‘ঘরজামাই’নাটক দেখে এলাম


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Hamid Muhammed হামিদ মোহাম্মদ 

 

‘ঘরজামাই’ নাটক দেখে এলাম ১২ নভেম্বর রোববার ব্রাডি আটর্স সেন্টারে। লন্ডনে চলছে ‘দ্যা সিজন অব বাংলা ড্রামা।’ মাসব্যাপী এ নাট্যযজ্ঞের প্রতিটি নাটক দেখার সুযোগ হয়নি। তবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘দ্যা ক্যাফে’ ও পূর্বনাটের ‘জাহাজী’ দেখেছি।
বিলেতে ‘বাংলাদেশ’—এক অভাবনীয় উচ্চারণ বা প্রতিধ্বনি কিংবা সাংস্কৃতিক অবয়ব–যা ভেসে ওঠেছে অপার এক সমুদ্রে, এ যেন আরেক স্বর্ণদ্বীপ। শত বর্ষের বাঙালি অভিবাসী সমাজ বা শত বছরে গড়ে ওঠা বাঙালির কৃষ্টি ঐতিহ্যের সোপান বিলেতে সৃষ্টি করেছে–এক বহমান সাংস্কৃতিক স্রোত, যার দ্বিধাহীন উত্তর–‘বিলেতে বাংলাদেশ’।
টাওয়ার হ্যামলেটস বারা কাউন্সিল বহুজাতিক ও বহু সাংস্কৃতিক সমাজ বিকাশে এথনিক মাইনোরিটির প্রণোদনার অংশ হিসেবে ‘দ্যা সিজন অব বাংলা ড্রাম ‘র মাসব্যাপী নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন করেছে। এ সুযোগটিই বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল।গত ১৫ বছর ধরে চলে আসছে এ পথচলা।
কতটুকু গভীরে বিলেতে বাঙালির শিকড় প্রোথিত, এটা ভাবাই যায় না–তার সামগ্রিক অবয়ব ছুঁয়ে না দেখলে। এমনই এক সাংস্কৃতিক যজ্ঞ ‘দ্যা সিজন অব বাংলা ড্রামা।’  লন্ডনে অন্তত এক ডজন ভেন্যুতে চলছে এ উৎসব। বাঙালি সংস্কৃতিকর্মীদের ঘুম নেই, কী করতে হবে, কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের ডালপালা।
4B04994B-E60D-447D-A411-A6C92B2934F7 ‘ঘরজামাই’ বিশ্বখ্যাত নাট্যকার মলিয়রের ‘জর্জেস ড্যানডিন’এর বাংলা রূপান্তর। নাটকটি বাংলায় রূপান্তর করেছেন গোলাম সরওয়ার। বাংলাদেশে গত দশকে এর বহু মঞ্চায়ন হয়েছে। বিলেতে এ প্রথম। মঞ্চায়ন করছে ’মঞ্চশৈলী’ নাট্য সংগঠন।
নাটকটি দেখতে গিয়ে হলের বাইরে জটলা দেখেই মনে হয়েছিল দর্শকের কমতি নেই। এর আগের দুটি নাটকে দর্শকের উপচে পড়া ভীড় ছিল। তৃপ্তি আর উপভোগের নানা মাত্রিক প্রকাশও কম ছিল না দর্শকের। বরং নাটক শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আড্ডার শেষ নেই। এ রকমই ঘটলো ‘ঘরজামাই’র বেলাও।
‘ঘরজামাই’ বাঙালি সমাজে ঘটে থাকা একটি পারিবারিক ব্যবস্থাপনার অবদমিত অংশ । যেখানে বর অনেকটাই নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে ফেলে। স্বাধীন স্বত্বাও লোপ পায়। কনের বাড়িতে অবস্থান, কনের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মাঝে জীবন বাধা হয়ে যায়। ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়েন যিনি ‘ঘরজামাই’ হন।
নাটকের সমগ্র কাহিনি জুড়ে রয়েছে স্থুল প্রতিপত্তির আস্ফালন, ঔপনেবেশিকতা থেকে প্রাপ্ত ভঙুর সংস্কৃতি, মেকি ও ঠুনকো আভিজাত্যের অন্তসারশূন্যতার প্রসাদ, শ্রেণীবৈষম্যের বেড়াজাল, তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সমাজ কাঠামোর অসংগতি।
তবে, অতি সাধারণ কাহিনি ‘ঘরজামাই’। যে কোন দর্শকের বোধগম্য কাহিনি। কিন্তু বাঙালির সমাজ জীবন ও জীবন ব্যবস্থায় এ কাহিনির প্রভাব বিভিন্নভাবে বিম্বিত, প্রতিবিম্বিত। সমাজে বিদ্যমান বিড়ম্বনার প্রতীকী বার্তাবহন করছে নাটকটি।
‘ঘরজামাই’ কাহিনি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দর্শক যেখানে আটকে যাবেন, তা মূল কাহিনির রূপান্তর নিয়ে একপেশে হয়ে ওঠা। বিদেশী কাহিনির ভেতর বাঙালির জীবনকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে লেখক গোলাম সরওয়ারের যতটুকু মুন্সিয়ানা দেখানো সম্ভব ছিল, দর্শক তা থেকে যেন ক্ষণে ক্ষণে বঞ্চিত হয়েছেন। নাটক দেখতে গিয়ে অনেক সময় মনে হয়েছে, কাহিনি শক্তিশালী ব্যঞ্জনা তৈরী করতে গিয়ে কোথায় যেন স্থুল হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনার অতি প্রকাশ ঘটেছে। মনে হয়েছে–এতোটা প্রকাশ জরুরি ছিল না।
এসব কথা গেল নাটকের কাহিনির বিষয় নিয়ে। কিন্তু যারা অভিনয় করলেন, তাদের বিষয় আলাদা। কাহিনি যা-ই থাকুক, অভিনয়গুণে অনেক কাহিনি ঘুরে দাঁড়ায়। ‘ঘরজামাই’ নাটকটির মঞ্চায়ন দেখে দর্শকরা এমনি আমেজ নিয়ে ঘরে ফিরেছেন বলেই মনে হচ্ছে।
‘মঞ্চশৈলী’ নাট্যদল বিলেতের মাটিতে গড়ে ওঠা শত ব্যস্ততার মাঝে এক চিলতে বাংলাদেশ। কাজ আর কাজ, বেঁচে থাকার যুদ্ধ। দেশে স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যে আরেকটু বেশি ঘাম ঝরানো—সে-ই তো বিলেতে বাঙালি। এ অবস্থায় সংস্কৃতিচর্চা না করলে নয়, কী ভীষণ দূর্মর, আলোড়ন। ‘শ্রুতি’ সে জায়গা থেকেই নাটকে মনোযোগী হয়েছে আপন কৃষ্টিকে ধরে রাখার লড়াইয়ে।
লড়াইটা কেমন হলো? লাইট প্রক্ষেপণ, অসংখ্য চোখ ঝিলমিল করছে গ্যালারিতে, সেখানে দাঁড়াতে হবে, কথা বলতে হবে, নাচতে হবে—তারপর নাটক।
বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র সোলেয়ামান চরিত্রে জিয়াউর রহমান সাকলেন, মোহাম্মদ আলী চরিত্রে হুমায়ুন কবির মাহিন, বেগম মোমাম্মদ আলী চরিত্রে জয়িতা জুলফিকার, রেহানা চরিত্রে আয়েশা এলাহি, সখিনা চরিত্রে সোনিয়া সুলতানা, কালু চরিত্রে শেখ আদনান এবং সাব্বির চরিত্রে রাজিব দাস রাজু প্রত্যেকেই অনবদ্য অভিনয় করেছেন।
‘ঘরজামাই’ নাটকের মঞ্চ নির্দেশনায় ছিলেন মঞ্চশৈলী’র অন্যতম নাট্যকর্মী জিয়াউর রহমান সাকলেন। জিয়াউর রহমান সাকলেন দীর্ঘদিন যাবত নাট্যাঙ্গনের সাথে জড়িত। বাংলাদেশে বিভিন্ন নাটকে অভিনয়, প্রয়োজনা ও নির্দেশনার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটিয়ে নাটকটিতে মেধা ও মননের বুনন দেখিয়েছেন। ভিন দেশে বাঙালি সমাজকে তুলে ধরার এ যুদ্ধে মঞ্চশৈলী’র অভিযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এটাই অভিবাসী বাঙালির আকাঙ্খা হউক।
হামিদ মোহাম্মদ: কবি, সাংবাদিক

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *