১০ বছরের বালকের দেখা মুক্তিযুদ্ধ


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

lilu-3  সৈয়দ আবুল মনসুর

 

১৯৭১ সাল। বাঙালি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক বছর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে বাঙালিরা ঝাপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আসে বিজয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ছিলাম দশ বছরের এক বালক। দশ বছরের একটি বালকের চোখে কেমন ছিলো বাঙালীর দুনিয়া কাপাঁনো মুক্তিযুদ্ধ? স্মৃতির আর্কাইভ থেকে সত্যবাণী পাঠকদের সাথে তার কিছুটা শেয়ার করার লক্ষ্যেই আজকের এ লেখা।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি, যা কোনদিন মুছে ফেলার নয়। আমি তখন সিলেট দরগা গেইট প্রাইমারি স্কুলের ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। আমার সহপাঠী তখন ছিলেন সোলেমান আহমেদ (জাসদ নেতা লোকমান আহমেদের অনুজ), জাকির আহমেদ ( সিলেট মহানগর জাসদের বর্তমান সভাপতি), সিলেট জাসদ নেতা ও ব্যবসায়ী ফয়জুল্লাহ ফারুকী আদনান, গোলাম নূরানী খান ( লন্ডন প্রবাসী ব্যবসায়ী), জিয়াউল ইসলাম সুহেল (হেলথ কর্মজীবী) এবং আরো অনেকে।  স্কুল থেকে প্রায় প্রতিদিনই মিছিলে যেতে হতো। একবার সিলেটের লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিকরা লাঠি মিছিল বের করলো, তাদের সাথে আমরাও সমস্ত শহর ঘুরলাম। দেশের চারিদিকে তখন খুবই অস্তিরতা থাকলেও এগুলো নিয়ে টেনশন করার বয়স তখন আমাদের ছিলোনা। বরঞ্চ স্কুল ফাকি দিয়ে মিছিলে যেতে তখন আমাদের খুবই ভালো লাগতো।
আমাদের বাসাটি ছিল চা বাগানের পাশে। সেই সময় বাসার চারিদিকে ছিল কাঠাল গাছ পরিবেষ্টিত অনেক ছোট বড়ো টিলা। কাঁঠাল গাছের জন্য এই এলাকার নাম এখনও ‘কাঠাল বাড়ি’।  শুধু কাঁঠাল গাছই নয়, বাগানের পাশেই ছিল ‘বাদাম বাগিচা’ যেখানে এখন দারুসালাম মাদ্রাসা অবস্থিত। আমাদের বাসা ছিল তখন সিলেটের তৎকালীন  ছাত্র নেতাদের পুলিশের হাত থেকে লুকিয়ে থাকার নিরাপদ আবাস। আমার মা তাদেরকে খুবই আদর যত্ন করতেন। তাদের মধ্যে যাকে সবচেয়ে বেশি করে মনে পড়ে তিনি হলেন সাবেক ছাত্রলীগের নেতা বর্তমান আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাহ আজিজুর রহমান। আমরা যাকে শাহ আজিজ চাচা ডাকতাম। আরেকজন ছিলেন শাহ আলম।  বাজারে তখন কিছুই পাওয়া যেতনা। আমার মা দেশের অবস্থা ভাল নয় দেখে বেশি করে চাল, ডাল, আলু, পিয়াজ, তেল ইত্যাদি কিনে রেখেছিলেন।  স্বাধীনতা উত্তর সিলেটের জিন্দাবাজারের ‘রমনা হোটেল’ ছিল তখনকার ছাত্র নেতাদের রাজনৈতিক আড্ডাস্থল। আমার বাবা তখন হোটেলটির ব্যাবস্থাপনার সাথে জড়িত ছিলেন। বাবার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল বড় ভাইয়ের মত। তাই তখন আমাদের বাসা ছিল তাদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়। যুদ্ধের পূর্বের দিনগুলোতে প্রতিদিনই ছিল মিছিল মিটিং। শহরের চারিদিকে থমথমে ভাব। এমনি একদিন অগ্নিঝরা মার্চের দুপুরে আমার বাবা অফিস থেকে ফিরে আমাদের সবাইকে তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হবার জন্য বললেন। আমার মনে পড়ে, আমাদের রেডিওটি তখন বন্ধ করার পর্যন্ত সময় ছিলোনা। আমরা শহর থেকে বের হয়ে রিক্সা দিয়ে সিলেটের শেখঘাট হয়ে খেয়া নৌকা দিয়ে সুরমা নদী পার হলাম। আমার সাথে তখন ছিলেন আমার অগ্রজ মিলু কাশেম (বর্তমানে লেখক ও সাংবাদিক), অনুজ হিরু (অধ্যাপক সৈয়দ আবু জাফর) এবং দিলু (ছড়াকার দিলু নাছের)। আমরা তখন বাবা মাকে খুঁজে পাচ্ছিলামনা। চারিদিকে গুলাগুলির শব্দে আমরা চারভাই তখন খুবই আতঙ্কিত। মা-বাবাকে হারিয়ে আমরা তখন ভয়ে নদীর পাড়ের একটি মসজিদের ঘাটের নিচে আশ্রয় নিলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম- মসজিদটির নাম মেস্তরি মসজিদ। আমার বাবা কিছুক্ষন পর আমাদের খুঁজে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী গ্রাম বরইকান্দির আমাদের এক আত্মীয় বাড়ি। সেখানে এক রাত অবস্থান করে পায়ে হেঁটে বিশ্বনাথের রামপাশা হয়ে দুইদিনে আমরা সৈয়দপুর আমাদের গ্রামের বাড়ি গিয়ে পৌছি।  গ্রামে যাওয়ার যাত্রা পথে আমাদের আত্মীয় শারো মিয়া এবং
ভগ্নিপতি ছমরু মিয়ার (লন্ডনের প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা) বাড়ীতে খাওয়া দাওয়া করে সৈয়দপুরে গিয়ে পৌছি আমরা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রামের বাড়ীতে যখন ছিলাম তখন দেখতাম- বড়রা সব সময় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার’ শোনতেন। আমরাও তাদের সাথে শোনতাম। তখন থেকেই যে গানগুলো মনের গভীরে মিশে গিয়েছিলো সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো- ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর’ ও  ‘মোরা একটি ফুলকে বাচাবো বলে যুদ্ধ করি’ ইত্যাদি।
আমরা ছোটরা খেলাধুলা, মাছ ধরা ইত্যাদি নিয়ে আনন্দে মেতে থাকতাম, তখন তো আর আমাদের এত সব বোঝার বয়স ছিলনা। একদিন কাজিনদের সাথে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে দেখি মানুষের লাশ ভেসে যাচ্ছে এবং শকুন লাশকে ছিড়ে খাচ্ছে । বড়দের কাছ থেকে জানতে পারলাম, পাঞ্জাবীরা (পাকিস্তানী সৈন্য) আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম ‘শ্রীরামশ্রী’তে অনেক লোককে হত্যা করেছে, এগুলো তাদের লাশ। আমার মনে আছে, ঐ বিভৎস দৃশ্য দেখার পর ঐদিন রাতে আমি আর ঘুমাতে পারিনি। বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল ভেসে যাওয়া ঐ লাশের বিকৃত চেহারা।
আমার মামা বর্তমান ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দ আবদুল হান্নান (যুক্তরাজ্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসান আহমদের বাবা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুকের শশুর) ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। থাকে ধরার জন্য পাঞ্জাবীরা অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু তিনি ভারতে চলে যাওয়ায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন। আমার আরেক মামা সৈয়দ আব্দুর রহমান তখন যুক্তরাজ্যে থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরী করতে ব্যস্ত ছিলেন। আমার মনে পড়ে, তিনি স্বাধীনতার পর যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের পক্ষ থেকে তখন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে ৫০৪ পাউণ্ডের একটি চেক প্রদান করেছিলেন, যে খবরটি তখন ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল। আমরা অনেকগুলো পত্রিকা কিনে রেখেছিলাম তখন।
সিলেট এয়ারপোর্টের পাশে মডেল স্কুলে (বর্তমানে সিলেট ক্যাডেট কলেজ) যুদ্ধের সময় মিলিটারিদের ক্যাম্প ছিল। যেখানে তারা সকল ধরনের কুকর্ম করতো। আমাদের পাড়ার ভিতর দিয়ে এয়ারপোর্ট রোড যাওয়া খুব সহজ ছিল। একদিন কারফিউ চলাকালীন সময়ে আমাদের এলাকার একজন রিক্সা চালক পাড়ার গলি দিয়ে তার বাচ্চাদের জন্য পাশ্ববর্তী দোকান থেকে কিছু খাবার কিনে আনতে গিয়েছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষন পর দেখলাম- তার রক্তাক্ত দেহ কয়েকজন লোক ধরে নিয়ে এলেন। মিলিটারিরা নাকি গাড়ি থেকে তাকে গুলি করেছিল, সম্ভবত লোকটির পায়ে গুলি লেগেছিলো। আমার এখনো মনে আছে সেই করুন স্মৃতি। বাবাকে জড়িয়ে ধরে তার ক্ষুধার্ত শিশুদের সেই করুণ বিলাপ এখনো আমার চোখে ভাসে।
আরেকটি স্মৃতি আমার এখনো খুব মনে পরে। যুদ্ধের সময় আমরা যখন গ্রামে ছিলাম, তখন মাঝে মাঝে আমরা আমাদের বাবার সাথে বাজারে যেতাম। তখন লুঙ্গি অথবা হাফ প্যান্ট পরা এলএমজি কাধে ঝোলানো কিছু লোককে দেখতাম ঘোরাঘুরি করতে। সবাই বলতেন এরা নাকি মুক্তিসেনা। এমনি এক হাট বাজারের দিন মুক্তি বাহিনীর লোকেরা একজন লোককে আমাদের বাজারের নদীর পাশে চোখ বেধে গুলি করে মেরে ফেললো। পরে শুনেছি- লোকটি একজন নামকরা চোর ছিল।হানাদারদের ভয়ে মানুষ যখন ঘর বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল, তখন সে এই সূযোগে মানুষের বাড়ি ঘর চুরি করে নিয়ে যেত। তখন এলাকার লোকেরা নাকি মুক্তি বাহিনীর কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল ।

যুদ্ধ যখন শেষ হলো, ডিসেম্বরের শেষের দিকে তখন আমরা আবার ফিরে এলাম আমাদের সিলেটের বাসায়। এসে দেখলাম, আমাদের বাসার চারিদিকে বোমা পড়ে গর্ত হয়ে গিয়েছে। আমার বাবা তখন আমাদেরকে এই গর্ত গুলোর পাশে যেতে বারণ করতেন। আমরা তবুও যেতাম এবং বারুদের গন্ধ পেতাম। একদিন শুনলাম- এয়ারপোর্টে এমনি একটি গর্তে গ্রেনেড ফুটে মানুষ মারা গেছে। একাত্তরের যুদ্ধের এই স্মৃতিগুলো প্রতি বছরই স্বাধীনতার মাসে চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে, যা কোন দিনই মুছে যাবার নয়

লেখক: রাজনীতিক

6th March’2017, 22:52 GMT

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *