লন্ডন সোয়াসে শেখ মুজিব লেকচার: ৭ই মার্চের ভাষণ ছিলো স্বাধীনতার কৌশলী ঘোষণা (ভিডিও)


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
সত্যবাণী

লন্ডন: ইন্সটিটিউট অফ কমনওয়েলথ স্টাডিজের অধ্যাপক জেমস ম্যানর বলেছেন, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিলো বাঙালীর স্বাধীনতার কৌশলী ঘোষণা। তাঁর মতে স্বাধীনতার এই ঘোষণায় বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের কৌশল অবলম্বন করার বিভিন্ন কারনও রয়েছে, এই কৌশল অবলম্বন করে তিনি দুরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার ১০ই এপ্রিল সেভেন্থ মার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে লন্ডনের দ্যা স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল এন্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (সোয়াস) এর ব্রুনাই গ্যালারি লেকচার থিয়েটারে  অনুষ্ঠিত ‘শেখ মুজিবুর রহমান লেকচার’২০১৮’ অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে তিনি এ মন্তব্য করেন। 

065B605F-30BF-4CE2-8C7E-BE122E10EE2Bসোয়াস’র সাউথ এশিয়া ইন্সটিটিউটের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ লেকচারে ব্রিটেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার নাজমুল কাওনাইন, ডেপুটি হাই কমিশনার খোন্দকার মোহাম্মদ তালহা, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পুত্র রাশেদ সোহরাওয়ার্দী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সভাপতি সুলতান শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুকসহ লন্ডনের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত স্টুডেন্ট, একাডেমিক ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। সেভেন্থ মার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নুরুদ্দিন আহমেদের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সোয়াস সাউথ এশিয়া ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এডওয়ার্ড সিম্পসন।

‘আন্ডারস্টান্ডিং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: দ্যা হার্ড রোড টু বাংলাদেশ’জ ইন্ডিপেন্ডেন্স এন্ড দ্যা মিনিং অফ মার্চ সেভেন্থ (বালাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুর্গম পথ এবং ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের তাৎপর্য )’ শীর্ষক তাঁর মূল লেকচারে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের কমনওয়েলথ স্টাডিজ ইন দ্যা স্কুল অফ এডভান্স স্টাডিজের ইমেকা আনোয়ায়ুকু প্রফেসর এমিরিটাস জেমস ম্যানর বলেন,  ৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সমাবেশে আক্রমন করার জন্য পাকিস্তানী আর্মি প্রস্তুত, এমন তথ্য জানার পর শেখ মুজিব চাননি তাঁর প্রিয় বাঙালীর রক্তে প্লাবিত হোক রেসকোর্স ময়দান। শুধু তাই নয়,  স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহনের পাশাপাশি পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির সাথে তিনি যে আলোচনার পথ খোলা রাখতে চান এমনটি বুঝানোর জন্যই  ৭ই মার্চের বক্ত্যবে তিনি কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। অধ্যাপক ম্যানর বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-মুক্তির সংগ্রাম মানে গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামের ঘোষণা আগে দিয়ে সাথে সাথেই কিন্তু কৌশলে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। জেমস ম্যানর বলেন, শেখ মুজিব খুবই দুরদর্শী রাজনীতিক ছিলেন। তিনি বুঝতেন কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন শক্তিশালী সংগঠন ও ঐক্যবদ্ধ জনগণ। জনগনের মনোভাব তিনি খুবই ভালো বুঝতেন। দাবি আদায়ে আলোচনার টেবিলে যখন বসতেন, তখন পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা নিয়েই কথা বলতেন তিনি প্রতিপক্ষের সাথে। কিন্তু তাঁর জনগনের স্বার্থের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। 

3D169866-6FE9-46DF-9FD5-68BA2A1AE6BCসাউথ এশিয়ান রাজনীতি বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ম্যানরের মতে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের। স্বাধীনতার জন্য নিজ দেশের জনগনকে দীর্ঘ সময় নিয়েই তৈরী করেছিলেন তিনি এবং উপযুক্ত সময় আসার সাথে সাথেই সেই স্বাধীনতার ডাক দেন। অধ্যাপক ম্যানর বলেন, শেখ মুজিব যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন, তখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন থেকে শুরু করে ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত সব কিছু তাঁর নির্দেশে চলতে থাকে। এটি স্বাধীনতার জন্য দেশের জনগনকে তৈরী করার তাঁর দীর্ঘ প্রস্তুতিরই ফল। নিজের জীবনের চেয়েও সহকর্মী ও জনগনের নিরাপত্তাকে শেখ মুজিব গুরুত্ব দিতেন বেশি, এমন মন্তব্য করে অধ্যাপক ম্যানর বলেন, ২৫ মার্চ ক্রাকডাউনের আগেই সহকর্মী নেতাদের আত্মগোপনে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাকে না পেলে পুরো দেশটিই ম্যাসাকার করে ফেলবে পাকিস্তানী আর্মি, এই ধারণা থেকে নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ২৫ মার্চ রাতেই তিনি পাকিস্তানী আর্মির কাছে ধরা দেন। দেশের মানুষের প্রতি কতটুকু মমত্ব থাকলে নিজের জীবন বিপন্ন করা যায় এ ঘটনায় সেটিই প্রমান হয়।

সামরিক শাসন বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য নতুন দেশগুলোর নেতাদের চেয়ে অনেক কঠিন পথ অতিক্রম করেছেন বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এমনটিই মনে করেন অধ্যাপক ম্যানর। তিনি বলেন, শেখ মুজিবের মত নেতা ছিলেন বলেই একটি জতি ফিরে পেয়েছে তাদের জাতীয় পরিচয়, স্বাধীনতা এবং মুক্তি। 

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ম্যানর বলেন, এই স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশে প্রয়োজনে নয়, ভবিষ্যত বিশ্ব প্রজন্মের ইতিহাস জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর জন্যও এটি প্রয়োজন ছিলো। 

বিশ্ব জনমতের ভয়ে নিজেদের আয়ত্বে থাকার পরও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি যেখানে শেখ মুজিবের কোন ক্ষতি করেনি, সেখানে ১৯৭৫ সালে নিজের তৈরী স্বাধীন দেশের কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে প্রবীন অধ্যাপক জেমস ম্যানর বলেন, ব্যাক্তি মুজিবকে হত্যা করলেও তাঁর সৃষ্টি বাংলাদেশকে আটকে রাখতে পারেনি ঘাতকরা। আয়তনে ছোট হলেও বাংলাদেশ আজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। অনেক ক্ষেত্রে এই দেশটি বিশাল প্রতিবেশী ভারতের চেয়েও এগিয়ে।

7105A3F2-D1D7-45A0-B3E8-6DBA832449D9একটি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস অধ্যাপক ম্যানর তুলে ধরেন তার গবেষণা মূলক এই বক্তব্যে। 

সাউথ এশিয়া ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এডওয়ার্ড সিম্পসন তাঁর স্বাগত বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুকে একজন মহান নেতা আখ্যায়িত করে বলেন, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থেই এই নেতার বিশ্ব স্বীকৃতি প্রয়োজন। আর তাই সোয়াস সাউথ এশিয়া ইন্সিটিউট সেভন্থ মার্চ ফাউন্ডেশনের সাথে সহযোগি হয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের সাথে তরুণ প্রজন্মের বিশ্ব নাগরিকদের পরিচয় করিয়ে দিতে আজকের এই লেকচার আয়োজন করেছে।

সেভেন্থ মার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নুরুদ্দিন আহমেদ বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের মানুষ ধারনা রাখলেও অনেকেই এর বিষয় বস্তু সম্পর্কে সম্পুর্ণ অবগত নন। বিভিন্ন দেশের গবেষকসহ অনেকই এর অদ্যান্ত জানতে আগ্রহী। তাই সাউথ এশিয়া ইন্সটিটিউট সোয়াস-এবং সেভেন মার্চ ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ। তিনি জানান, ২০১৪ সাল থেকে দি সেভেন মার্চ ফাউন্ডেশন ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষন নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি বৃটেন এবং বাংলাদেশে নিয়মিত সেমিনার করে আসছে।

লেকচার শেষে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা নেটওয়ার্কিংয়ে মিলিত হন।

উল্লেখ্য,  ‘শেখ মুজিবুর রহমান লেকচার’২০১৮’ অনুষ্ঠানটি ৭ই মার্চ আয়োজনের কথা থাকলেও ইউনিভার্সিটি স্টাফদের ধর্মঘটের কারনে তা ১০ই এপ্রিলে পিছিয়ে আনা হয়।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *