ইতিহাসের দায় মোছন


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

1AD29D61-1E40-4797-ADA1-B60533CE8ED1  মিজান রহমান 
ইতিহাস যে কাউকে ছাড় দেয় না সেটা আবার ও প্রমাণিত হল । ক্ষমতা, অর্থ কিংবা গায়ের জোড়ে নিজের মত করে যে কেউ ইতিহাস রচনা করতে পারে, কিন্তু পাথরে খোদাই নামফলক কিংবা ভাস্কর্য কোন কিছুই চিরস্থায়ী হয়না। ১৭০০ সালে এডওয়ার্ড কোলস্টন ছিলেন ব্রিস্টল সিটির লর্ড মেয়র। পেশায় ছিলেন তিনি বড় মাপের একজন দাস ব্যাবসায়ী। দাসত্ব প্রথার মুলে ছিল- অসহায়, দরিদ্র, কাল চামড়ার মানবগোষ্ঠিকে তথাকথিত সম্ভ্রান্ত সভ্য মানবকুলের সেবায় জোরপুর্বক খাটানো। বিশ্বব্যাপী সে সময় দাসপ্রথা বৈধ ছিল। ইউরোপিয়ানদের মধ্যে দাস ব্যাবসায় ব্রিটিশরা ছিল এগিয়ে।

নবনির্বাচিত লর্ড মেয়র ক্লিও লেইক
নবনির্বাচিত লর্ড মেয়র ক্লিও লেইক

দীর্ঘ সময় ব্রিস্টলের লর্ড মেয়র হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন কোলস্টন। অবদান স্বরূপ  ব্রিস্টল সিটি হল উদ্বোধনের পর থেকেই লর্ড মেয়রের কামরায় টাঙানো থাকত এডওয়ার্ড কোলস্টন এর  বিশাল আকৃতির একটি ছবি। ১৭০২ সালে এই ছবিটি কোলস্টন নিজেই শখ করে আর্টিস্ট দিয়ে আকিয়েছিলেন। এছাড়া ব্রিস্টল শহরের সবচেয়ে পুরোনো মিউজিক ভেন্যুটি ও ছিল কোলস্টনের নামানুসারে।

সত্য কখনই গোপন থাকে না। কোলষ্টনের অতীতের সকল অমানবিক কর্মকান্ড ইদানিং সবার কাছে স্পষ্ট। দাস ব্যাবসা চালানোর সময় পরিবহনকালীন তার নিজস্ব মালিকানাধীন জাহাজে মারা পড়ে ২০,০০০ হাজার দাস। এতে ছিল ৪ হাজারেরও বেশী শিশু ও মহিলা। এটা ছিল ১৭‘শ সালের শেষের দিকের ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে নানা গবেষণায় বেড়িয়ে আসে কোলস্টনের অতীতের সকল মানবতাবিরোধী অপকর্মের ফিরিস্তি।

গত ৩শ বছর ধরে সবকিছু ঠিক মতই চলছিল। ব্রিস্টল কাউন্সিলে ২০১৬ সালের স্থানীয় সরকার (কাউন্সিল) নির্বাচনে গ্রীন পার্টি থেকে কাউন্সিলার হিসাবে নির্বাচিত হন এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণী। তার নাম ক্লিও লেইক। জ্যামাইকান এবং স্কটিশ বংশোদ্ভুত এই কমিউনিটি এক্টিভিস্ট ব্রিস্টল কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার পর পরই মেয়রের কাছে তুলে ধরেন ব্যাতিক্রমধর্মী একটি প্রস্তাব। এরকম একটি প্রস্তাব কেউ কোনদিন উপস্থাপন করবে সেটা ছিল কল্পনার অতীত। লর্ড মেয়রসহ সকল কাউন্সিলার বৃন্দ বিব্রতকর একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ক্লিও লেইকের প্রস্তাবটি ছিল ব্রিস্টল শহরের সবচেয়ে পুরনো এবং ঐতিহাসিক স্থাপনার নাম পরিবর্তন করা। শহরের বিখ্যাত স্থাপনাটির নাম হচ্ছে ‘কোলস্টন হল’ ।  এই নামের সাথে জড়িয়ে আছে অতীতের নির্মম ইতিহাস। স্থানীয় মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন কাউন্সিলার ক্লিও।

এডওয়ার্ড কলস্টোন
এডওয়ার্ড কলস্টোন

এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের মে মাসে লর্ড মেয়র হিসাবে শপথ নেন কাউন্সিলার ক্লিও লেইক। লর্ড মেয়র হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার এক মাসের মাথায় আরও একটি সাহসী পদক্ষেপ নিলেন ক্লিও লেইক।  লর্ড মেয়র মানে হচ্ছে শহরের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত নাগরিক, ব্রিটেনের রাণীর স্থানীয় প্রতিনিধি। শত বছরের প্রথা অনুযায়ী ব্রিস্টল লর্ড মেয়রের অফিসে তাই টাঙানো থাকত এডওয়ার্ড কোলস্টনের একটি পোট্রেট ছবি।
ওদিকে নবনির্বাচিত মেয়র ক্লিও লেইক তার অফিসে একজন কুখ্যাত দাস ব্যাবসায়ীর ছবি থাকবে সেটা মেনে নিতে পারেননি। অবশেষে গত ১৯ শে জুন সৃষ্টি হল ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। নির্বাহী আদেশে কোলস্টনের ছবিটি নামিয়ে ফেলা হয় লর্ড মেয়রের অফিস থেকে। সিদ্ধান্ত হয় যে কোলস্টনের ছবিটি শোভা পাবে স্থানীয় মিউজিয়ামে। সাধারন মানুষ এর ফলে জানতে পারবে সঠিক ইতিহাস। দাস ব্যাবসায় ব্রিটেনের অতীত আধিপত্য উদ্ভাসিত হবে নতুন প্রজন্মের কাছে। ছবি নামানোর মুহুর্তে বিভিন্ন মিডিয়ায় সাক্ষাতকার প্রদান কালে লর্ড মেয়র ক্লিও লেইক এমন মন্তব্য করেন।
ব্রিস্টল শহরে কোলস্টনের নামানুসারে রয়েছে অনেকগুলো স্থাপনা, স্কুল এবং প্রতিষ্ঠান । সেগুলির নাম পরিবর্তন করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।
CEC8932B-D031-4375-970B-3CFB041A7CBF১৭ শ সালে রয়েল আফ্রিকা কোম্পানীর মুল নায়ক ছিলেন কোলস্টন। তার মুল ব্যাবসা ছিলে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জাহাজ ভর্তি দাস নিয়ে আমেরিকায় বিক্রি করা। এর ফলে অতীতের কলংক থেকে ব্রিটেন কিছুটা হলে ও দায়মুক্ত হবে – এমনটাই মনে করেন সচেতন মহল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ জাতীয় ঘঠনা থেকে শিক্ষা নেয়ার মত রয়েছে অনেক কিছু । নামফলক ও ফটোবাজীতে বাঙালীর চেয়ে অগ্রসর আর কোন জাতি রয়েছে বলে আমার জানা নেই। দেশ জন্মের পর থেকে ক্ষমতার অপব্যাবহার এবং তৈলমর্দন কালচারের সুবাদে নিজের মত করে ইতিহাস গড়ে তোলার অপচেস্টা সবকটি সরকারের আমলে অব্যাহত ছিল।
মিজান রহমান: এডিনবরা বসবাসরত সাংবাদিক

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *