বাংলাদেশে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার পতন


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Syed Badrul Ahsan 

সৈয়দ বদরুল আহসান
(অনুবাদঃ arpeeta shams mizan)

যে ধর্মান্ধ তরুণ গত সপ্তাহে অধ্যাপক জাফর ইকবালকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন এবং আর একটু হলেই সফল হয়ে যেতেন, তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন যে তার এই কুকর্মের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। তার মতে, এই বিখ্যাত শিক্ষাবিদ তথা লেখক ইসলাম ধর্মের শত্রু। শরীরটা ভয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়, যখন দেখি কতটা সহজে কিছু মানুষ আর কিছু সংগঠন এ দেশে একটা ধর্মের স্বত্ব নিজে নিয়ে বসে আছে, এবং বিশ্বাসের সৌন্দর্য নষ্ট করার জন্য এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে উঠেপড়ে লেগেছে।
আমাদের কি আসলে অবাক হওয়া উচিত, যখন আমরা দেখি যে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা সংক্রান্ত বিষয়গুলো একটা খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যদিও প্রায় অর্ধশত বছর আগেই অসাম্প্রদায়িকতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, এবং এ চেতনাকে আমাদের ১৯৭২ এ প্রথম গৃহীত সংবিধানের একটি মূলনীতি হিসেবে নিয়েছিলাম? ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর আঘাত কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকেই আরম্ভ হয়েছিল, যখন রাজনীতিবিদ-লেখক আবুল মনসুর আহমদ এটি ব্যক্ত করেছিলেন যে আমাদের দেশের জন্ম আসলে ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবের একটি যথাযথ প্রতিফলন। আর যাই হোক না কেন, একথা মোটেও সঠিক নয়। লাহোর প্রস্তাবে ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল্গুলোতে মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছিল। আর ১৯৭১ এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে, যেটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষ। এটি তখন অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল যে মুক্তির সংগ্রামে ধর্মের কোন ভূমিকা ছিল না।
সহজ কথায়, ১৯৭১ এ যুদ্ধের ময়দানে বাঙ্গালির বিজয় ছিল ১৯৪০ এর পাকিস্তানের ধারণার চূড়ান্ত পরাজয়। আবুল মনসুর আহমদ যখন ১৯৭১কে ১৯৪০এর সাথে তুলনা করেছিলেন তখন তিনি অনেক বড় একটি ভুল করেছিলেন।
সেটি যদি ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর প্রথম সুচিন্তিত আঘাত হয়, তাহলে দ্বিতীয় আঘাত ছিল মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আচমকা দাবী যে, বাংলাদেশে একটা ‘মুসলিম বাংলা’র প্রয়োজন আছে। ১৯৭০ এ ভাসানী যে রাজনীতি করেছিলেন, তা আমাদের এখানে পাকিস্তান হারানোর দুঃখে ভারাক্রান্ত অনেকের-ই মনের কষ্ট কিছুটা লাঘব করেছিল। এরা ছিল সেই মানুষগুলো, যারা আনন্দের সাথে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে বাঙ্গালির মুক্তির সংগ্রাম অবদমনে সহায়তা করেছিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, ভাসানীর ‘মুসলিম বাংলা’র ধারণা আসলে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর সরাসরি হামলা বৈ আর কিছু নয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে আমরা দেখি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ওপর কীভাবে একের পর এক সহিংস আঘাত আসতে থাকে এবং এক পর্যায়ে সাম্প্রদায়িকতা ধীর অথচ সুদৃঢ় পদক্ষেপে নিজের অবস্থান ঠিক করে নেয়। ১৯৭৫এ যে হিংস্র ক্যু’ দাতাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর সরকারের পতন ঘটানো হয়, তা ছিল এই হামাগুঁড়ি দেয়া সাম্প্রদায়িকতার এক শক্তিশালী প্রদর্শন। ক্যু-কারীগণ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক খন্দকার মোশতাক আহমেদ অতি দ্রুত অসাম্প্রদায়িক ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে বিদায় জানিয়ে স্পষ্টত সাম্প্রদায়িক ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’এর প্রচলন ঘটালেন, এবং পরবর্তীতে জিয়ার প্রচার করা ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ সাথে এটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পেল।
এবং অবশ্যই, একই সাথে জিয়া অত্যন্ত রুঢ় ও হঠকারী পদ্ধতিতে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে সরিয়ে দিলেন। তবে, ১৯৭৫ এর নভেম্বর-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, খুব একটা লুকোচুরি ছাড়াই, এই ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’কে তুলে ধরা হল ১৯৪০ এ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ যে সাম্প্রদায়িকতার সূচনা করেছিল তার নবরূপ হিসেবে।বাংলাদেশের ধারণাকে যে জোর করেই নস্যাৎ করে দেয়া হচ্ছে, তা পরিষ্কার হয়ে যায় যখন জিয়াপন্থী সামরিক কর্মকর্তারা ১৯৭৫এ খালেদ মোশাররফ ও তাঁর সহযোগীদের হত্যার পর সাম্প্রদায়িক ‘নারায়ে তাকবীর’ স্লোগান তোলে।
সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের যাত্রা আরও দ্রুতগামী হয়, যখন ১৯৭৬ এর প্রথম দিকে এমজি তাওয়াব, জার্মানি থেকে উদ্ধারকৃত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রাক্তন অফিসার, যাকে ১৯৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করার কথা, তিনি ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি ‘সিরাত’ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করলেন। সম্মেলনে আসা যে উৎফুল্ল মানুষগুলো চার বছর আগে একই উদ্যানে পাকিস্তানের পতনের খবরে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল, এদিন সেই তাদের হাতে ছিল বেঈমান ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালিদের শায়েস্তা করার মোক্ষম সুযোগ। এরই মাত্র অল্প কিছুদিন পরে দ্বিতীয় সামরিক একনায়কতন্ত্র বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে তার নিজস্ব অবদান যোগ করে।
জেনারেল হোসেন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে ইসলামকে নিয়ে এসে বাংলাদেশের ধারণাটির অপূরণীয় ক্ষতি করেন। ঠিক জেনারেল জিয়াউর রহমানের মত তিনিও পাকিস্তানী আর্মিকে সহযোগিতা করা চুলে পাক ধরা বাঙালিদের তাঁর প্রশাসনে স্থান দেন। তাঁর আশীর্বাদপুষ্ট ‘রত্ন’গুলোর মধ্যে ছিল কুখ্যাত মাওলানা মান্নান, যিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। মান্নান এরপর বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণের তহবিল যোগাড় করতে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যান। তিনি আশাতীত সাফল্য লাভ করেন।
এবং এভাবেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চাকা ঘুরতে থাকে। ৭০এর দশকের মাঝামাঝি জাতির জনকের হত্যা সেসব বাঙ্গালির জন্য উদযাপন করার মত একটি ঘটনা ছিল, যারা পুরাতন সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে বের হয়ে আসতে পারেন নি। মনে পড়ে কি, ‘নাজাত দিবস’ এর দাবি তোলা সেসব মানুষদের, বংগবন্ধুর মৃত্যুতে স্বস্তি পাওয়া যে রাজনীতিবিদেরা দিনের আলোয় মিছিল বের করেছিল? হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে কাজ করা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আতাউর রহমান খান, যিনি নতুন উদ্যমে এরশাদের জন্য কাজ করেছিলেন, তিনি একদা গোশতের বদলে বাঙালিদের ব্যবহার করা ‘মাংস’ শব্দের প্রতি বিতৃষ্ণা জানিয়েছেলেন। তার মতে, ‘গোশত’ আরও বেশি মুসলিম শব্দ, এবং ওটাই ব্যবহার করা উচিত।
সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশে চাগিয়ে উঠছে- যতটা আওয়ামী লীগের পোস্টারগুলোয় ‘জয় বাংলা’ আর ‘জয় বঙ্গবন্ধুর’ মাঝখানের জায়গাগুলোয় ধর্মীয় লেখা ঢুকানোর মাধ্যমে, ঠিক ততটাই স্কুল পাঠ্যপুস্তক থেকে অমুসলিম লেখকদের লেখা সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। তাঁদের চিন্তা ও কর্মে প্রস্ফূটিত অসাম্প্রদায়িকতার সাথে বাংলাদেশের নবীন প্রজন্ম যেন পরিচিত হতে না পারে, সেটাই তো লক্ষ্য।
যে পথভ্রষ্ট যুবক জাফর ইকবালকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল, সেই বাংলাদেশের শেষ ধর্মান্ধ ব্যক্তি না। তার মত অগণিত ধর্মান্ধ আমাদের আশেপাশেই ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে।

সৈয়দ বদরুল আহসান: সত্যবাণী’র কন্ট্রিবিউটিং কলামিষ্ট, লন্ডন বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাবেক মিনিষ্টার (প্রেস)।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *