শহরের বুকে কোথাও একটি ঘৃণাস্তম্ভ বানিয়ে দিন


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

dr-sopnil-inner20181105132302-1-150x150অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

 

 

 

এবারের ম্যানিলা সফরে যে হোটেলটায় ছিলাম তার আশপাশে শপিং সেন্টার আর রেস্টুরেন্টের ছড়াছড়ি।সকালে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম একটা সিরিয়ান রেস্টুরেন্টও আছে।আগে কখনও সিরিয়ান খাবার খাওয়ার সুযোগ হয়নি।কাজেই রাতে খাবারের সময় গন্তব্য সিরিয়ান রেস্টুরেন্ট আল দামাস্কি।হোটেলের কাছে বলে সঙ্গত কারণে হেঁটে যাওয়া।উচ্চৈঃস্বরে গান বাজছে আশপাশের যত রেস্টুরেন্টে,লাউড স্পিকারে।আমার হোটেলের লবিতেও গাইছেন একজন ফিলিপিনো ললনা।হঠাৎ খেয়াল করলাম কোথায় কোন ফিলিপিনো গান বাজছে না, শুধুই ইংরেজী।মনে পড়ল আসার পর থেকে ফিলিপিন্সের ট্রাডিশনাল পোশাক পরা কেউ চোখে পড়েনি।

ফিলিপিন্সের ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস এই সেদিনের। ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেনীয়রা মুসলিম রাজা সোলায়মানকে পরাজিত করে ফিলিপিন্স দখল করে নেয়। আজকের ফিলিপিন্স নামটাও তখনই দেয়া,স্পেনের তৎকালীন রাজা ফিলিপের নামে।স্পেনীয়রা ফিলিপিন্স দখল করার পর স্থানীয়রা তাদের দেশটাই শুধু হারায়নি, হারিয়েছে দেশের নাম,সংস্কৃতি,ঐতিহ্য আর ধর্ম।এক সময়ের মুসলিম প্রধান ফিলিপিন্স পরিণত হয়েছে এশিয়ার একমাত্র খ্রীস্টান রাষ্ট্রে।তবে যা পীড়াদায়ক তা হলো হারিয়ে গেছে ফিলিপিন্সের সত্যিকারের কৃষ্টি আর সংস্কৃতি।

অবাক হয়ে ভাবছিলাম বাঙালীর গ্রহণ আর প্রতিরোধের কি অসীম ক্ষমতা! বাংলাদেশের শেষ স্বাধীন নবাব বলে আমরা যাকে চিনি, তিনি না ছিলেন বাঙালী,না বলতেন বা লিখতেন বাংলায়। তার বাহিনী যখন পলাশীর প্রান্তরে হাতেগোনা কিছু ইংরেজ সৈন্যের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছিল, তখন আশপাশের গাঁয়ে যেসব কৃষক ছিলেন তারাও যদি কাস্তে-কোদাল নিয়ে ধাওয়া করতেন তাহলেও হয়তো এই ভূ-খণ্ডের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হতো। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।কারণ,তাদের কাছে সিরাজের পরাজয় ছিল শাসক বদল মাত্র, যাতে তাদের কিছুই এসে যেত না। আমি যদি ভুল জেনে না থাকি তাহলে এই ভূ-খ-ের সর্বশেষ বাঙালী শাসক ছিলেন হাজার বছর আগের পাল রাজারা আর তারপর ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাঝে কে না শাসন করেছে এ দেশ? লম্বা তালিকায় আছে ব্রিটিশ, ফরাসী, পারস্য, আরব, আফগান আর এমন কি আফ্রিকার ক্রীতদাসও। এই দীর্ঘ ঔপনিবেসিক শাসনের প্রতিক্রিয়ায় এই ভূ-খণ্ডের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বাঙালী সংরক্ষণ করেছে তার কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর বাঙালিয়ানাকে। বাঙালী মুসলমান আর বাঙালী হিন্দুর ধর্ম তাই আলাদা হলেও তাদের উৎসব-পার্বণগুলো রয়ে গেছে একই। বাঙালী মুসলমানের ঈদে যেমন আনন্দে ভাসে বাঙালী হিন্দু, তেমনি বাঙালী হিন্দুর দুর্গাপূজার ম-পে থাকে বাঙালী মুসলমানের উপচে পড়া ভিড়। আর একই সঙ্গে গ্রহণ আর বর্জনের বাঙালীর এই যে অদ্ভুত ক্ষমতা, এটাই বাঙালীর শক্তি আর এই শক্তিতে ভর করেই বাঙালী ঘুরে দাঁড়িয়েছে বার বার।

ফিলিপিন্স আর বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসের মিল অনেক। ম্যানিলা শহরের পুুরনো এলাকার একটি জায়গা ইন্ট্রামুরস। মূলত, স্পেনিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত সামরিক এলাকা এটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন চার বছরের জাপানী দখলদারিত্বের সময় এখানেই ছিল জাপানী সেনাবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। সে সময় অসংখ্য ফিলিপিনো মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে এনে এখানে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হতো। একটি দেয়াল আছে যেখানে এখনও অসংখ্য বুলেটের দাগ। হাজারো ফিলিপিনো মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে দেয়ালটি। আর আছে টর্চার সেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ফিলিপিন্সে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে দখলদার জাপানী বাহিনী। স্যারেন্ডারের ঠিক একদিন আগে ছয় শ’ জন বন্দী ফিলিপিনো গেরিলাকে হত্যা করেছিল জাপানীরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন চার বছর জাপানী অকুপেশনের সময় গণহত্যার শিকার হন এক লাখেরও বেশি ফিলিপিনো। সেই ইন্ট্রামোরস এখন ফিলিপিন্সের এক নম্বর পর্যটন কেন্দ্র। দারুণ সব বিচ ফেলে দেশী-বিদেশীরা দলে দলে শুনতে আসেন ইট পাথরের চার দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চাপা কান্না আর মুক্তির গান। ঠিক যেন একাত্তরের বাংলাদেশ!

ফিলিপিন্সের জাতির পিতা নেই, আছেন জাতীয় বীর ডাঃ হোসে রিজাল। পেশায় ছিলেন চক্ষু চিকিৎসক। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান ডাঃ রিজাল চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী নিয়েছিলেন জার্মানি আর স্পেন থেকে। ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী আর সাহিত্যিকও। আবিষ্কার করেছিলেন দুটি নতুন প্রজাতির ব্যাঙ আর সরিসৃপ। তার নামেই বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে এই দুটি প্রজাতির। ফিলিপিনো ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ করেছিলেন হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসনের সাহিত্য। ১৮৯৬ সালের ডিসেম্বরে ফায়ারিং স্কোয়াডে, প্রকাশ্য দিবালোকে, হাজারো লোকের সামনে একটি পার্কে ডাঃ রিজালের মৃত্যুদ- কার্যকর করেছিল সভ্যতার দাবিদার আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম সদস্য রাষ্ট্র স্পেন। এর ঠিক একদিন আগে সংক্ষিপ্ততম প্রহসনের বিচার শেষে তাকে মৃত্যুদ-ে দ-িত করে স্পেনিশ আদালত। ছয়জন ফিলিপিনো সেনাকে ডাঃ রিজালের মৃত্যুদ- কার্যকরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তাদের মাত্র একজনের বন্দুকে গুলি ভরা ছিল, কিন্তু সেটা জানতেন না ছয়জনের কেউই। তারা প্রত্যেকেই ডাঃ রিজালের বুকে গুলি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। প্রথমে তাদের ছয়জনের আর তার পরে ডাঃ রিজালের মৃত্যুদ- কার্যকর করেছিল স্পেনিস সেনারা সেদিন সকালে।

এখানেই একটা বড় পার্থক্য ওদের সঙ্গে আমাদের। লজ্জায় অবনত আমি! যে বাঙালী হাজার বছরেও ছাড়েনি তার কৃষ্টি আর সংস্কৃতি, দু’একটা বিচ্ছিন্ন উদাহরণ বাদ দিয়ে, যে বাংলাদেশ আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পীঠস্থান, সেখানে কেন জাতির পিতার বক্ষ বিদীর্ণ হয়েছিল বাঙালী ঘাতকের বুলেটে? কেন আজও এদেশে বিলুপ্তপ্রায় একটি প্রজাতি স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস পায়?

ডাঃ রিজাল ফিলিপিন্সকে স্বাধীন দেখে যেতে পারেননি। তার মৃত্যুর অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় পর আমেরিকা ও জাপানের হাত ঘুরে ফিলিপিন্স স্বাধীন হয়েছিল। অথচ আমাদের জাতির পিতা আমাদের একটি স্বাধীন মানচিত্র আর স্বাধীন পতাকার উপহার দিয়েছিলেন। ফিলিপিন্স থেকে ফেরার পথে প্লেনে বসে অনেক ভেবেছি। দ্বিতীয় কোন উদাহরণ আর খুঁজে পাইনি যেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো অন্য কেউ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি নতুন রাষ্ট্র।

এমন দুঃসাহস তো পায়নি পাকিস্তান সরকারও। বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে তারা নিজ কবর খুঁড়িয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার বুকে বুলেট ছোড়ার বুকের পাটা তাদের হয়নি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট এদেশে যা ঘটেছে তা নিছক কোন নিন্দনীয় হত্যাকা- কিংবা সামরিক অভ্যুত্থান নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। সেদিন এদেশীয় কিছু কুলাঙ্গার যা ঘটিয়েছে তা করতে পারেনি পৃথিবীর নিকৃষ্টতম জাতিটিও। তারা যা করেছে তা বাঙালীর দু’চার বছরের নয়, বরং হাজার বছরের সংস্কৃতির পরিপন্থী। এমন ঘটনা বাঙালীর বাঙালিত্বের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের অনেক দিয়েছেন। এদেশকে তিনি তুলে এনেছেন বিশ্ববাসীর রোল মডেলের কাতারে। পাশাপাশি তিনি ’৭১, ৭৫ আর ২১ আগস্টের খুনীদের বিচার করে আমাদের জাতি হিসেবে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। তাঁর কাছে এ জাতির কৃতজ্ঞতা সীমাহীন। আজ মুজিব বর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে আমার রয়েছে আর একটি মাত্র আজি- ’৭৫-এর হত্যাযজ্ঞের কুশীলবদের আজও বিচার হয়নি। অথচ এটি অত্যন্ত জরুরী। আমরা জানি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী কে। এ জাতিকে চিনতে হবে তার হাজার বছরের নিকৃষ্টতম সন্তানটিকেও। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুগ্রহ করে এই উদ্যোগটি গ্রহণ করুন। বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করুন সেই কুলাঙ্গারটিকে, আর শহরের বুকে কোথাও একটি ঘৃণাস্তম্ভ বানিয়ে দিন, যেখানে বছরের আর কোনদিন না হোক অন্তত ১৫ আগস্ট গিয়ে একটি জুতা আর না হোক একটুখানি থু থু ছিটিয়ে আসতে পারব!

লেখক : চিকিৎসক ও গবেষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *