রঙিন পত্রপল্লবে ছাওয়া সুন্দরী কানাডায় পাতা ঝরার দিন


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Riton লুৎফর রহমান রিটন

কানাডা শীতের দেশ। বরফের দেশ। কানাডায় আসবার আগে এইটুকুই জানা ছিলো। কিন্তু আমার জানা ছিলো না সেই শীত মানে কতোটা শীত। সেই বরফ মানে কতোটা বরফ। ২০০২ এর ২৮ মার্চ কানাডায় যেদিন অনুপ্রবেশ করলাম সেদিনই বুঝেছিলাম–আমার খবর আছে। তখন বরফকালের সমাপ্তি অধিবেশন চলছে। চতুর্দিকে বরফের আস্তরণ, তবে সেটা ক্ষয়িষ্ণু। ক্ষয় হতে হতেও তার হুমকি ধামকি মাঝে মধ্যেই–এই এলাম বলে।

কানাডার বরফ যে হাঁটু এবং কোমর সমান উঁচুদরের, সেটা কল্পনাও করিনি। কার যেনো কবিতার বইয়ের নাম ছিলো–হাঁতুড়ির নিচে জীবন? সেই কবি কানাডায় এলে হয়তো লিখতেন–বরফের নিচে জীবন! এমনই বরফ যে এখানকার নদীগুলোও জমাট বরফের পাথরে রূপান্তরিত হয়।

ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই তিন মাস কানাডা চলে যায় বরফের তলায়। শীত তখন হিমাঙ্কের নিচে মাইনাস ফর্টি! এই শীত এমন শীত যাকে আমি বলি হাড্ডি জমাট বাঁধা শীত। কানাডার শীত নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলাম ২০১২ সালে–”বাপ রে কী ভয়াবহ কানাডার শীত রে/ধাঁই করে ঢুকে যায় হাড্ডির ভিত্রে!…[য়্যাডাল্ট ছড়াসমস্ত/পৃষ্ঠা ৩৭১, অনিন্দ্য প্রকাশ]

প্রথম প্রথম কানাডায় এসে ভাবতাম–আমি শেষ! ফ্রোজেন ফিস হয়েই মরতে হবে আমাকে। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৩ এর শীত যখন মাইনাস ফর্টি অতিক্রম করে যেতো তখন আমার মনে হতো উইন্ডচিল প্লাবিত ঠান্ডায় আমার কানের লতিটা(ঝুলন্ত ছোট্ট তুলতুলে অংশটা) কিংবা নাকের ডগাটা বুঝিবা খসেই পড়ে গেছে রাস্তায় কোথাও। হাত দিয়ে স্পর্শ করে বুঝতে চাইতাম ওগুলো জায়গা মতো আছে কী না। কিন্তু বোঝা যেতো না। কারণ ঠান্ডায় নাকের ডগা আর কানের লতির অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে প্রচন্ড! তাই ওরা চেতন আর অবচেতনের মাঝখানে এনেস্থেটিক সিচুয়েশনে তন্দ্রাচ্ছন্ন।

টিভি পর্দায় রেড এলার্ট জারি করেছে আবহাওয়া পরিদপ্তর–হে নাগরিকগণ তোমরা সাবধানে চলাচল করিও। পর্যাপ্ত শীতের মোটা কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়া রাখিও। হাতের দস্তানা এবং মাথার বান্দরটুপি সঙ্গে লইতে ভুলিও না। ইহার পরেও একখানা মাফলারে নিজের মুখমন্ডলের সিংহভাগ ঢাকিয়া রাখিও কারণ ফ্রস্ট বাইট হইবার সম্ভাবনা প্রবল। আর ভুলেও নিজের নাকাগ্র ঘষাঘষিতে প্রবৃত্ত হইও না। তাহাতে নাকের অগ্রভাগ খুলিয়া পড়িয়া যাইতে পারে!
টেলিভিশনে এরকম ঘোষণা সম্বলিত লালের আবহে শাদা টেলপ দেখে আমার কেবলি বিটিভির মেধাবী প্রযোজক মোস্তফা কামাল সৈয়দের কথা মনে পড়ে যেতো। টিভির সাবেক জিএম মোস্তফা কামাল সৈয়দের একটা মুদ্রাদোষ ছিলো কথা বলতে বলতে নিজের নাকে একটা রাম ডলা দিতেন। কামাল ভাই উইন্টার সিজনে কানাডায় এলে আমি নিশ্চিত–নাক খোয়াবেন।

সামারে কানাডা খুব সুন্দর। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। অযুত বৃক্ষের নিযুত কোটি সবুজ পাতায় কানাডা থই থই করে। তবে সুন্দর কানাডা প্রচন্ড সুন্দরী হয়ে ওঠে অক্টোবরে, ফল সিজনে। এই সময়টায় কানাডার সমস্ত গাছের সবুজ পাতাগুলো ক্রমশঃ রঙিন হয়ে ওঠে। এই সময়ে হালকা হলুদ, গাঢ় হলুদ, হালকা সবুজ, টিয়ে সবুজ, চকোলেট, মেরুন, কমলা এবং লাল বর্ণ ধারণ করে বিপুল সংখ্যক পাতা। দিনে দিনে একটা পর্যায়ে হলুদ আর লালের ছোপ ছোপ রঙে বর্ণিল হয়ে ওঠে চারপাশ। জানালা দিয়ে যতদূর চোখ যায়–উজ্জ্বল রঙের মাতামাতি। পুরো কানাডা যেনো বা হয়ে ওঠে শিল্পী হাশেম খানের চোখ ধাঁধানো এক্রিলিকের রঙিন ক্যানভাস। এরকম লাল হলুদের হুল্লোড় একমাত্র হাশেম খানের ক্যানভাসেই দেখা যায়।

অটোয়ার(অন্টারিও)পাশের প্রভিন্স কুইবেক-এর ছোট্ট শহর ‘হাল’-এ বিশাল একটা পার্ক আছে গ্যেটেন্যু। গ্যেটেন্যু পার্কটায় বসবাস সহস্রকোটি বৃক্ষের। বার্চ, ওক, ম্যাপল এবং অন্যান্য গাছের বিস্তীর্ণ অভয়ারণ্যটি উঁচু নিচু পাহাড়িয়া ভূমি এবং জলের অবাধ মেলামেশায় ঘোর লাগা এক অঞ্চল হিশেবে বিখ্যাত।

মোহ বিস্তারি এই গ্যেটেন্যু পার্কে আমি আর শার্লি অক্টোবরের ছুটির দিনগুলোয় ছুটে যাই বারবার। বিমুগ্ধ নয়নে দেখি সবুজ পাতার রঙিন হয়ে ওঠার অনির্বচনীয় মুহূর্তগুলো। গ্যেটেন্যুর রঙিলা বিকেলগুলো আর গাঢ় লাল হলুদের আগুনলাগা সন্ধ্যাগুলো আমাকে মাতোয়ারা করে রাখে।

তবে পাতাদের এই সৌন্দর্য খুবই স্বল্পস্থায়ী। পাতাদের এরকম আচমকা ঝলমলে রঙিন হয়ে ওঠার অর্থ হচ্ছে–জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার লক্ষণ। যেনো, পাতাদের চিঠি এটা, মানুষের কাছে। পাতাগুলো বলে যায়–হে মানুষ, তোমরা এসে দেখে যাও ছুঁয়ে যাও। আমাদের ঝরে পড়ার দিন এসেছে। তোমরা লিখে রেখো ঝরা পাতাদের গল্প। পাতা ঝরার দিন বিষণ্ণ রঙিন।

এই রঙিন পাতার আয়ু বড়জোর দুই সপ্তাহ। সবুজ পাতাগুলো রঙিন হতে হতে ক্রমশঃ ফ্যাকাসে ধুসর এবং বিবর্ণ হলুদে মাখামাখি হয়ে লুটিয়ে পড়ে ধিরে ধিরে। ফের নতুন হয়ে কচি সবুজে নবজন্ম লাভ করার স্বপ্নে বিভোর হতে হতে লুটিয়ে পড়ে পাতাগুলো।

ঝরা পাতাদের গান আমি কান পেতে শুনি। পাতাগুলো গান গায় সমস্বরে–ও হাওয়া ও হাওয়া গো/ঝরিয়ে দিয়ে যাও গো আমায়/উড়িয়ে নিয়ে যাও/ভালোবাসার অর্ঘ্যগুলো/কুড়িয়ে নিয়ে যাও/ তোমার কাছে আজ পাতাদের এটুক শুধু চাওয়া গো/ও হাওয়া ও হাওয়া গো…।

বাতাসের সাধ্য কি পাতাদের এরকম আহবান উপেক্ষা করে? কোনো এক বিষণ্ণ সকাল কিংবা বিকেলে বিপন্ন প্রেমিক বাতাস প্রবল বেগে ছুটে আসা শুরু করে পাতাদের দিকে। ধাবমান বাতাসের তান্ডব চলে রাতভর। দিনভর।
পাতাগুলো ঝরে যায়।
শেষ হয় ঝরা পাতার গান।
শেষ হয় রঙিন পাতার দিন।

তারপর পত্রপল্লবহীন ন্যাড়া গাছগুলো কী বিষণ্ণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে কেবলই অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে একটুখানি উষ্ণতার জন্যে। অপেক্ষা করে কচি কচি নতুন সবুজ পাতার জন্যে, ডালে ডালে।

আমিও অপেক্ষায় থাকবো হে রঙিন পাতারা। কানাডায় আমার সবচে প্রিয় এই রঙিন সময়টায় এবার আমি তোমাদের ছেড়ে চলে এসেছি অন্য দেশে। আমেরিকায়, হিউস্টনে, আমার প্রিয় নদীর কাছে। আমি ফিরে যেতে যেতে জানি তোমরা ঝরে যাবে। আর তাইতো মেয়ের কাছে আসবার কয়েক ঘন্টা আগে তোমাদের শেষ বিদায় জানাতে একলা একা চলে গিয়েছিলাম তোমাদের কাছে, গ্যেটেন্যু পার্কে।
ভালো থেকো প্রিয় পাতাগুলো!

হিউস্টন, ০৮ অক্টোবর ২০১৮
[ফিচার ছবি:  গ্যেটেন্যু পার্কের রঙের মেলায় লেখক ২০০৪ সালে। আলোকচিত্রি শার্লি রহমান।]

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *