থাই গুহায় কিশোরদের সঙ্গে থাকা চিকিৎসকের দুঃসংবাদ!


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সত্যবাণী

থাইল্যান্ডঃ একইসঙ্গে তিনি একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ও দক্ষ ডুবুরি।আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার হিসেবেও রয়েছে তার সুখ্যাতি।মেধার এই বিরল সমন্বয়ই অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক রিচার্ড হ্যারিসকে থাইল্যান্ডের থাম লাং গুহার ভেতরে  নিয়ে গিয়েছিল।৯ দিন নিখোঁজ থাকার পর যখন গুহার মধ্যে কিশোর ফুটবল দলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়,তখন থাইল্যান্ডে ছুটি কাটাচ্ছিলেন অ্যাডিলেডের এই চিকিৎসক।সেখান থেকে স্বেচ্ছায় ওই শিশুদের সাহায্য করতে যান তিনি।হ্যারিস গুহার মধ্যে গিয়ে কিশোরদের স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত হন।সবাইকে বের করে আনা পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।গুহা থেকে বের হয়ে আসা সবশেষ উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে ছিলেন তিনি।তবে গোটা বিশ্ব যখন আনন্দে ভাসছে,সেই আনন্দে শামিল হওয়া হয়নি হ্যারিসের।গুহা থেকে বের হয়েই পিতার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে দেশে ছুটে যেতে হয় তাকে।স্বজন ও বন্ধুরা জানিয়েছেন,খবরটি তার জন্য যথেষ্ট পীড়ার কারণ হয়েছে।

গত ২৩ জুন ফুটবল অনুশীলন শেষে ২৫ বছর বয়সী কোচসহ ওই ১২ কিশোর ফুটবলার গুহাটির ভেতরে ঘুরতে গিয়েছিল।কিন্তু বৃষ্টিতে গুহার প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আর বের হতে পারেনি।রবিবার (৮ জুলাই) থাইল্যান্ড সরকার শিশুদের উদ্ধারে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তিন দিনের সফল অভিযানে উদ্ধার হয় কোচসহ ১২ খুদে ফুটবলার।গুহায় আটকে পড়াদের কয়েক ধাপে বের করা হয়।আর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে কাকে কখন বের করতে হবে তা নির্ধারণ করে দেন এই অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক।তার কথামতোই সবচেয়ে দুর্বল কিশোরকে সবার আগে গুহা থেকে বের করা হয়।পরে সফলভাবে অন্যদেরও বের করে আনা হয়।

হ্যারি হিসেবে পরিচিত ডা.হ্যারিস গুহার বাইরে বের হওয়া সর্বশেষ উদ্ধারকারীদের একজন।ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী,তিন থাই নেভি সিল সদস্যের সঙ্গে তিনি বের হয়ে এসেছিলেন সবার শেষে।সে সময় গুহার নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পানি বেড়ে যাচ্ছিলো।তবে ‘মিশন ইম্পসিবল’ ধারার একটি অভিযান শেষে উদযাপনের আনন্দে অংশ নেওয়া হয়নি তার। কারণ,বুধবার গুহা থেকে বের হওয়া অল্প সময় পরেই নিজের বাবার মৃত্যু সংবাদ পান তিনি।হ্যারির নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সাউথ অস্ট্রেলিয়ান অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, এমন রুদ্ধশ্বাস অভিযানে শারীরিক ও মানসিক চাপের পর এমন খবরে তার পরিবারের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে।যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা মেডস্টারের চিকিৎসক ডা.অ্যান্ড্রু পিয়ার্স জানান, ‘হ্যারি একজন শান্ত ও দয়ালু মানুষ। এই অভিযানে সহায়তার করার জন্য তিনি দ্বিতীয়বার ভাবেননি।বলেন ‘এটা উত্থান-পতনের একটি আবেগপূর্ণ সপ্তাহ’।

অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, ডা. হ্যারিকে বিশেষ করে ব্রিটিশ ডুবুরিরা চিনতে পারেন। পরে থাইল্যান্ড সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই উদ্ধার অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়ে বিশপ বলেন, ‘তিনি (হ্যারি) উদ্ধার অভিযানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন’। বিশপ আরও জানান, হ্যারি গুহা অভিযানে পারদর্শিতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা চিয়াং রাই’র ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নারোংসাক ওসোটানাকর্ন বুধবার অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম নাইন নিউজ’কে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ানরা আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন, বিশেষ করে ওই চিকিৎসক’। হ্যারি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খুব ভালো। সবচেয়ে ভালো’। আর হ্যারির বান্ধবী সুয়ে ক্রোয়ি বিবিসি’কে বলেন, ‘চিকিৎসক একজন বিনয়ী ও নিঃস্বার্থ পারিবারিক মানুষ। তার উপস্থিতি গুহার মধ্যে শিশুদের স্বস্তি দিয়েছে’। ক্রোয়ি আরও বলেন, ‘তিনি শিশুদের সঙ্গে দারুণ। শিশুদের গুহার মধ্যে চলাচলে জন্য প্রস্তুত করতে তিনি সবচেয়ে ভালো উপায় নিশ্চিত করেছেন। তাদের সহায়তার জন্য তিনিই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ডা. হ্যারিকে প্রশংসা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন অনেকে। তারা হ্যারিকে অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবিও জানিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

অভিজ্ঞ ডুবুরি ডা. হ্যারি একজন আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফারও। তিনি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ক্রিসমাস আইল্যান্ড ও চীনের বেশ কয়েকটি গুহা অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ২০১১ সালে এক মর্মান্তিক গুহা অভিযানে তার বন্ধু অ্যাগনেস মিলোওকা বাতাস ফুরিয়ে গিয়ে মারা যান। হ্যারি তার লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলিয়ে বিশপ বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে চিকিৎসা সহায়তা দলের সঙ্গে কাজ করায় হ্যারি কর্তৃপক্ষের কাছে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ভানুয়াতুতে অস্ট্রেলিয়ান এইড মিশনেও অংশ নিয়েছেন। বিশপ আরও বলেন, ‘তিনি একজন অসাধারণ অস্ট্রেলিয়ান। থাইল্যান্ডে উদ্ধার তৎপরতায় তিনি নিশ্চিতভাবে বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন’।

হ্যারির পাশাপাশি তার সঙ্গী ক্রাইগ চ্যালেনেরও প্রশংসা করেন বিশপ। অস্ট্রেলিয়ার পার্থের এই পশুচিকিৎসক গুহার মধ্যে হ্যারির সঙ্গেই ছিলেন। তারা দুজন ২০ জনের অস্ট্রেলিয়ান উদ্ধারকর্মী দলের সদস্য ছিলেন। তাদের সঙ্গে পুলিশ ও নৌবাহিনীর ডুবুরিরাও ছিলেন। এমন দুঃসাহসিক অভিযানের পর অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকোম টার্নবুলের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন হ্যারি। ওই সময় তিনি অভিযানে সফলতার জন্য আটকে পড়া ১২ কিশোরকেই আসল ‘হিরো’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘বড় বীর হলো ওই ১২ শিশু আর তাদের দেখাশোনাকারী থাই নেভি সিলের চার সদস্য’। হ্যারি আরও বলেন, ‘তারা নিজেরাই নিজেদের মনোবল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। তাদের ওই অবস্থায় না পেলে আমরা কিছুই করতে পারতাম না’।

হ্যারির এমন কাজের জন্য প্রশংসা পেয়েছেন নিজ দেশের চিকিৎসকদের সংগঠন অস্ট্রেলিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের। সংগঠনটির টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে হ্যারিকে ‘একজন চমৎকার চিকিৎসক ও মানুষ’ বলে অভিহিত করা হয়। সংগঠনটির সভাপতি ডা. টনি বারটনি বলেন, ডা. হ্যারিস অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে নিজের জীবনে ঝুঁকি নিয়েছেন। এটা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তিনি বলেন, এখানে ডা. হ্যারিসের প্রচেষ্টা অস্ট্রেলিয়ার অনেক গতানুগতিক চিকিৎসকের চেয়ে সম্পূর্ণভাবে ব্যতিক্রমী আর এটা দায়িত্বের চেয়েও বেশি কিছু।

সূত্র: বিবিসি, স্ট্রেইট নিউজ

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *