বীরমাতা ফাতেমা বেগমকে সম্মান: আলোর যাত্রী খছরুজ্জামান খছরু 


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

AF47CC6B-24B9-47C0-804C-C02F2EA8B836

আনোয়ারুল  ইসলাম অভি

আলো আছে বলেই অন্ধকারের কথা কই বার বার- ৫২ ও ৭১কে ধারণ করে লেখা আলোর কথা কই- শিরোনামে আমার  একটি কবিতার লাইন আছে। কবিতাটি আজ বার বার মনে পড়ছে।অন্ধকারে আলোর কথা ভেবে ভালো লাগছে আনন্দাঅশ্রু বিষয়টা আসলেই অন্যরকম অনুভূতি!

আলোকিত মানুষরাই সমাজে আলো ছড়ান এটা মোটাদাগে সত্য। কিন্তু আমরা আসলে অনেক সময়  ভুলে যাই-আলোর নেপথ্যকথা। বিন্দু বিন্দু আলো ছড়াতে ছড়াতে-ই সাধারণত এই আলোর যাত্রায় মানবিকজন নাম লেখায়। যারা আলোর সন্ধানে থাকেন, ভালোবাসেন আলোর যাত্রাপথ, তাদের কাছে আলোর আভাও অনেক গুরুত্ব বহন করে। এই ক্ষনিক আভা-ই অনেক সময় আলোর উৎস হয়ে যায়। সমাজকে করে বিমোহিত। আলোকিত। সাহসী।

খছরুজ্জামান খছরু এমনই একজন। গত ২৫শে মার্চ থেকে স্যোসাল মিডিয়ায় আলো নিয়ে হাটছেন, আপাত দৃষ্টিতে এমনই মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এর চেয়েও আশার আলোর খবর হলো -তাঁর এইপথ ধরে হাটছেন এখন অনেক আলোর প্রত্যাশি তরুনদল। যারা আলোর পথ খুঁজে বেড়ান, নিখাদ ভালোবেসে, মন থেকেই। সমাজ ও দেশের জন্য।

A85A3231-C25E-4338-9245-E06B26A4BABB খছরুজ্জামান খছরু। ব্রিটেনবাসী রাজনীতিবিদ এবং পেশায় ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস; এনএইচএস এর কমিউনিকেশন এন্ড এনগেইজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট এর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী এই রাজনীতিবিদ বাংলাদেশে শিক্ষাজীবনে এমসি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভিপি ছিলেন। বিয়ানীবাজার সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে তার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা জীবন শুরু। সেখানেও তার প্রতিভার স্বাক্ষর আছে।
শিক্ষার্থীদের মাঝে বুদ্ধিভিত্তিক বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের স্ফোরণ ঘটাতে এমসি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঐ সময়ে তার নাম ক্যাম্পাসে এবং গোটা সিলেট জেলায় যৌক্তিক ভাবেই উচ্চারিত ছিল। স্বাধীনতাবিরুধী রাজাকারপুষ্ট জামাত শিবিরের কাছে তিনি ছিলেন চক্ষুশুল। ফলত: জামাত শিবির যা করে, তার চেয়েও নি:শংস কাজ করেছে তার উপর। তিনিই সিলেটের প্রথম ছাত্রনেতা, যাকে ছাত্র শিবির নির্মমভাবে হাত-পায়ের রগ কেটে, ধারালো ক্ষুরদিয়ে শরীর ক্ষতবিক্ষত করেছিল। ভাগ্যক্রমে, শিবিরের নির্মম আঘাতে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন।  বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সময় তাঁর সরাসরি তত্বাবধানে ছাত্রনেতা খছরুজ্জামান খছরুকে প্রথমে ঢাকায় এবং পরে ব্রিটেনে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ব্রিটেনের মর্যাদাশীল পদে কাজ করছেন এবং নিবেদিত ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত আছেন।

C1C251AA-7DCD-47CA-89A8-708809DAD155ব্রিটেনে বর্তমান সময়ের যে কজন তারুন্যদ্বীপ্ত রাজনীতিবিদ আছেন, খছরুজ্জামান খছরুর নামটি সংগত কারণেই সামনে চলে আসে। বিলেতের বাংলামিডিয়া ও সংবাদপত্রে তার পজিটিভ চিন্তা চেতনা ভিত্তিক কর্মগুলো নিয়মিত  প্রচার ও প্রকাশিত হয়ে থাকে।
তাঁকে যারা জানেন, ভালোবাসেন তাদের সংখ্যা কম নয়। দলমত এর উর্ধে উঠেই যে এরা তাঁকে ভালোবাসেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই ভালোবাসার একটাই কারণ- তিনি আলোর কথা বলেন। অন্ধকার মাড়িয়ে কিভাবে সুড়ুঙ্গপথ দেখা যায়, তরুনদের সেই কথামালাই বলে থাকেন। যেভাবে চললে সূর্যালোক ও আগামীর প্রত্যয় দেখা যায়, সেভাবেই ভরসায় মেরুদন্ড সোজা করেই পাশে থাকেন। বছরে কম করে হলেও দুইবার নিজ অঞ্চল সিলেট এর কানাইঘাট যান। এবং তৃণমূল মানুষের পাশেই তার কর্মব্যস্ত সময়গুলো কাটে।

তো, এবার আলোর খবরটি বলি: ৭১ এ পাকিস্থানী হানাদার আর রাজাকারদের হাতে জীবন্ত কবর দেওয়া ৬ সন্তান,স্বামী ও স্বজনহারা এক মায়ের নাম  ফাতেমা বেগম। যিনি স্থানীয় ভাবে ‘‘মা-ফাতেমা’’ বলেই পরিচিত। সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার মালিগ্রামে স্বাধীনতার পর থেকে ভিক্ষা করে দিন যাপন করছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার কারণে তাঁর স্বামী সন্তানদের জীবিত কবর দিয়েছিল রাজাকার আর পাক হানাদার বাহিনী।কানাইঘাটের একমাত্র গণকবরে শায়িত আছেন তাঁর স্বামী ও ৬ সন্তান।এই নির্মমতা এখানেই থামেনি। ফাতেমা বেগমকে নির্মমভাবে পাষবিক নির্যাতন করে পাকবাহিনী ও আলবদর রাজাকাররা।

বীরাঙ্গনা ফাতেমার শেষ সম্বল শহীদ স্বামী -সন্তানদের ৪৩ বিঘা জমি ছিল। সেগুলোতে এখন তার কোন মালিকানা নেই। দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা।  বীরাঙ্গনা ফাতেমা বেগম ভূমিহীন। ভিক্ষা করে তাঁর জীবন চলে। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও জুটেনি কোন স্বীকৃতি। পাননি কোন বয়স্ক ভাতা।
মার্চ মাসে দেশে গিয়ে খছরুজ্জামান খছরু খুঁজে বের করেন এই বীরাঙ্গনাকে। ২৬ মার্চ বীরদল এন এম একাডেমির প্রধান শিক্ষক, উপজেলা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি জার উল্লাহ  ও  সমাজসেবক মামুন রশীদ মামুনের কাছে ফাতেমা বেগম এর ছয় মাসের ভরণ পোষণের টাকা আনুষ্ঠানিক ভাবে হস্তান্তর করেন তিনি। ফাতিমা বেগমও  প্রতিশ্রুতি দেন আর তিনি ভিক্ষাবৃত্তি করবেন না। এছাড়াও তিনি আগামী শুকনো মৌসুমে  এই বীরাঙ্গনার বর্তমান ঠিকানা সোনাতন পুন্জি গ্রামে একটি বাসস্থান নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

গত  ৩০ মার্চ বীরনারী ফাতেমার জন্য আরেকটি কাজ করেছেন তিনি। কানাইঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব তাহমিনা_সুলতানা ও লক্ষীপ্রসাদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জেমস_ফার্গুসন_নানকার  সাথে কথা বলে বয়স্কভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধার কথা  তুলে ধরেছেন। তাঁরাও আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন-বীরাঙ্গনা ফাতেমা বেগম প্রাপ্য সকল সুবিধা প্রাপ্তির ব্যবস্থা গ্রহনে তাদের আন্তরিকতার অভাব হবে না। এই খবরের সাথে জেগে ওঠেছে আরেকটি আশার আলো। গত কয়েকদিন থেকে স্যোসাল মিডিয়ায় জেগেছে হাজারো তরুন। তাঁদের শব্দ ও কথামালায় যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করার দাবী জোরাল হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম প্রশ্ন তুলেছে- বীরাঙ্গনা ফাতিমার শহীদ স্বামীসহ ছয় সন্তানদের ধরে নিয়ে জীবন্ত কবর দিতে কারা সহায়তা করেছিল? কোন কোন স্থানীয় রাজাকার এই ঘৃণ্যতম কাজটি করেছিল? কোন স্থানীয় প্রভাবশালী শহীদ পরিবারের ৪৩ শতক ভুমি দখল করেছে?

95968BA2-69F8-471B-AB50-46305E00BB22আলোর খবরটি এখন ছড়িয়ে যাচ্ছে স্থানিয় পর্যায় থেকে চারদিকে। খোদ কানাইঘাট থেকেই  প্রশ্ন উঠছে- কার পাপ বহন করে চলবে কানাইঘাটবাসী? রাজাকার আর  ভূমিখেকোদের খুঁটির জোরইবা কোথায়? বাংলাদেশ কার পাশে দাড়াবে, যুদ্ধাপরাধী পূণর্বাসনকারী, না বীরমাতা ফাতেমার? আলোর মিছিলটি এগিয়ে নিতে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা একজন খছরুজ্জামান খছরু‘র জন্য বড় বেশী প্রয়োজন। তার পাশে দরকার আলো হাতে অন্ধকার পাড়ি দিতে প্রত্যয়ী আরও অনেক বেশী যাত্রী। মেরুদন্ড সোজা করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করে চলা আলোর পথের এই যাত্রীদেরই যে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন বাংলাদেশের।

অভিবাদন, কৃতজ্ঞতা খছরুজ্জামান খছরু।
শ্রদ্ধা-ভালোবাসা হে বীরমাতা-ফাতেমা বেগম। আমাদের প্রিয় ‘‘মা-ফাতেমা’’ তুমিই লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
মুগ্ধতায় কবিতাটির শেষ লাইন গুলো পড়তে হচ্ছে –

আলো আছে বলেই অন্ধকারের কথা কই
মানুষপিরানহা ইচ্ছেমতো খেয়েছে দুই লাখ শরীর।
পনের কোটি হাত পতাকায় গোলাপ ফুটিয়েছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল;
কেননা পরাজিত হওয়ার  জন্য জন্মায়নি বাঙালি।
আলো আছে বলেই অন্ধকারের কথা কই, বার বার।

[ আলোর কথা কই ( অংশ বিশেষ) ঝাউবন কান্দে ঘরকন্যার লাগি, পৃষ্ঠা ২৭।]

আনোয়ারুল ইসলাম অভি: কবি,সাংবাদিক। লন্ডন।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *