বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাহে রমজান,অভিশাপ না আশীর্বাদ


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

IMG_5996 শেখ মুহিতুর রহমান

১৯৮৭  সাল।আমি তখন ভূস্বর্গের সুইজারল্যান্ডে।বাংলাদেশ থেকে নতুন নতুন এসেছি।জাতীগতভাবে সুইসরা বেশ ভদ্র। এদেশের শহুরে মানুষের অধিকাংশই ইংরেজি জানে।তাই চলতে ফিরতে খুব একটা কষ্ট হয় না।কিন্তু বিড়ম্বনায় পড়লাম অন্য খানে।সূর্যদেবী যেন মাথার উপর থেকে পশ্চিমে হেলতেই চায় না।প্রথম প্রথম  বেশ চিন্তায় পড়তাম।ভাবতাম আমার ঘড়ি নষ্ট না সূর্য নষ্ট।অবশেষে হরিন্দম কহিল বিষাদে।বুঝলাম এদেশে সূর্যাস্ত হয় অনেক দেরিতে।জীবনের এ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা।তখন যুগটা ছিলো চিঠির।এ অভিজ্ঞতা রসিয়ে রসিয়ে শেয়ার করেছিলাম দেশে বাবা মা ও প্রিয়জনদের সাথে।

সুইজারল্যান্ড  আসার কিছুদিন পরেই ছিলো পবিত্র মাহে রমজান।প্রায় ১৯ ঘন্টার রোজা।কি সাংঘাতিক ব্যাপার।বুদ্ধি হবার পর থেকে কবে স্বেচ্ছায় রোজা ছেড়েছি মনে নেই।এদিকে বিগত এক বছর যাবৎ ভুগছি হাইপার এসিডিটিতে।কাজ করি পরিশ্রমের,রোজার সময় অনেক লম্বা তার উপর আবার শরীর সুস্থ নয়।সব মিলিয়ে চিন্তায় আকাশ ভেঙে পড়লো মাথায়।কিন্তু না আমি তো হেরে যাবার ছেলে নই।হারতে শিখিনি আমি।সিদ্ধান্ত নিলাম যা আছে কপালে,রোজা আমি রাখবোই।যে কথা সেই কাজ।

মাহে রমজান যে রহমত ও বরকতপূর্ণ  মাস  তা আবারো প্রমাণিত হলো। তেমন কোনো সমস্যা ছাড়াই অতিবাহিত করলাম এক মাসের দীর্ঘ সিয়াম সাধনা।তবে মজার ব্যাপার হলো হাইপার এসিডিটি সংক্রান্ত পেটের ব্যথা রোজার প্রথম তিন সপ্তাহ থাকলেও রোজার শেষ সপ্তাহে তা  একেবারেই অনুভব করিনি।রোজার শেষ সপ্তাহে কোনো ঔষধও নিতে হয়নি।এভাবে প্রতি বছর রোজার সময় পেটের  ব্যথা  ভালো থাকার  সময় বাড়তে থাকে।এক সময় একেবারেই আরোগ্য লাভ করি।সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কোনোদিনও পেটের ব্যথা বা হাইপার এসিডিটির জন্য আমাকে আর একটি বড়িও নিতে হয়নি।

সুইজারল্যান্ডের একজন ডাক্তার।এই মুহূর্তে নাম মনে করতে পারছিনে ,তিনি বাংলাদেশের এক্স প্রেসিডেন্ট ডাক্তার প্রফেসর বদরুদোজা চৌধুরীর  একজন কঠিন ভক্ত।তার মতে প্রফেসর বদরুদোজা চৌধুরী একজন বিশ্ব মানের চিকিৎসক।এমন একজন বিরল প্রতিভাবান মানুষ যে দেশে জন্মেছে আমি সেই  দেশের মানুষ। আমাকে স্যালুট করলেন  সে।সুইজারল্যান্ডের ওই ডাক্তার একজন প্রফেসর ও গবেষক।তিনি বলেছিলেন মুসলিমদের রোজা ভীষণভাবে বিজ্ঞান সম্মত।এটা সুস্বাস্থ্যের  জন্য এক মহা ঔষধ। এ বিষয়ে এখন গবেষণা হচ্ছে বেশ।অচিরেই বেরিয়ে আসবে নতুন নতুন তথ্য ।

এ ঘটনার অনেক বছর পর রোজার উপর গবেষণা করে জাপানী ডাক্তার প্রফেসর ওসিনরি ওসুমি নোবেল জিতে নেন ২০১৬ সালে।বিশ্বের সব ধর্মের অনুসারীরা রোজা বা না খেয়ে থাকার মতো উপাসনা করে থাকেন।মুসলমানেরা রোজা রাখলে তাকে বলে সিয়াম সাধনা,হিন্দু বা বৌদ্ধরা রোজা রাখলে উপবাস,খৃষ্টানেরা রোজা রাখলে বলে ফাস্টিং ,বিপ্লবীরা রোজা রাখলে অনশন। আর বিজ্ঞানীরা রোজাকে বলে অটোফেজি।

Auto phagy শব্দটির সাথে বিজ্ঞানীরা পরিচিত খুব বেশি দিন না।এটি একটি গ্রিক শব্দ। Auto অর্থ নিজে এবং phagy অর্থ খাওয়া। শাব্দিক  অর্থে autophagy মানে নিজে নিজেকে খাওয়া।আমরা যে খাবার খাই। শরীরের এক ধরণের কোষ ওই খাবার খেয়ে থাকে। মানব দেহের ঐসব কোষ গুলো স্বাভাবিক খাবার না পেলে শরীরের অসুস্থ কোষ খাদ্য নালী ও পেটের  মধ্যে জমে থাকা ময়লা আবর্জনা খাদ্যের উচ্ছিষ্ট  অংশ ইত্যাদি খেতে শুরু করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এটাকে বলে অটো ফাজি।একজন রোজাদার মানুষের স্টমাক ৪/৫ ঘন্টা পর খালি হয়ে যায়। তখনও ওই কোষ গুলি  খেতে থাকে। খালি স্টোমাকে খাবার না পেয়ে ওরা স্টোমাকের ভেতরের মরা  কোষ, উচ্ছিষ্ট খাবার, ময়লা মাটি খেতে শুরু করে। ডাক্তার প্রফেসর ওশিনরি বলছেন শরীরের এই কোষগুলো যদি ময়লা আবর্জনা পরিস্কার করার সুযোগ না পেতো  তবে ঐসব ময়লা আবর্জনা শরীরে বিভিন্ন প্রকার  রোগের কারণ হতে পারে। ক্যান্সার ও ডায়াবেটিকস এর মতো অনেক বড় বড় রোগের শুরু হয় এখানে থেকেই।

শুধুমাত্র এই auto phagy আবিস্কার করেই জাপানি ডাক্তার প্রফেসর ওশিনরি ওসুমি ২০১৬ সালে জিতে নেন নোবেল পুরস্কার। জানা যায় এর পর থেকে পশ্চিমারা ব্যাপকভাবে রোজা রাখতে শুরু করে। প্রফেসর ওশিনরি ওসুমি  নিজেও নাকি সপ্তাহে দুদিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান মাহে রমজানকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। তারা বলছেন রমজানের প্রতি সপ্তাহের উপকারিতা ভিন্ন।

প্রথম সপ্তাহ: শরীর ক্লিনজিং প্রসেস শুরু করার কারণে ব্লাড প্রেসার ও কোলেস্টরেল লেভেল কমে যায়। প্রথম সপ্তাহের প্রথম দিনগুলো রোজাদারদের জন্য বেশ কঠিন। এসময় প্রচুর ক্ষুধা ও মাথা ব্যথা হতে পারে।

দ্বিতীয় সপ্তাহ : এ সপ্তাহে  ক্লান্ত হজম প্রক্রিয়ার  বিশ্রামের কারণে শরীরের অনেক অপূর্ণ কোষ পরিপূর্ণ হতে সাহায্য করে এবং  শরীর  বিভিন্ন অর্গান মেরামতের কাজে মনোযোগী হবার সুযোগ পায়।

তৃতীয় সপ্তাহ : এ পর্যায়ে  শরীরের প্রয়োজনীয়  রুগ্ন কোষ সবল হয়ে ওঠে। এতে এনার্জি ও কন্সেনট্রেশন লেভেল বেড়ে যায়। এ সপ্তাহে শরীরের অকেজো সেল গুলি মেরামত শেষ হয় এবং কিডনী ,লিভার ,লাঞ্চ ,স্কিন এর টক্সিন পরিস্কার করে ফেলে।

চতুর্থ সপ্তাহ : এই সপ্তাহে শরীর পুরাপুরি স্বাভাবিক ও অধিক সুস্থ হয়ে ওঠে।ফলে কন্সেন্ট্রেশন,মেমোরিজ ,এনার্জি স্বাভাবিক পর্যায় চলে আসে।শেষ হতে থাকে হিলিং প্রসেস। শরীর ম্যাক্সিমাম লোড নিতে পারে।

আমাদের নবী করিম (দ:) মাহে রমজান মাস ছাড়াও সোমবার ও বৃহস্পতিবার সপ্তাহে দুদিন রোজা রাখতেন।  এছাড়া তিনি বলেছেন পেটের তিন ভাগের এক ভাগ খাদ্য, দ্বিতীয় ভাগ তরল খাদ্য এবং তৃতীয় ভাগ খালি রাখতে।

নবী করিম (দ:) এর এই আমল ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে  Johns Hopkins University এর chief of the   Labrotory of Neuro  science এর প্রফেসর মার্ক ম্যাটসন গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে  ১) সপ্তাহে দুদিন রোজা রাখলে developing of Cancer ,Alzheimers ও Parkinsons এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়  ২) খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস  মাঝে মাঝে পরিবর্তন করলে শুধু শরীরে না মস্তিস্কেও এর সুফল পাওয়া যায়।
৩) তিনি বলেন  The formation of the neural chemicals alters in the brain ৪) অধিক খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকলে Cognitive function খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় ৫) রোজা রাখলে মানুষের মধ্যে স্ট্রেস কমে,ফলে হার্ট এটাক সহ বহু রোগের  ঝুঁকি কমে ৬) রোজা memory ability and  learning  aptitude বৃদ্ধি করে ৭) রোজা রাখলে weel নার্ভ সেল তৈরী করে ,DNA মেরামতে সাহায্য করে ,ইমিউন সিস্টেম protect করে ,ইমিউনের পুরাতন সেল নষ্ট করে নতুন সেল তৈরী করে।

In 2007 scientific revew of studies  centred  on fasting was printed in the American Journal of clinical neutration ,the review   ditermind an affecktive means of reduccing Cancer as well as Cardio Vascular .The article also provide an evidence that fasting has the potential  to threat of diabetes. It is clear the fasting bust the brains health and functionality as well as integrity of the sales through out the body.

মাহে রমজান সিয়াম সাধনের মাস। ত্যাগের মাস। এবাদতের মাস। দান খয়রাতের মাস। বিশ্ব জুড়ে প্রায় ১৬০ কটি মুসলমান রোজার মাধ্যমে মহান আল্লার কাছে নিজেকে নিবেদন করেন।মহান আল্লাহ পাকও রোজার প্রতিদান নিজ হাতে প্রদানের অঙ্গীকার করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানও রোজাকে শারীরিক ও মানুসিক উন্নতির এক বিরাট উপহার হিসাবে দেখছে।  কিন্তু আমাদের সমাজের কিছু মানুষ রোজার মাসে সারাদিন শেষে হরেক রকমের ভাজা পোড়া ও অধিক পরিমানে খাবার জন্য নিজ শরীরকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর ঝুঁকির দিকে। বেশি খাবারের  সাথে সুস্থ থাকার বা প্রাণবস্ত থাকার কোনো সম্পর্ক নাই এ কথা তারা মানতে নারাজ।এ ছাড়া তারা এবাদত বন্দেগী বাদ দিয়ে ইফতার পার্টি,সেহরি পার্টি ইত্যাদিতে এতই  মেতে ওঠে যে দেখলে মনে হয় এটা সিয়াম সাধনের না ভুরিভোজের মাস।

বিজ্ঞানীরা বলছে মানব দেহে IGF -1 নামে  এক ধরণের গ্রোথ হরমোন আছে। যার কাজ নতুন নতুন কোষ তৈরি করে দেহকে বাড়িয়ে তোলা।এই হরমোনটি পুরাতন দুর্বল কোষকে মেরামত না করে নতুন কোষ তৈরির কাজে বেশি মনোযোগী থাকে।কোনো বিরতি ছাড়া এভাবে নতুন কোষ তৈরী হতে থাকলে এক সময় দেহে বাসা বাধে ডায়বেটিস ,ক্যান্সার ,ওবেসিটি সহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধি।স্তন  ক্যান্সার ,প্রস্টেট ক্যান্সার ও ক্লোন ক্যান্সারের সাথে বিজ্ঞানীরা IGF -1 এর যোগ সূত্র খুঁজে পেয়েছেন।বিজ্ঞানীরা বলছেন দেহে IGF -1 এর পরিমান কমাতে হলে সপ্তাহে ১/২ দিন রোজা রাখা যেতে পারে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে রোজা ডায়েটিং এর চাইতেও বেশি উপকারী। রোজা কমিয়ে দেয় ডায়েবেটিস এর ঝুঁকি,কমিয়ে দেয় বা একেবারে ভালো করে দেয় পেপটিক আলচার।বাঁচাতে পারে ডিমেনশিয়া সহ অনেক  বয়স জনিত রোগ।কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন  রোজার পাশা পাশি উপযুক্ত খাদ্যাভাস।

আমাদের নবী (দ:) কাঁচা অথবা শুকনা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন।রাতে ও সেহরিতে বেশী অথবা ভারী খাবার পরিহার করতেন। সুতরাং বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোজার শারীরিক উপকারিতা পেতে হলে ভাজা পোড়া গুরুপাক ভুরিভোজ পরিহার করে ফল মূল,শাক সবজি ,মাছ ,সালাদ,মুরগি,ডিম্ ,দুধ ইত্যাদির উপর গুরুত্ব  দিতে হবে।মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে মাহে রমজানের রহমত বরকত ও সুস্থ থাকার তৌফিক এনায়েত করুন ( আমিন )

তথ্য : Books ,Medical Journal ,Internet

লেখক : গবেষক ,কলামিস্ট ,সম্পাদক -নিউজলাইফ২৪.কম

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *