লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর সেই বিবৃতি: হিটলার বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের হত্যাকান্ডে লজ্জা পেতো


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
সত্যবাণী

লন্ডন: বৃহস্পতিবার ঐ‌তিহা‌সিক ১০ জানুয়ারি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭২ সালের এই দি‌নে পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি পাকিস্তান থেকে লন্ডন যান। তারপর দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরেন। 

লন্ডন পৌঁছে বঙ্গবন্ধু ৮ই জানুয়ারি সাংবাদিকদের কাছে একটি বিবৃতি প্রদান করেন। তাঁর হোটেলে আগত বিপুল সংখ্যক সাংবাদিকদের সামনে তিনি ইংরেজিতে বিবৃতিটি পাঠ করে শোনান। 

লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি
লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধুর সহযাত্রী হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি

বিবৃতিটির বাংলা অনুবাদ

জয় বাংলা

‘বাংলার মুক্তি সংগ্রামে আজ আমি স্বাধীনতার অপরিসীম ও অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এই মুক্তি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। আমার জনগণ যখন আমাকে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসাবে ঘোষণা করেছে তখন আমি ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’-এর দায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে একটি নির্জন ও পরিত্যক্ত সেলে বন্দী জীবন কাটাচ্ছি।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের জন্য ভারত, সোভিযেত ইউনিয়ন, পোল্যান্ড, ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন দানকারী মার্কিন জনগণ ও অন্যান্য দেশের জনসাধারণকেও আমি ধন্যবাদ জানাই। স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ এখন একটি বাস্তব সত্য। এদেশকে বিদেশের স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলাদেশ অবিলম্বে জাতিসংঘের সদস্য পদের জন্য অনুরোধ জানাবে।

পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। শুনানী অর্ধেক সমাপ্ত হওয়ার পর পাক কর্তৃপক্ষ আমার পক্ষ সমর্থনের জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করে। আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ‘বিশ্বাসঘাতক’-এর কলঙ্ক নিয়ে মৃত্যুদন্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্ত সবচেয়ে বিস্ময়কর, আমার বিচারের জন্য যে ট্রাইবুন্যাল গঠন করা হয়েছিল তার রায় কখনো প্রকাশ করা হবে না। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বিচারের নামে প্রহসন অনুষ্ঠান করে আমাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানোর ফন্দি এঁটেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো এই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করতে অস্বীকার করেন।

জনাব ভুট্টো আমাকে না বলা পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বিজয় সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। জেলখানা এলাকায় বিমান আক্রমনের জন্য নিষ্প্রদীপ জারী করার পর আমি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের কথা জানতে পারি। জেলখানায় আমাকে এক নিঃসঙ্গ ও নিকৃষ্টতম কামরায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল যেখানে আমাকে তারা কোন রেডিও, কোন চিঠিপত্র দেয় নাই। এমনকি বিশ্বের কোথায় কি ঘটছে, তা জানতে দেওয়া হয় নাই।

স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণের মত এত উচ্চমূল্য, এত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় জীবন ও দুর্ভোগ আর কোন দেশের মানুষকে ভোগ করতে হয় নাই। বাংলাদেশে নির্মম হত্যাকান্ড ঘটানোর জন্য পাকিস্তানী সৈন্যরা দায়ী। হিটলার যদি আজ বেঁচে থাকতো, বাংলাদেশের হত্যাকান্ডে সেও লজ্জা পেত।  

প্রেসিডেন্ট ভুট্টো আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যে কোন একটি সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারটি বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন। আমি তাঁকে বলেছি, আমার দেশবাসীর সাথে আলাপ-আলোচনা না করে আমি কোন কিছু বলতে পারবো না। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। আমি আমার জনগণের কাছে ফিরে যেতে চাই।’

সুত্র: বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত বক্তৃতা ও বিবৃতির সংকলন “বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ”(দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা ও পূর্বদেশ পত্রিকায় ৯ জানুয়ারি, ১৯৭২ তারিখে প্রকাশিত)

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *