তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি ‘রাধারমন দত্ত স্মৃতি কমপ্লেক্স’


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

মো. মুন্না মিয়া
সত্যবাণী

সুনামগঞ্জঃ বৈষ্ণব কবি রাধারমন দত্ত স্মৃতি কমপ্লেক্স তিন বছরেও আলোর মুখ দেখেনি।গত ২০১৫ সালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি এবং অর্থ পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি রাধারমণ দত্তের শততম মৃত্যু বার্ষিকীতে ‘রাধারমন স্মৃতি কমপ্লেক্স’ নির্মাণ করার জন্য জায়গা নির্ধারণ করলেও তিন বছর পেরিয়ে গেলে তাঁর কোনো গতি দেখা যায়নি।তবে গেল বছর সুনামগঞ্জের তৎকালিন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সাবিরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেছিলেন- ‘ইতিমধ্যে আমরা শিল্পকলা একাডেমিতে রাধারমন স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মানের জন্য চাহিদা প্রেরণ করেছি।আশাকরি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে স্মৃতি কমপ্লেক্সের কাজে এগিয়ে যাব।”

গেল বছরের ডিসেম্বর গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বরাদ্দ বা অনুদান আসেনি বলে জানিয়েছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ।তিনি বলেছেন- আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি ;আশাকরি শীঘ্রই আমরা অনুদান পেয়ে যাবো।এলাকাবাসীর দাবি তুলে আনহার মিয়া মুন্না বলেন- রাধারমন স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ হলে আমাদের আগামী প্রজন্ম রাধারমন দত্ত সম্পর্কে জানতে পারবে।এতে করে রাধারমনের স্মৃতি রক্ষা হবে।রাধারমন ছিলেন প্রচুর সম্পদের অধিকারি।তার প্রচুর সম্পদ বিভিন্ন ভাবে ভোগ করা হলেও তাঁর স্মৃতিতে কিছু নেই জন্মভূমি জগন্নাথপুর উপজেলা।আমরা চাই জন্মভূমিতে রাধারমনকে নিয়ে করা হউক যাতে আগামী প্রজন্ম রাধারমন সম্পর্কে জানুক এবং রাধারমন নিয়ে গর্ববোধ করুক।

মরমি কবি রাধারমন দত্তের বিভিন্ন সম্পর্ক   একটি মহল ভোগ করে আসছে। এসব ভূমিখেকো চক্রের হাত থেকে রাধারমন দত্তের সম্পদ রক্ষা করতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান তিনি।তিনি উল্লেখ্য করে বলেন – আদালত কর্তৃক রাধারমন দত্তের সম্পদ দখলকারীদের উচ্ছেদ হওয়ার কথা থাকলেও প্রভাবশালী ওই চক্র উচ্ছেদ হচ্ছে না। ওই চক্রকে উচ্ছেদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার অনুরোধ জানান সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে।রাধারমন দত্ত ধামাইল গানের জনক হিসেবে পরিচিত সমগ্র দুনিয়ায়। তার গান দিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গীত পরিচালন করা হয়। এতে করে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দামাই গান।

লোকসঙ্গীতের এই পুরোধা ব্যক্তির শনিবার (১০ নভেম্বর) ১০৩ তম প্রয়াণ দিবস। প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ‘রাধারমণ দত্ত স্মৃতি সংসদ’ দুদিন ব্যাপি আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। প্রতিদিন দুই পর্বে আনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে। প্রথম পর্বে আলোচনা সভা ও দ্বিতীয় পর্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এতে স্থানীয় ও বিজ্ঞ সংগীত শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করবেন।

উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে- রাধারমন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ও ১২৪১ বাংলায় সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার আতুয়জান পরগনার কেশবপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা রাধামাধব দত্ত মাতা সুর্বণা দেবীও ছিলেন বিদগ্ধ ব্যাক্তি। কিশোর বয়স থেকে রাধরমণ সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সৃষ্টিকর্তার স্বরূপ অনুসন্ধানে মনোনিবেশে করেন। এজন্য তিনি বিভিন্ন সাধুসন্তের আদেশ উপদেশ অরে অরে পালন করতেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি মৌলভীবাজারের ঢেউপাশা গ্রামের সাধক রঘুনাথ গোস্বামীর সাধন ভজনের কথা জ্ঞাত হয়ে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ গ্রহণ করেন। শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব মতবাদের উপর ব্যাপক পড়াশুনা করেন। সবশেষে তিনি সহজিয়া মতে সাধন ভজন করেন। এজন্য তিনি বাড়ির পাশে নলুয়ার হাওরের একটি উন্মুক্ত স্থানে পর্ণকুঠির তৈরী করে; সেখানে সাধন ভজন করতে থাকেন। তিনি কৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলা নিয়ে লোকগান রচনা করেন। তিনি ভজন সংগীতে বিভোর হয়ে গান রচানা করে নিজেই তা গাইতেন। তাঁর মুখের বাণীতে তাঁর শিষ্যগণ তা কাগজে লিখে রাখতেন। তাঁর নিজ হাতে রচিত গানের কোন পান্ডুলিপি নেই। কারণ তিনি তাৎনিকভাবে ভাবরসে বিভোর হয়ে গীতরচনা করতেন।

কবি রাধারমণের পুরো পরিবারের পারিবারিক জীবন ধারায় বৈষ্ণব ও সুফীবাদের প্রবল প্রভাব ছিল পারিবারিক। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় উপসণার প্রধান অবলম্বন সংগীতের সংঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল শৈশব থেকেই। লোককবি জয়দেবের গীতগৌবিন্দ’র বাংলা অনুবাদ করেছিলেন তাঁর পিতা রাধামাধব দত্ত। পিতার সংগীত ও সাহিত্য সাধনা তাকেও প্রভাবিত করেছিল। রাধারমণ তাঁর শৈশব, কৈশর, যৌবন ও পরিণত বয়সে সে ধারাবাহিকতা তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।রাধারমনের বেশ কিছু গানের বই বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে।গ্রামবাংলার বিয়েশাদীতে রাধারমনের ধামাইল গান খুব জনপ্রিয়। দুই বাংলার বেতার ও টেলিভিশনে রাধারমনের গান প্রায়স প্রচারিত হচ্ছে। ইদানিং বাংলা সিনেমাতে রাধারমনের বেশ কিছু গান সংযোজিত হয়েছে।

ব্যক্তি জীবনে রাধারমন দত্ত ছিলেন তিন পুত্রের জনক। তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুত্রসহ স্ত্রী একযুগে মারা গেলে তার ভাবান্তর ঘটে এবং তার মনে বৈরাগ্য ভাবের সৃষ্টি হয়। সেই থেকেই তিনি সংসার ত্যাগী যোগীর মতো সাধন ভজনে মগ্ন হয়ে যান। তার প্রথম পুত্র বিপীন বিহারী দত্ত তখন তার মামার বাড়ি মৌলভীবাজারের ভুজবল গ্রামে যান এবং সেখানে স্থায়ী বসবাস করেন। তার বংশধরেরা বর্তমানে সেখানে বসবাস করছেন।

রাধারমন দত্ত ৮২ বছর বয়সে ১৩২২ বাংলার ২৬ কার্তিক ১৯১৫ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।জন্মভূমি জগন্নাথপুর পৌর শহরের কেশবপুর গ্রামে তাঁর দেহ সমাহিত করা হয়। তাঁরই শেষ স্মৃতি শ্মশান ঘাটটি বর্তমানে সমাধি হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। কেশবপুর গ্রামের নরসিং মালাকারের স্ত্রী নিদুমনি দাস রাধারমন দত্তের সমাধিতে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে সেবায়িতের ভূমিকায় কাজ করেছেন। প্রায় ৯ বছর আগে নিদুমনি দাস মারা যান।বর্তমানে একই এলাকার রশু মালাকারের স্ত্রী অনিতা রাণী মালাকার রাধারমণ মন্দিরের দেখাশোনার কাজ করে যাচ্ছেন।স্থানীয় রাধারমণ দত্ত স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে প্রতি বছরের ন্যায় ১০৩তম মৃত্যু বার্ষিকীতে দুদিন ব্যাপি আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন বলে আয়োজকদের মধ্যে আছকির মিয়া নিশ্চিত করে বলেন, ২০১৫ সালে সরকারীভাবে রাধারমণ দত্তের শততম মৃত্যুবার্ষিকী দুদিনব্যাপি জাকজমক ভাবে জগন্নাথপুর ও সুনামগঞ্জে উদযাপিত হয়েছিল।এবারও আমাদের সংগঠনের উদ্যোগে দুদিন ব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।প্রথম দিন আজ শুক্রবার (৯ নভেম্বর) আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল আলম মাসুমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রবীণ রাজনীতিবীদ সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সিদ্দিক আহমদ, সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য আলহাজ্ব মাহাতাবুল হাসান সমুজ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, সাবেক চেয়ারম্যান আকমল হোসেন, উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রিজু, ভাইস চেয়ারম্যান বিজন কুমার দেব, জগন্নাথপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র শফিকুল হক, পাটলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক, সংগঠনের সাবেক সভাপতি যুক্তরাজ্য প্রবাসী আনহার মিয়া মুন্না ও স্থানীয় কাউন্সিলর তাজিবুর রহমান।পরে সংগঠনের সভাপতি জিলু মিয়ার সভাপতিত্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হবে।দ্বিতীয় দিন শনিবার (১০ নভেম্বর) আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল আহাদ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুল আলম মাসুমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দেবজিৎ সিংহ, জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান,জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুনুর রশীদ চৌধুরী, সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামছুল আবেদীন, সুনামগঞ্জ জেলার কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাবেল, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট দেব দাশ চৌধুরী, জেলা উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।প্রতিদিন সন্ধ্যা ছয়টায় আলোচনা সভা শুরু হয়ে সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হবে বলেও জানান আছকির মিয়া।প্রতিদিন সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে আসা রাধারমণ ভক্তবৃন্ধ ও স্থানীয় বাউল শিল্পিগন এবং আগত গুনী সংগীত শিল্পীরা।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *