পর্যটকের ডায়রী: ‘মাচু পিচু’-সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পাওয়ার বিশ্বাসে তৈরী হয় যে শহর


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

পর্যটন ডেস্ক
সত্যবাণী

মাচু পিচু, পেরু: কলম্বাসের আমেরিকা আবিস্কারের আগের সময়কার একটি শহর ‘মাচু পিচু’। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা ইনকা যুগে প্রতিষ্ঠিত এই শহরটির অবস্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ  থেকে ৭হাজার ৮শ ৭৫ ফিট উচ্চতায়। ‘যত উচুতে উঠা যাবে ততই সৃষ্টিকর্তার কাছাকাছি পৌঁছা যাবে’-এমন বিশ্বাস থেকেই ১৪৫০ সালে পেরুর উরুগাম্বা উপত্যকার উপরের একটি পর্বত চূড়ায় তৈরী হয় এই শহরটি। প্রতিষ্ঠার একশ বছর পর ইনকা সভ্যতা স্পেন দ্বারা আক্রান্ত হলে পরিত্যক্ত হয় মাচু পিচু। 

কয়েক শ বছর অজ্ঞাত থাকার পর ১৯১১ সালে হাইরাম বিঙাম (ইংরেজি: Hiram Bingham) নামে এক মার্কিন ঐতিহাসিক এটিকে আবার সমগ্র বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন। তারপর থেকে মাচু পিচু পর্যটকদের কাছে একটি আকর্ষণী দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। এটিকে ১৯৮১ সালে পেরুর সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ইউনেস্কো ১৯৮৩ সালে এটিকে তাদের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এটি বর্তমান বিশ্বের সাতটি নতুন বিস্ময়েরও একটি। ইনকা সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শণ ‘মাচু পিচু’কে বলা হয় ‘ইনকাদের হারানো শহর’ 

মাচু পিচু পর্বত চূড়ায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশী পর্যটক নাফিস হক ও মাহাথির পাশা
মাচু পিচু পর্বত চূড়ায় ব্রিটিশ-বাংলাদেশী পর্যটক নাফিস হক ও মাহাথির পাশা

মাচু পিচু ঐতিহ্যবাহী ইনকা বাস্তুকলার এক অনুপম নিদর্শণ। পালিশ করা পাথর নির্মিত এই শহরের প্রধান স্থাপনাগুলো হচ্ছে ইন্তিউয়াতানাসূর্য মন্দিরতিন জানালা ঘর ইত্যাদি। পুরাকীর্তিবিদদের কাছে মাচু পিচুর পবিত্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত অংশে এ স্থাপনাগুলো অবস্থিত। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে হাইরাম বিঙাম মাচু পিচু থেকে যে সব পুরাকীর্তি নিয়ে গিয়েছিলেন সেসব ফেরত দেবার জন্য ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পেরু সরকার ও  ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে অতিরিক্ত পর্যটক সমাগমের ফলে এই প্রাচীন শহরের অস্তিত্ব নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন; উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে এখানে আগত পর্যটকের সংখ্যা ৪০০,০০০ ছাড়িয়ে যায়।

ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগে ১৪৫০ সালের দিকে মাচু পিচু নির্মিত হয়। কিন্তু তার ১০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে। সম্ভবতঃ স্পেনীয় অভিযাত্রীদের আগমনের আগেই এই শহরের অধিকাংশ অধিবাসী বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। মাচু পিচুর সন্ধানকারী হাইরাম বিঙাম এবং আরও অনেকেরই মতে এই সুরক্ষিত শহরটি ইনকাদের ঐতিহ্যগত জন্মস্থান অথবা সূর্য কুমারীদের পবিত্র কেন্দ্র ছিল।

অন্য একটি মতবাদ অনুসারে মাচু পিচু একটি ইনকা লিয়াক্তা বা এমন একটি উপনিবেশ যা বিজিত অঞ্চল সমূহের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রনে ব্যবহৃত হত। আবার কেউ কেউ মনে করেন এটি একটি জেলখানা হিসাবে ভয়ংকর অপরাধীদের রাখার জন্য নির্মিত হয়েছিল। অন্যদিকে জন রো (ইংরেজি: John Rowe) ও রিচার্ড বার্গার (ইংরেজি: Richard Burger) সহ আরও অনেকের গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মাচু পিচু কোনও প্রতিরক্ষামূলক আশ্রয়স্থল নয়, বরং এটি ইনকা সম্রাট পাচাকুতিকের একটি অবকাশ কেন্দ্র। বেশির ভাগ পুরাতত্ত্ববিদই এই মতবাদকে সমর্থন করেছেন। এছাড়াও ইয়োহান রাইনহার্ডের উপস্থাপিত তথ্য এটা প্রমান করে যে, এই স্থানটিকে শহর নির্মানের জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল এর পবিত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অনেকেই ধারণা করেন এর পাহাড় চূড়াগুলোর অবস্থান প্রধান প্রধান জোতির্মন্ডলীয় ঘটনাবলীর সাথে সামঞ্জস্যতাপূর্ণ।

এই দুর্গনগরীটি ইনকাদের রাজধানী কোস্কো থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে অবস্থিত। কিন্তু এর অবস্থান অজ্ঞাত থাকার কারণে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এই শহরটি কখনও স্পেনীয়দের দ্বারা আক্রান্ত এবং লুট হয় নি। কয়েক শ বছর জনমানবহীন থাকার ফলে শহরটি এক সময় ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায় এবং তখন খুব কম লোকই এর অস্তিত্ব সম্বেন্ধে জানত। পরবর্তীকালে ১৯১১ সালের ২৪শে জুলাই মার্কিন ঐতিহাসিক ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রভাষক হাইরাম বিঙাম শহরটিকে বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন। আগেই মাচু পিচুতে গিয়েছিলেন এমন কিছু স্থানীয় মানুষ তাঁকে সেখানে নিয়ে যান। সেখানে বিঙাম শহরটির পুরাতাত্ত্বিক নিরীক্ষা ও জরিপ করেন। তিনিই মাচু পিচুর নাম দেন ইনকাদের হারানো শহর এবং তাঁর প্রথম বইটিও এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়। তিনি কখনওই স্থানীয় সেসব লোকদের কোনও উল্লেখ করেন নি যারা তাঁকে মাচু পিচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন; এমনকি মাচু পিচুর উদ্ঘাটনে তাঁদের কোনও কৃতিত্বও স্বীকার করেন নি। তিনি তাঁর গাইড হিসাবে শুধু স্থানীয় উপকথার উল্লেখ করেছেন।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *