নিন্দনীয়, ধিক্কারজনক!


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

ECC95D32-0E18-4EC6-8332-B71ACEC2F2B2

ডা: মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

ডাক্তাররা কসাই আর বাংলাদেশের সব হাসপাতাল হচ্ছে কসাইখানা— এসব কথা আমার কাছে নতুন না। নতুন না সম্ভবত আমার পেশার যে কারো কাছেই। এসব কথা শুনেই আমাদের বেড়ে উঠা, এসব দেখে দেখে আমাদের মেডিকেল অফিসার থেকে প্রফেসর হওয়া, আর এক দিন কাঁধে চড়ে অগস্ত যাত্রা। এসব কিছুর ব্যাখ্যা দেয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। সত্যি বলতে কি— আমি এসব বিষয় এড়িয়ে চলি।

যেমন— হাসি মুখে পাশ কাটিয়ে যাই যখন কেউ অবলিলায় প্রশ্ন করে বসে— আমি যে এতো রাত পর্যন্ত রোগী দেখি, তাতে আমার ছেলে-মেয়েরা আমাকে মিস করে কি না। কত শত বাচ্চার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজ বাচ্চাদের বঞ্চিত করে চেম্বারে আমাদের এই যে নিত্য স্বেচ্ছাবন্দিত্ব, তা তো উনি বুঝবেন না। অতএব মৃদু হেসে পাশ কাটাই, রাজনীতি কিংবা খেলার মাঠের কোনো গরম বিষয়ে আলোচনা ঘুরিয়ে দেই।

একই কারণে উত্তর দেই না যখন কেউ জানতে চায় টাকার পিছনে ছুটে চলায় এত কিছু আনন্দ আমাদের। উত্তর দিয়ে কি লাভ? উনার তো ব্যবসায়ীর ব্যবসা কিংবা শিল্পপতির শিল্প কারখানা চোখে পড়ে না। উনি তো জানতে চান না কেন আমি প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন রোগী চেম্বারে বসে ফ্রি দেখি। প্রতিটা দিনের দুই-তৃতীয়াংশ সময় হাসপাতালে হাসপাতালে অসুস্থ মানুষের সান্নিধ্যে কাটিয়ে যে টাকা দিন শেষে আমার পকেটে ঢুকে, তা যে আমি মনের আনন্দে খরচ করতে পারি না ক্লাবে কিংবা শপিংয়ে, সেই টাকা যে আমার নিরন্তর ছুটে চলার উপড়ি পাওয়া মাত্র, লক্ষ্য নয়, তা তো উনি বুঝবেন না।

আমরা কেন বার বার বিদেশ যাই এমন প্রশ্নের উত্তরও আমি হাসি মুখে পাশ কাটাই। বিদেশ যে আমার প্রতিদিনের একটানা-একঘেয়ে জীবনে একটু ব্যতিক্রম তাকি উনি বুঝবেন? উনি কি বুঝবেন যে শুধু মাত্র ওই ক’টি দিনই আমি ঘুমাতে যাই আর ঘুম থেকে উঠি আরেকজন ক্রিটিক্যাল রোগীর ইমার্জেন্সি ফোন পাওয়ার দুশ্চিন্তা মাথায় না নিয়ে। বলতে যেয়েও বলি না যে আমার বিদেশ সফর মানে তো বিদেশ ভ্রমণ না। আমার বিদেশ সফর হলো এয়ারপোর্ট-কনফারেন্স-এয়ারপোর্ট আর কখনো-সখনো সুযোগ হলে একটুখানি শপিং কিংবা সাইট সিইং।

তাই আমি হরেক বিষয় নিয়ে লিখলেও লিখি না আমার পেশা নিয়ে। আমি লিখি বারেক সাহেবকে নিয়ে, লিখি আধুনিক রূপকথাও। আমার লেখায় আসেন মোদি আর মমতা, আসে আমজনতা, আসে না শুধু আমার পেশা।

কিন্তু আজ আর পারলাম না। পারলাম না যখন দেখলাম নয়াপল্টনে বসে উনি বলছেন উনার নেত্রীর চিকিৎসা নাকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে না। হবে একটা বেসরকারি হাসপাতালে। উনি যদি বলতেন উনার নেত্রীর চিকিৎসা হবে বিদেশে, তাও কিছু লিখতাম না। কারণ আমাদের যাই কিছু ভালো সেগুলো তো উনাদের চোখে পড়ে না। উনাদের চোখে পদ্মা সেতু তাই জোড়াতালির ব্রিজ আর দূরবীনে চোখ লাগিয়ে উনারা মহাশূন্যে খুঁজে ফিরেন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের দুর্নীতির গল্প। উনারা ভারতে গিয়ে পানির কথা বলতে ভুলে যান, কিন্তু উনাদের অনাস্থা এমন একজন নেত্রীর প্রতি যিনি বিনা যুদ্ধে সম্প্রসারিত করেছেন বাংলাদেশের মানচিত্র- কি জলে, কি স্থলে!

কিন্তু উনি যখন আমার পবিত্র কর্মক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, প্রশ্ন তোলেন বিএসএমএমইউর সক্ষমতা নিয়ে, তখন না লিখে আর পারি না। কলম না ধরে পারি না যখন উনি একটা বেসরকারি হাসপাতালকে মাপতে চান এ দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসাপিঠ বিএসএমএমইউর সাথে একই পাল্লায়। কেউ চাইলে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা করাতে পারেন আবার কেউ নাও করাতে পারেন। কিন্তু তাই বলে যে প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেয়ায় আস্থা রেখেছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, বেলাল চৌধুরী কিংবা রশীদ হায়দারের মতো মহিরুহুরা, যে প্রতিষ্ঠান থেকে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা বিশেষজ্ঞরা চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন সারা দেশে, এমনকি ওই বেসরকারি হাসপাতালটিতেও, সেই বিএসএমএমইউ নিয়ে এমন বালখিল্যতা নিন্দনীয়, অগ্রহণযোগ্য, ধিক্কারজনক!

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *