‘শিল্পী আক্রান্ত’: সোমেন চন্দকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্রের খসড়া (শেষ অংশ)


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Dilip Mojumdar দিলীপ মজুমদার

(১৯৪২ সালের ৮ই মার্চ মাত্র ২২ বছর বয়সে ঢাকায় রাজনৈতিক বিরোধীদের হাতে অকালে নিহত সাহিত্যিক সোমেন চন্দ স্মরণে)

(শেষ অংশ)

পাঁচ.

(বিভিন্ন ভঙ্গিমায় সোমেন । বইপত্র নাড়ছে, পড়ছে, লিখছে । ভাষ্য : শুধুমাত্র সাহিত্যের গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকতে চাননি সোমেন । মানুষের মুক্তিপথের সন্ধানই ছিল তাঁর সাধনা । গভীর অধ্যবসায়ের সঙ্গে রাত জেগে পড়তেন মার্কসবাদী সাহিত্য, জানার চেষ্টা করতেন চাষি-মজুরের সমস্যা । কৃষাণের মজুরের জীবনের শরিক হতে চাইতেন ।)

ছয়.

(শীতের সকাল । কুয়াশা । রেলওয়ে ওয়ার্কশপ । শিফট চেঞ্জের সময় । নাইট শিফটের শ্রমিকরা বেরিয়ে আসছে । গেটের ওধারে সোমেন ।গায়ে বিবর্ণ উলের চাদর, পায়ে বিদ্যাসাগরী  চটি ।কথা বলছে শ্রমিকদের সঙ্গে)

সোমেন : আপনি ইউনিয়নের সভ্য হয়েছেন ?

শ্রমিক১ : না ।

সোমেন : আপনি ?

শ্রমিক২ : গত বছর ছিলাম ।

সোমেন : আপনি ?

শ্রমিক৩ : সভ্য ! নাতো ।

সোমেন : আচ্ছা, আপনারা কি মনে করেছেন বলুন তো ! ইউনিয়নের  সভ্য না হয়ে একা একা বাঁচতে পারবেন ? ওরা শক্তিমান । ওদের সঙ্গে একা পারবেন লড়াই করতে ! পারবেন আপনার দাবি আদায় করতে !

(আরও শ্রমিক ভিড় করে আসে । সকলে উৎসুক হয়ে শোনে সোমেনের কথা)

সোমেন : না, একা একা বাঁচা যায় না । মালিকের সঙ্গে লড়াই না করে আপনারা আপনাদের দাবি আদায় করতে পারবেন না । মালিক তো মেরতে মেরে গায়ের রঙ ফ্যাকাসে করে দিল । তবু

আপনাদের চৈতন্য হচ্ছে না !

সাত.

(প্রগতি পাঠাগারের সামনে সোমেন ও সতীশ)

সোমেন : আমি শ্রমিক ইউনিয়নে কাজ করতে চাই সতীশদা ।

সতীশ :  না, না-

সোমেন : কেন ?

সতীশ : তোমার শরীর দুর্বল । তাছাড়া সে যে বড়ো পরিশ্রমের কাজ ।

সোমেন : পরিশ্রমই তো করতে চাই ।

সতীশ : তুমি বরং প্রগতি লেখক সংঘটা ভালো করে গড়ে তোল ।

সোমেন : তা তো করছি ।

সতীশ : দুটো একসঙ্গে—

সোমেন : কিন্তু একটার জন্যে আর একটা দরকার যে !

সতীশ : কি বললে !

সোমেন : শ্রমিক জীবনের অভিজ্ঞতা না থাকলে প্রগতি সাহিত্য লিখব কি করে ! এ যুগের পালাবদলে প্রোলেটারিয়েটের ভূমিকাই প্রধান । তাদের মধ্যে যদি কাজ না করতে পারলাম তাহলে শৌখিন কমিউনিস্ট বনে লাভ কি !

আট.

(জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে সোমেন লাভ করেছিল তার লেখার উপকরণ । তার বিখ্যাত ‘ইঁদুর’ গল্পের কথা ধরা যাক । গল্পের নায়ক সুকুমার আসলে সোমেনের আত্মপ্রতিকৃতি । সুকুমার ছিল মেহেনতি মানুষের আপনজন । রেলওয়ে ইয়ার্ডের পাশ দিয়ে আপন মনে হেঁটে যাচ্ছে সুকুমার। শশধর নামক এক শ্রমিক তাকে ডাকে)

শশধর : ও সুকুমারবাবু-

সুকুমার : আরে শশধর যে !

শশধর : কাছে আসুন কথা আছে ।

(সুকুমার আসে । দুজন পাশাপাশি বসে । শশধর বিড়ি ধরায়)

সুকুমার : কি ব্যাপার শশধর !

সুকুমার : সেদিন কারখানার সাহেব আমাকে ডেকেছিলেন ।

সুকুমার : কেন !

শশধর : শালা বলে কিনা : ড্রাইভার ইউনিয়ন ছেড়ে দাও, নইলে মুশকিল হবে ।

সুকুমার : আপনি কি বললেন ?

শশধর : বললাম ছাড়ব না । আপনার যা ইচ্ছা হয় করুন । বলেই এই রকম গটগট করে বেরিয়ে এলাম-

(শশধর বীরদর্পে হাঁটার ভঙ্গি করে । সুকুমার হাসে । দুজনে উঠে দাঁড়ায় । কথা বলতে বলতে পথ চলে । দূরে এঞ্জিনের সাঁ সাঁ শব্দ । চিৎকার । কয়েকজন শ্রমিক সুকুমারকে দেখে আনন্দে হৈ হৈ করে ওঠে)

সুকুমার : আরে ইয়াসিন,  দেশ থেকে কবে ফিরলেন ?

ইয়াসিন : দিন দুই হল ।

শঙ্কর : দেশে গিয়ে ইয়াসিন খুব বীরত্ব দেখিয়ে এসেছে জানেন সুকুমারবাবু-

ইয়াসিন : খালি ইয়ার্কি-

শশধর :  তাহলে নিজেই বল না ইয়াসিন ।

সুকুমার : হ্যাঁ বলুন না ইয়াসিনভাই ।

ইয়াসিন : তেমন কিছু নয় । তবে কিনা গাঁয়ের চাষিরাও জাগছে । তাদের একটা বৈঠকে হাজির ছিলাম । একজন আমাকে ইউনিয়নের কথা জানতে চাইল । আমি পকেট থেকে রসিদ বের করে দেখাতে তারা আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল-তুমি যে আমাদেরই একজন ।

শশধর ; জানেন সুরেন কি বলছিল ?

সুকুমার : কি ?

শশধর : বলছিল আপনি ব্যারিস্টার হলেন না কেন !

সুকুমার : তার মানে !

শশধর : আপনাকে কথায় হারানো যায় না । বিরোধীলোকেরা হেরে ভূত হয়ে যায় আপনার কাছে।

(সকলে হেসে ওঠে)

নয়.

(একতলা মাটির ঘর । সাত-আট জন শ্রমিকের মধ্যে সোমেন । দরখাস্ত লিখছে । দরখাস্ত নিয়ে তারা চলে গেল । দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন অনিল মুখার্জী । দেখতে পেয়ে সোমেন ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল)

সোমেন : আরে কি সৌভাগ্য, অনিলবাবু যে!

অনিল:  সে কি কথা ! সৌভাগ্য তো আমার ।

সোমেন:  এ কি বলছেন!

অনিল:  পাঁচ পাঁচবার চেষ্টার পরে দেখা পেলাম ।

সোমেন :  বসুন বসুন ।

(অনিলকে মাদুরে বসিয়ে সোমেন উঠে দাঁড়ায়)

অনিল : আবার উঠলেন যে!

সোমেন : এই আসছি, একটু বসুন ।

(সোমেন চলে যায় । স্টোভ জ্বালানোর শব্দ শোনা যায় । একটু পরে সোমেন চা নিয়ে ঢোকে)

অনিল : আবার এসব কেন ?

সোমেন : অতিথি সৎকার আর কি!

অনিল : সরলানন্দ সেদিন বলছিল আপনার কথা ।

সোমেন : আমার কথা! আমার আবার কি কথা!

অনিল : ঘর-সংসারের কাজেও আপনি এক্সপার্ট ।

সোমেন : বাবা আর আমি এখানে থাকি । বাবা সময় পান না । তাই-

অনিল : সরলা বলছিল তাকে নাকি আপনি নিজের হাতে রান্না করে মুসুরির ডাল আর ইলিশমাছের ঝোল খাইয়েছিলেন ।

সোমেন : হ্যাঁ সরলা এসেছিল একদিন ।

অনিল : নতুনকিছু লিখলেন?

(সোমেন একটা পত্রিকা এগিয়ে দেয় । ওতে ‘মহাপ্রয়াণ’ গল্প ছাপা হয়েছে । পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অনিল বলেন)

অনিল : এত কাজ করার পরে লেখেন কখন? আপনি তো দেখছি অসাধারণ লোক । সমীন্দ্র বলছিল শুধু লেখা নয়, আপনি পড়াশুনোও করেন সময় পেলে !

সোমেন : কোথায় আর পড়তে পারি ! বিদ্যে তো ম্যাট্রিক । ইংরেজি বই ভালো করে বুঝতে পারি না । দেখুন না কডওয়েলের ‘ইলিউশন আ্যন্ড রিয়েলিটি’ পড়ার চেষ্টা করলাম । অনেকটাই বুঝতে পারলাম না ।

দশ.

(কলকাতার বালিগঞ্জের দোতলা বাড়ি । জানালার গরাদে হাত রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে সোমেন । নিচের তলায় নির্মল ঘোষের অফিস ঘর । ‘বালিগঞ্জ’ পত্রিকার অফিস । একটু বাদে নির্মল ঘরে ঢুকলেন)

নির্মল : এ কি তুমি! এমন হঠাৎ!

সোমেন : হ্যাঁ । ঢাকা মেইলে চলে এলাম । এসে দেখি বাড়ি ফাঁকা ।

(নির্মল হাসেন । কালো কোট হ্যাঙ্গারে ঝোলান । পরিচারককে চা আনতে বলেন)

নির্মল : কদিন আগেই তোমার চিঠি পেলাম । তুমি তো বড়োদিনের বন্ধে আসবে লিখেছিলে!

সোমেন : আগেই চলে এলাম । আমার উপর আবার একটা দায়িত্ব দিয়েছে কিনা!

নির্মল : কি দায়িত্ব !

সোমেন : এখানে তো প্রগতি লেখক সংঘের সম্মেলন শুরু হচ্ছে । সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে হবে। ঠিক হয়েছে ঢাকাতেও আমরা প্রগতি লেখক সংঘ গড়ে তুলব ।

নির্মল : সম্মেলনে যোগ দেবে ?

সোমেন: হ্যাঁ ।

নির্মল : বেশ । নিয়ে যাব । কিন্তু তোমার প্রতিশ্রুতির কথা মনে আছে তো! সেই যে বিত্তহীন মধ্যবিত্তদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবে!

(সোমেন হাসতে হাসতে ব্যাগ থেকে উপন্যাসের পান্ডুলিপি বের করে নির্মলের হাতে দেয়, তারপর বলে)

সোমেন : প্লটটা শুনুন ।

(আলো কমে আসে । বন্যার ছবি ভেসে ওঠে । নৌকায় আসছে স্বেচ্ছাসেবকরা । গ্রামের ধারে জলমগ্ন একটা বাড়ি । জলে পা ডুবিয়ে সেই ঘরের বারান্দায় বসে আছে একটি মেয়ে । সোমেন তন্ময় হয়ে বলে যায়

সোমেন : এক বন্যাপীড়িত গ্রাম । সে গ্রামের এক মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মালতী ।ঘরে অভাব, তবু দারুণ স্বপ্নবিলাসী । বারান্দার নিচে জল দেখে, সেই জলে নিজের ছায়া দেখে তার আনন্দ । অথচ পিছনে তার অভুক্ত সংসার, খাবার ভিক্ষা, কান্না । এসবের মধ্যেও স্বপ্ন দেখে চলে সেই মেয়ে। এসময় গ্রামে ফ্লাড রিলিফ কমিটি এল । রজত এসেছে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে । মালতীর অবাস্তব স্বপ্নকে আঘাত করল রজত)

এগারো.

(কলকাতার রাস্তায় কখনও নির্মল ঘোষের সঙ্গে কখনও একা একা ঘুরছে সোমেন)

বারো.

(আশুতোষ মেমোরিয়েল হল । প্রগতি লেখক সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলন । বাইরে ফেস্টুন । বারবুশ, রোলাঁ, রবীন্দ্রনাথের ছবি । যুদ্ধবিরোধী বাণী ।সোমেন কথা বলছে একজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে)

সোমেন : কে কে এসেছেন ?

স্বেচ্ছাসেবক : মুলকরাজ আনন্দ, শৈলজানন্দ মুখার্জী, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার ।

সোমেন : রবীন্দ্রনাথ আসেন নি ?

স্বেচ্ছাসেবক : না, আসেন নি । তবে তিনি বাণী পাঠিয়েছেন ।

(এবার স্পষ্ট হয়ে উঠল সত্যেন্দ্রনাথের কন্ঠ । সোমেন শুনছে তন্ময় হয়ে)

সত্যেন্দ্রনাথ : এবার প্রগতি লেখক সংঘের খসড়া ইশতেহারটি আপনাদের অনুমোদনের জন্য উপস্থিত করছি ।– ভারতীয় সমাজে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে । প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে । চিরায়ত সাহিত্যধারার অবলুপ্তির পর থেকেভারতীয় সাহিত্যে জীবনবিমুখতার মারাত্মক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ।…..  সাহিত্যের মান যাদের হাতে অবনমিত হচ্ছিল সেই রক্ষণশীল শ্রেণির হাত থেকে সাহিত্যকে রক্ষা করা এবং জনগণের জীবনের সঙ্গে তাকে বাস্তবজীবনচিত্রণের উপযোগী ও ভবিষ্যতের কান্ডারী করাই  এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ।…. ভারতীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে গর্ব করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে আমরা সমালোচনা করব এবং সৃজনশীল ও পারস্পরিক কাজের মধ্য দিয়ে জাতির নবজীবন সঞ্চারের চেষ্টা করব ।

তেরো.

(চিন্তামগ্ন সোমেন হেঁটে যাচ্ছে শহরতলীর পথ দিয়ে । ভাষ্য : কলকাতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকায় ফিরে এল সোমেন । শত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘ গযে তোলার সঙ্কল্প তার । এই সংঘ নতুন চেতনা দেবে দেশবাসীকে । উদ্বুদ্ধ করবে নব ভাবনায় । চিনিয়ে দেবে শ্রেণিশত্রুকে । প্রেরণা দেবে তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের)

চোদ্দ.

(বিকেল । সরুগলি দিয়ে হাঁটছে সোমেন । গলায় গণসঙ্গীতের সুর । পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত)

কিরণ : এতদিন কাটিয়ে এলে কলকাতায় । একটা চিঠি পর্যন্ত পেলাম না ।

সোমেন : বিশ্বাস করো একদম সময় পাই নি ।

কিরণ : উঠেছিলে কোথায় ?

সোমেন : নির্মল ঘোষের বাসায় ।

কিরণ :  বালিগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক ?

সোমেন : হ্যাঁ । জানো কিরণ, ওই পত্রিকার পরের সংখ্যা থেকে ছাপা হবে আমার উপন্যাস ‘বন্যা’।

কিরণ : বাঃ, ভালো খবর । প্রগতি লেখক আন্দোলনের খবর কি ?

সোমেন : অনেক খবর এনেছি । [ ঝোলা থেকে কাগজপত্র বের করে ] এই ইশতেহার, এই সংবিধান ।

কিরণ : আমাদের সংগঠন গড়ার কাজে লাগবে । রণেশদার সঙ্গে দেখা হয়েছে ?

সোমেন : হ্যাঁ । পাঠাগারে মিটিং শুক্রবারে । আর শোন কিরণ, আমরা সোবিয়েতের উপর একটা চিত্র প্রদর্শনী করব । দেবপ্রসাদ আর তুমি হবে সে কমিটির যুগ্মসম্পাদক ।

কিরণ : কোথায় হবে প্রদর্শনী ?

সোমেন : সদর ঘাটের কাছে ব্যাপটিস্ট মিশন হলে ।

পনেরো.

(ব্যাপটিস্ট মিশন হলে চিত্র প্রদর্শনী । সোবিয়েত রাশিয়ার নানা চিত্র । মানুষের ভিড় । সোমেন ঘুরে ঘুরে ব্যাখ্যা করে বোঝাচ্ছে।)

ষোলো.

(হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা । চিৎকার । সরলানন্দের মুখ ভেসে ওঠে । তার কন্ঠে শোনা যায় : বৈশাখের কাঠফাটা রিদ । শহরে দাঙ্গা । রাজপথ দিনে-দুপুরে জনশূন্য । মানুষের পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে চলতে মানুষ ভয় পায় । বুক কাঁপে । কিন্তু বিশ্রাম নেই সোমেনের । হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিরাম নেই তার । অনলস শিল্পী তোমাকে নমস্কার।)

সতেরো.

(বাড়ি জ্বলছে । চিৎকার । ছোটাছুটি । একদল মারমুখী লোককে থামাবার চেষ্টা করে সোমেন । তারা তাকে ঠেলে ফেলে দিয়ে চলে যায় । অন্যদিক থেকে ভেসে আসে আর্তনাদ । সোমেন এগিয়ে গিয়ে দেখে একটা মৃতদেহ । ভালো করে দেখে ‘আরে এ যে মকবুল’ বলে সে শোকে ভেঙে পড়ে। এই সময় আর একদল মারমুখী জনতা আসে । সোমেন তাদের দিকে এগিয়ে যায়।)

সোমেন : আপনারা মকবুলকে মেরে ফেললেন ?

(জনতা চুপ)

সোমেন : কথা বলছেন না কেন ? ও কি কারও ক্ষতি করেছিল?

জনতা : না তা নয় তবে-

সোমেন : তবে কি ?

জনতা : ও মুসলমান । ওর জাতভাইরা যোগেনকে খুন করেছে ।

সোমেন : কি বললেন ?

(আর্তনাদ করে ওঠে সোমেন । তারপর নিজের মনে বলে : বাঃ ভালোই হল । মকবুল আর ষোগেন ছিল গলায় গলায় বন্ধু । আপনাদের দুই দলের পাগলামির বলি হতে হল দুই বন্ধুকে। কিন্তু এই পাগলামি আর কতকাল চলবে ? বলতে পারেন কবে থামবে এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা ?

আঠারো.

(প্রগতি লেখক সংঘের আসরে সোমেন । অচ্যুত গোস্বামী বলে)

অচ্যুত : ঢাকায় শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা । এ ক্ষেত্রে প্রগতি লেখকদেরও একটা ভূমিকা আছে। সাহিত্যের মাধ্যমে সচেতন করতে হবে মানুষকে । গত বৈঠকে দাঙ্গাবিরোধী গল্প লেখার আবেদন জানানো হয়েছিল । কেউ কি এনেছেন গল্প ?

সোমেন : আমি এনেছি ।

সকলে : পড়ুন গল্পটা ।

সোমেন : ছোট ছোট কতকগুলো  চিত্রের মধ্য দিয়ে দাঙ্গার পরিস্থিতি তুলে ধরেছি । দৃশ্যগুলির পটভূমিতে আছে এক পরিবার । মা-বাবা বিভ্রান্ত । ছোট ভাই অজয় হিন্দু সোশ্যালিস্টদের অশুভ চিন্তাদর্শের শিকার । বড়োভাই অশোক কমিউনিস্ট কর্মী । তাদের বাবা আর ফিরলেন না অফিস থেকে । দাঙ্গার শিকার হলেন তিনি ……..

(সোমেনের ‘দাঙ্গা’ গল্পের কিছু চিত্র ভেসে ওঠে)

১.

(দরজার কড়ানাড়ার শব্দ । মা দরজা খুললেন । অশোক ঢুকলো)

মা : একশোবার বলেছি রাস্তায় যখন-তখন বেরোবি না । কে শোনে কার কথা । যা না বাপু, মামার বাড়ি থেকে দিনকতক ঘুরে আয় ।

অশোক : এত কাজ ফেলে যাই কেমন করে মা ?

মা : কাজ না ছাই । কে শুনবে রে তোদের কথা ? তোদের রাশিয়া পারবে জার্মানির সঙ্গে ?

অশোক : পারবে না কেন ? বিপ্লবের মরণ নেই মা ।

(মা খাবার এনে অশোকের পাশে বসলেন । অশোক খেতে শুরু করে)

মা : হ্যাঁরে এ কি সত্যি !

অশোক : কি মা ?

মা : ওই যে তোর বাবা বললেন জার্মানি সব নিয়ে নিয়েছে রাশিয়ার ! তারা একেবারে এসে পড়েছে আমাদের দেশের কাছে !

(অশোক হো হো করে হেসে ওঠে)

অশোক : এঁরা হিটলারের চেয়েও লাফিয়ে চলেন ।

(এই সময় অজয় ঘরে ঢুকলো)

অজয় : জানিস দাদা, নবাববাড়ি সার্চ হয়ে গেছে ?

অশোক : এটি আবার কোথ্থেকে আমদানি হল ?

অজয় : বারে, নিজের কানে শুনে এসেছি ।

অশোক : কচু শুনেছ ।

অজয় : তা তো বলবেই । তোমরা কমিউনিস্টরা হিন্দুও নও, মুসলমানও নও ।

অশোক : তাহলে আমরা ইহুদির বাচ্চা নারে!

.

(রাত গভীর । ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করছে অশোক । উদ্বিগ্ন মা এলেন)

মা : তোর বাবা তো এখনো এলেন না !

অশোক : দেখি আর একটু ।

৩.

(ঢংঢং করে দুটো বাজল ।বাইরে সৈন্যদের টহল । মা-বোন কাঁদছে । অশোকের বন্ধু বিমল এল)

অশোক : কি হল বিমল ? কোন খোঁজ পেলি ?

বিমল : অফিস থেকে পাঁচটায় বেরিয়েছেন ।

অশোক : তাহলে !

(অসোকের অস্থিরতা বেড়ে যাব । তার চোখ ছলছল করে । এমন সময় ঘরে ধোঁয়া ঢোকে পাশের ঘর থেকে । অশোক ছুটে সে ঘরে ঢুকে দেখে হিন্দু- মুসলমান ঐক্যের আবেদনপত্রগুলিতে আগুন দিয়েছে অজয় । সেই আগুনে তাকে হিংস্র দেখায়)

অশোক : কি করছিস এসব ?

অজয় : তোমাদের ঐক্যের মড়া পোড়াচ্ছি ।

অশোক : অজু ভুল করছিস ।

অজয় :  দাদা রাখ তোমার কমিউনিজম । ওসব আমরা জানি ।

অশোক : কি জানিস ?

অজয় : জানি যে তোমরা দেশের শত্রু ।

অশোক : ফ্যাসিস্ট এজেন্টদের মতো কথা বলছিস । জানিস দাঙ্গা কেন হয় ? জানিস কি প্যালেস্টাইন আর আয়ার্ল্যান্ডের কথা ?

উনিশ.

(তন্ময় হয়ে লিখছে সোমেন । লেখাগুলো এবং সেই সঙ্গে সোমেনের কন্ঠস্বর ভেসে ওঠে  : সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম, ভারতীয়দের পারস্পরিক তিক্ততা আর শত্রুতা বন্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা আজ দেশপ্রেমিক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের কর্তব্য । শুধু মানবতার নিকট আবেদন এবং জনগণের মধ্যে স্বদেশপ্রেম জাগিয়ে তুলে, সাম্রাজ্যবাদ আর তার এজেন্টদের স্বরূপ উন্মোচন করেই এ কাজ করা যাবে না । জনগণের প্রাত্যহিক জীবন ও সংগ্রামের গৌরবময় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে)

কুড়ি.

(হকঘরের বাইরে ব্যানার—‘ বর্ধিতায়ন সভা—ঢাকা প্রগতি লেখক সংঘ’ । দেওয়ালের পোস্টারে লেখা :  হিটলার সোবিয়েত থেকে হাত ওঠাও , ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে একসাথে , দুনিয়ার মজদুর এক হও । মঞ্চে উঠলেন  রনেশ দাশগুপ্ত)

রণেশ ; এবার বক্তব্য রাখবেন আপনাদের প্রিয় লেখক সোমেন চন্দ ।

(করতালি । নানা মন্তব্য । মঞ্চে সোমেন)

সোমেন : বন্ধুগণ ১ গত ২২শে জুন হিটলার আক্রমণ করেছে সোবিয়েত রাশিয়া । এই আক্রমণ পৃথিবীর সামনে এনেছে নতুন বিপদ ।

(হিটলারবাহিনী ও লালফোজের নানা দৃশ্য ভেসে ওঠে)

সোমেন : চাষি মজুরের দল রাশিয়াব এক নতুন সভ্যতার ইমারত গঢ়ে তুলেছে দেখে গাত্রদাহ শুরু হয় ফ্যাসিস্টদের । হিটলার তাদেরই প্রতিনিধি । গতবছর পশ্চিম ইউরোপকে পদানত করে হিটলার বুঝেছিল সারা দুনিয়ায় জয়পতাকা ওড়াতে হলে ধ্বংস করতে হবে সোবিয়েতকে । দুনিয়ার মেহেনতি মানুষ সোবিয়েতের উপর এই আক্রমণ সহ্য করবে না । তাই আসুন বন্ধুগণ আমরা ঐক্যের প্রাচীর গড়ে তুলি । ……..

(করতালি । স্লোগান)

একুশ.

(নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রাজশাহির ফ্যাসিবিরোধী অনুষ্ঠানের খণ্ডচিত্র । সর্বত্র সোমেনের মুখচ্ছবি)

বাইশ.

(সোবিয়েত সুহৃদ সমিতির অফিস । দরজার সামনে কিরণশঙ্কর । উত্তেজিত । রণেশ এলেন)

কিরণ ; কালকের সভায় তো সিদ্ধান্ত নিলেন, কিন্তু আমাদের কান্ডারি কই ?

রণেশ ; কার কথা বলছ ?

কিরণ : সোমেনের কথা ।

রণেশ : ওর তো রাজশাহি যাবার কথা ।

কিরণ : তা জানি । কিন্তু গতকালই তো ফেরার কথা ।

রণেশ : তাই তো !

কিরণ : এদিকে দিনক্ষণ স্থির । কলকাতায় নেতাদের চিঠি পাঠানো হল ।

(দূরে সোমেনকে আসতে দেখা যায় । এদের মুখে হাসি ফোটে । সোমেন কাছে আসে)

সোমেন : কি ব্যাপার এত উত্তেজিত কেন ?

কিরণ : ঢাকায় ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ।

সোমেন : চমৎকার ।

রণেশ ; তোমার উপর বিরাট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ।

সোমেন : কি রকম ?

কিরণ : বিরাট মিছিল আনতে হবে ।

সোমেন : নিশ্চয় আনবো ।

তেইশ.

(ঢাকার সূত্রাপুর ।ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের মঞ্চ । ব্যস্ততা। এককোণে রণেশ ও এক যুবক)

যুবক : সবাই এসে গেছেন ?

রণেশ : মোটামুটি । জ্যোতি বসু, বঙ্কিম মুখার্জী…

(এক স্বেচ্ছাসেবক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে এবং রণেশকে বলে)

স্বেচ্ছাসেবক :  সরলানন্দ আপনাকে তাড়াতাড়ি ডাকছে ।

রণেশ : সে কোথায় ?

স্বেচ্ছাসেবক :  মঞ্চের পাশে টিকিট ঘরে ।

(রণেশ দ্রুতপায়ে সরলানন্দের কাছে এলেন)

রণেশ : কি ব্যাপার সরলা ?

সরলা : একটা গোলমালের আশঙ্কা করছি ।

রণেশ : কেন ?

সরলা : একটিই লোক বারে বারে এসে টিকিট নিয়ে যাচ্ছে।

রণেশ ; চেনো তাকে ?

সরলা : না, আমাদের কেউ নয় ।

(আর এক যুবক ব্যস্ত হয়ে ছুটে আসে)

যুবক : উপরে কয়েকজন জড়ো হয়েছে ।

রণেশ : সংখ্যা ?

যুবক : ৩০-৩৫এর মতো ।

রণেশ : হাতে কিছু আছে ?

যুবক : হকিস্টিক, লোহার ডান্ডা ।

(কিরণশঙ্কর  ছুটে এলেন)

কিরণ : সভা শুরু করব রণেশদা ?

যুবক : কিন্তু…

রণেশ : হ্যাঁ শুরু করো সভা ।

(রণেশ যুবকদের কি নির্দেশ দিলেন। তারা চলে গেল । সরলা আর রণেশ কথা বলতে লাগলেন)

চব্বিশ.

(সম্মেলনের মঞ্চ । জ্যোতি বসু বসে আছেন । বঙ্কিম মুখার্জী উঠে দাঁড়ালেন বক্তৃতা দেবার জন্য)

পঁচিশ.

(রেলওয়ে ইউনিয়নের অফিস । কয়েকজন শ্রমিক ও সোমেন । সমীন্দ্র হোড় এর প্রবেশ)

সমীন্দ্র ; মিচিল চলে গেল যে !

সোমেন : জানি ।

সমীন্দ্র ; তুমি বসে কেন ?

সোমেন : কয়েকজন আসবে  । এলেই দৌড়াব । ধরে ফেলব মিছিল ।

সমীন্দ্র :  আমি যাচ্ছি ।  দেরি কোরো না ।

ছাব্বিশ.

(ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনের মঞ্চ । সরলানন্দ গেটের কাছে। একজন দৌড়ে এসে কি বলল তার কানে কানে । মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল । টলতে টলতে কোনোরকমে এল মঞ্চের কাছে । ডাকল রণেশকে । সরলার কথা শুনে হতচকিত রণেশ । তারপর কোনোরকমে নিজেকে সামলে উঠে এল মঞ্চে)

রণেশ : বন্ধুগণ ! এইমাত্র খবর এল- কি ভয়ঙ্কর খবর- আমাদের সোমেন আর নেই । সম্মেলনের দিকে আসছিল সে মিছিল নিয়ে । পথে তাকে ঘিরে ধরে ফ্যাসিস্ট গুন্ডারা । নির্মমভাবে খুন করে।

(সভায় তীব্র উত্তেজনা । কান্না)

সাতাশ.

(ভেসে ওঠে সোমেনের মুখ)

(শেষ)

(দিলীপ মজুমদার: কলকাতায় বসবাসরত লেখক। সত্যবাণীর কন্ট্রিবিউটিং কলামিষ্ট)

 

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *