদেরকে দলমতের উর্ধে থেকে মূল্যায়ন করা উচিত।  আসুন আমরা সবাই মিলে ভাষা শহীদদের জন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা জানাই। আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস অমর হউক।

 (তথ্য সূত্র: ধারাবাহিক নিবন্ধ ইতিহাস: মনির উদ্দিন চৌধুরী , সিলেট সমাচার ১৯৮০, মতিয়ার রাহমান চৌধুরী ২১ফেব্রয়ারী সংখ্যা  সাপ্তাহিক চিত্রকল্প ঢাকা ১৯৮১, রফিকুর রহমান লজু ২১ সংখ্যা দৈনিক সিলেটের ডাক‘২০০৩, মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস: রব্বানী চৌধুরী, আগামী প্রকাশনী ঢাকা ২০০০, মাসিক আল ইসলাহ মরহুম নুরুল হক সম্পাদিত ১৯৫৪ ফেব্রয়ারী সংখ্যা, আব্দুল হামিদ চৌধুরী সোনামিয়া- রফিক আহমদ চৌধুরী, সিলেট ১৯৮৭, ভাষা আন্দোলনে সিলেটের অবদান: আব্দুল হামিদ মানিক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ঢাকা-১৯৮৩।

 (লেখক: মতিয়ার রাহমান চৌধুরী, সাংবাদিক ও গবেষক)

 

 

 

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *