সু চি’র নির্দেশে রোহিঙ্গাদের জমিতে স্থাপিত বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সত্যবাণী

মিয়ানমারঃ জোরালো হওয়া আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখাইনে স্থাপিত বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ করেছে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এবং মিয়ানমারের শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেওয়া জমিতে ওই বৌদ্ধগ্রাম স্থাপিত হয়েছিল।একজন আইনপ্রণেতাকে উদ্ধৃত করে মিয়ানমারভিত্তিক ইরাবতি জানিয়েছে,জাতিসংঘের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির নির্দেশনায় পুলিশ বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদ করেছে।জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে মিয়ানমারের নিস্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের একদিনের মাথায় বৌদ্ধগ্রাম উচ্ছেদের খবর জানা গেল।

গত বছরের ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাবিরোধী অভিযানের কারণ বলা হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে এবং তাদের ফেরার সমস্ত পথ বন্ধ করতে আরসার হামলার আগে থেকেই পরিকল্পিত সেনা-অভিযান শুরু হয়েছিল।চলমান জাতিগত নিধনে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিপুল পরিমাণ শরণার্থীকে ফিরিয়ে নিতে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তি করতে বাধ্য হয় মিয়ানমার।তবে রোহিঙ্গা সংকট পর্যবেক্ষণে ৭ দিনের বাংলাদেশ সফরের শেষদিনে রবিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংহি লি  বলেছেন,যেহেতু এটি পরিষ্কার যে মিয়ানমার সরকার কার্যত কোনও অগ্রগতিই অর্জন করেনি অর্থাৎ,রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করার আইন, নীতি ও প্রথার বিলুপ্তিতে এবং দক্ষিণ রাখাইনকে নিরাপদ করে তুলতে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি,সেহেতু নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

জাতিসংঘ কমিশনের পক্ষ থেকে এমন বিবৃতি প্রকাশের একদিনের মাথায় সোমবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় দক্ষিণাঞ্চলের মংডু শহরের কাছে রোহিঙ্গাদের পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামে স্থাপন করা বৌদ্ধ গ্রাম উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। দেশটির সংসদের উচ্চ কক্ষের সদস্য উ কিয়াও কিয়াও জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশের প্রায় ১০টি গাড়ি থিন বাও গুই গ্রামে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সেখানে রোহিঙ্গাদের জমিতে ৪৮টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে পুলিশ এসব ঘর ভেঙে ফেলা শুরু করে। ঘর ভেঙে দেওয়ার সেখানকার বাসিন্দাদের কেউ কেউ পাশের দিন ইন গ্রামে চলে যান। অন্য যান কিয়াউক পান দু গ্রামে। এই আইনপ্রণেতা আরও জানান, ওই বসতি স্থাপনের নেতৃত্বে থাকা তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার আগে স্থানীয় একটি আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ওই তিনজনের বিরুদ্ধে ‘জনগণের শান্তির প্রতি হুমকি’র অভিযোগ আনা হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

শুক্রবার জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানায় বলা হয়, তুন মিয়ান্ট নাইং ও তার স্ত্রী ওহমার কিয়াও এবং তার সহযোগী অং নাইংকে সোমবার সকাল ১০টার সময় আদালতে হাজির করতে হবে। তবে ওই নির্দেশনায় মামলার বাদী বা তাদের গ্রেফতারের কারণ সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। মংডুর কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তুন মিয়ান্ট নাইং মিয়ানমারে কট্টর বৌদ্ধদের সংগঠন প্যাট্রিয়োটিক অ্যাসোসিয়েশন অব মিয়ানমার বা মা বা থা’র সদস্য। সাবেক এই সেনা সদস্য গত বছর মংডুতে ভয়াবহ সহিংসতার সময় কট্টর বৌদ্ধদের সেখানে যেতে সহায়তা করতেন। উইন ইরাবতিকে টেলিফোনে জানান, গ্রেফতারি পরোয়ানায় আনা অভিযোগ বিতর্কিত বসতি স্থাপন সংক্রান্ত আর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ দায়ের করেছে।

তথাকথিত দাফতরিক গোপনীয়তা আইন ভঙ্গের ঘটনায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ওয়া লোনে ও কাউ সোয়ে উ’র গ্রেফতারের পর ইরাবতির প্রতিবেদক সরেজমিনে মংডু পরিদর্শন করেন।  সেখানে ইন দিন গ্রামে মিয়ানমার বাহিনীর হাতে ১০ রোহিঙ্গার গণহত্যার বিষয়ে রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের করা প্রতিবেদন সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছিল ইরাবতি। ইন দিন গ্রাম থেকে থিন বাও গুয়ে গ্রাম মাত্র ৫ মিনিটের দূরুত্বে অবস্থিত।  আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গত জুন মাসে তাদের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বহিস্কার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানকে অপব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলো মিয়ানমারের সেনা প্রধান জেনারেল মিন অং হালাইংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের দাবি জানিয়ে আসছে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে থিন বাও গুয়ে গ্রামে নতুন প্রায় ১০০ ঘর নির্মাণ করে বসতি স্থাপন করা হয়। আর গ্রামের প্রবেশমুখে একটি অস্থায়ী বৌদ্ধ মঠও স্থাপন করা হয়। রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর পুড়িয়ে দেওয়া বাড়ি-ঘরের পাশে তারা এই নতুন বসতি স্থাপন করে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি’র মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সেই ‘আদর্শ বৌদ্ধগ্রাম’ নির্মাণের কথা।  বলা হয়েছিল, বুলডোজারে রোহিঙ্গা স্মৃতি মুছে দিয়ে বিপুল সামরিকায়িত রাখাইনে এখন বৌদ্ধ মডেল গ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে, রাখাইন-বৌদ্ধদের অর্থায়ানে পরিচালিত সংস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইন গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছিলো। সোমবারের প্রতিবেদনে ইরাবতি জানিয়েছে, সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় পতাকা ও লাগানো বটগাছ প্রায় ৩০০ ফুট দূরের মহাসড়ক থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। তবে বসতি স্থাপনের কয়েক সপ্তাহ পরই তা সরিয়ে ইন দিন গ্রামে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এরপর প্রায় ৫০টির মতো পরিবার সেখানে চলে যায়। এসব পরিবারের বেশিরভাগই রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে সেখানে এসেছে।  সম্পতি এই নতুন বাসিন্দারা সাংবাদিকদের বলেছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের এক সপ্তাহের মধ্যে ওই স্থান ত্যাগ করতে বলেছে। অন্যথায় তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিতর্কিত বৌদ্ধগ্রাম স্থাপনের বিষয়ে গত ৩ জুলাই আইনপ্রণেতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে এক পরামর্শমূলক সভা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। উইন বলেন, ওই সভায় বসতির জায়গাগুলোকে ‘বাঙালি সম্প্রদায়ে’র বলে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসেবে অভিহিত করে থাকে। তাদের দাবি, ব্রিটিশ শাসনামালে ওই এলাকায় কৃষি শ্রমিকের অভাব পূরণের জন্য বাংলাদেশ থেকে এসব মানুষকে নিয়ে আসা হয়েছিল। উইন আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আমাদের জানায়, নতুন বসতি সম্পর্কে সেস্ট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র কাছে অভিযোগ করেছে জাতিসংঘ। আর এ কারণে তিনি নিয়ম ভঙ্গের কারণে নতুন নির্মিত গ্রাম সরিয়ে নিতে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন’। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বসতি স্থাপনকারীদের কয়েকজন শীর্ষ সদস্যকে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া সেখানে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে কর্তৃপক্ষে পক্ষ থেকে বসতি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ছাপানো নির্দেশনাও জারি করা হয়েছে। তবে বসতি উচ্ছেদের ব্যাপারে জানার জন্য ইরাবতির পক্ষ থেকে সাধারণ প্রশাসন বিভাগের জেলা কর্মকর্তা উ ইয়ে হাতুতের সঙ্গে সোমবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারা যায়নি।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *