আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৮: প্রেস ফর প্রোগ্রেস


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

nilufa 2 নিলুফা ইয়াসমিন

৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘের থীম হলো: ‘প্রেস ফর প্রোগ্রেস‘। নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে জোড়েসোড়ে কাজ করতে হবে। শুধু ৮ই মার্চই নয়, পুরো বছরব্যাপী ‘প্রেস ফর প্রোগ্রেস‘ থীম এর ভিত্তিতে বিভিন্ন সংগঠন নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে। নারী-পুরুষের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর মানবাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে নেয়া চলমান প্রতিশ্রুতিসমূহের ওপরও সমভাবে গুরুত্ব দেয়া হবে।

শতাব্দীব্যাপী নারীর ন্যায্য অধিকার ও পাওনা আদায়ের জন্য আন্দোলন চললেও, শুধুমাত্র নারী বলে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি এমনি বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বিবিসি‘র ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এর চায়না এডিটর সিনিয়র সাংবাদিক ক্যারী গ্রেইস। তিনি প্রতিবাদ করে ঐ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরামের ২০১৭ বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষের বৈষম্য সংক্রান্ত রিপোর্টে দেখা গেছে যে, নারী-পুরুষের সমতা আসতে আরও দু‘শ বছর লাগবে। তাই এবারের বিশ্ব নারী দিবসের থীম নির্ধারিত হয়েছে ‘প্রেস ফর প্রোগ্রেস‘।
নারীর সমঅধিকারের লড়াইয়ের ইতিহাস অল্প দিনের নয়। “কেবলই নারী নই, আমিও মানুষ“ এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে আজন্ম লড়াই করে আসছে সারা পৃথিবীর নারীরা। মানুষ হিসেবে প্রাপ্য অধিকারের দাবীতে সুদীর্ঘকাল থেকে লড়তে হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। নারী যুগ যুগ ধরে অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, তারপরও তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি এমনকি নারীকে অধঃস্তন করে রাখার মানসিকতার আজও কোন পরিবর্তন হয়নি।
পাহাড়সমান বাধা পেরিয়ে আজ নারী ঘরে-বাইরে অবদান রাখছে। ইদানিং এমন কোন পেশা খুঁজে পাওয়া যাবেনা যেখানে নারীর পদচারণা নেই, যুদ্ধ বিমান চালনা থেকে শুরু করে, রাষ্ট্র পরিচালনা- সকল ক্ষেত্রে সব পেশাতেই নারী সফল। একটা সময় ভাবা হত, কিছু পেশা আছে যেখানে নারীর প্রবেশাধিকার নেই, নারী আজ নিজের কর্মদক্ষতা, মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে প্রমাণ করেছে নারীর পেশা আর পুরুষের পেশা বলে আলাদা কোন কথা নেই।
নারী-পুরুষের বৈষম্য সত্তেও বর্তমানে যে মেয়েটি তাঁর শ্রমের মজুরী অনেকাংশে পাচ্ছে, যে কর্মজীবী নারীটি ভোগ করছে প্রসবকালীন ছুটি; আগের চেয়ে কিছুটা সুন্দর পরিবেশে যে নারীটি কাজ করছে, এই অর্জনের পেছনে রয়েছে ৮ই মার্চের ইতিহাস।
১৮৫৭ সালে মজুরী বৈষম্য, কর্মঘন্টা নির্ধারণ ও কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিল সূতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে দমন নিপীড়ন। আন্দোলন করার অপরাধে গ্রেফতার হয় বহু নারী। কারাগারে নির্যাতিত হয় অনেকেই। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯০৮ ও ১৯১০ সালে সোসাল ডেমোক্রেটিক নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে নিউইয়র্ক ও কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। সম্মেলনে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করার এবং দিবসটি সম-অধিকার দিবস হিসেবে পালিত করার প্রস্তাব করেন ।
১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিল। ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন হয়ে আসছে। ঐ বছরের ১৯শে মার্চ অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানী ও সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস এর র‌্যালীতে ১০ লাখের বেশী নারী-পুরুষ যোগ দিয়েছিল। তারা ভোটের অধিকারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ লাভের অধিকার এবং কাজের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের বৈষম্যের অবসান ঘটানোর দাবী জানায়।
১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ই মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে লাগলো। অতঃপর ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে ‘ওমেন্স ডে‘ হিসেবে ঘোষণা দেয়। এর দু‘বছর পর ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ সদস্য দেশগুলোকে ৮ই মার্চ নারীর সামাজিক অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পালন করার জন্য রেজুলেশন দেয়। শতাধিক বছর ধরে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হলেও সেই যে মজুরী বৈষম্য, কাজের মানবিক পরিবেশের জন্য লড়াই, তা কিন্তু থেমে নেই।

একটা সময় ভাবা হতো কিছু পেশা আছে যেখানে নারীর প্রবেশাধিকার নেই, নারীর কমনীয় হাত আর রমনীয় মন ঐসব কঠিন কাজ করতে পারবেনা। নারী আজ কর্মদক্ষতা প্রজ্ঞা দিয়ে প্রমাণ করেছে নারীর পেশা আর পুরুষের পেশা বলে আলাদা কিছু নেই। পাহাড়সমান বাধা পেরিয়ে নারীরা ঘরে বাইরে অবদান রাখছে। সকল ক্ষেত্রে সকল পেশাতেই নারী সফল। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘নারী‘ কবিতায় বলেছেন, সেদিন সুদূর নয়, যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীর জয়।

ব্রিটেনে বাঙালী নারী ও মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষা কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের বহু সাক্ষর রেখেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনজন বাঙালী এমপি এবং হাউজ অব লর্ডস-এ একজন বাঙালী সদস্য আছেন, এই চারজনই নারী। তাঁরা হলেন: ব্যারোনেস পলা উদ্দিন, রোশনা আরা আলী, টিউলিপ সিদ্দিকী ও রূপা হক।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতায়নসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে নারীর অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও মেয়েরা এগিয়ে। প্রান্তিক নারী এখন অর্থনীতির চালিকা শক্তি। শ্রম বাজারে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু গার্মেন্টস সেক্টর নয়, গ্রামের সহজ সরল নিরক্ষর নারী খেতে খামারে মাটি কেটে, ইট ভেঙ্গে, নির্মাণ কাজে, শ্রমে-ঘামে বদলে দিচ্ছে তাদের জীবন চিত্র। তবে বিশ্বব্যাপী নারী পুরুষের সমতা অর্জনের কাজ খুবই মন্থর গতিতে চলছে।

তবে, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মর্মার্থ অনেকেই বুঝতে চাননা। ৮ই মার্চ পালন নিয়ে নারী-পুরুষ অনেককে বলতে শোনা যায়, “নারী দিবস আছে, পুরুষ দিবস নেই কেন“। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে হয়, নারী দিবস পালন মানে পুরুষের বিরুদ্ধাচারণ নয়। নারী দিবস মানে অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির দিন, সারা বছরের প্রতিশ্রুত প্রতিজ্ঞার মূল্যায়নের দিন এবং ১৮৫৭ সালে যে সব নারী শ্রমিকরা ন্যায্য দাবী আদায়ের আন্দোলন করেছে, তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করার দিন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলতে হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নারীর ভূমিকা ছিল রণক্ষেত্রে এবং সহযোগী হিসেবে। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হয়েছিল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীসহ রাজাকার আলবদরদের হাতে নির্যাতিত হয়েছিল নারীরা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনেও নারীরা পিছিয়ে ছিলেননা। সে সময়ের সংগ্রামী নেত্রী প্রীতিলতা, ইলা মিত্র, কল্পনা দত্তের প্রতি আমরা সব সময় শ্রদ্ধাশীল।
বাংলাদেশের নারী শিক্ষা উন্নয়নে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার অবদানের কথা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বেগম রোকেয়ার পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে সুফিয়া কামাল, জাহানারা ঈমাম, নীলিমা ইব্রাহীমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটেছে।
সভ্যতার অগ্রগতি হলেও থেমে নেই নারীর প্রতি নির্যাতন-সহিংসতা। এ অবস্থায় নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে সমাজের ও পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। নারী-পুরুষের সমন্বয়ে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের সহোযোগিতা এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
আশা করি, আগামীতে সব অচলায়তন ভেঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করে নারী শক্তির নতুন উজ্জীবনে মহিমান্বিত হবে পৃথিবী। নারী পুরুষের মধ্যে সমতা আনার জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে।

নিলুফা ইয়াসমিন: বার্তা সম্পাদক, সত্যবাণী

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *