শুভ ১৪২৬: ঐতিহ্যে উজ্জ্বল বাঙালীর অসাম্প্রদায়িক উৎসব পহেলা বৈশাখ


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

8A3D8FAF-CB3A-4CC0-96FE-58B9BCE2C5D4 

নিলুফা ইয়াসমীন হাসান

 

প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রবাহিত হয় সময়, বদলে যায় বর্ষপঞ্জির পাতা। নতুন বছর এসে দাঁড়ায় দোর গোড়ায়। এসেছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৬। প্রাণের হিল্লোল, আবেগ, ঐতিহ্যে উজ্জ্বল বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। হতাশা, অবসাদ, গ্লানি ও অপ্রাপ্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন উদ্দীপনায় জাগরণের ডাক দেয় নববর্ষের প্রথম দিন – পহেলা বৈশাখ। তাইতো বিশ্বকবি বলেছেন-
”এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে মূমূর্ষরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পূরাতন স্মৃতি, যাক-ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্্রু বাষ্প সুদূরে মিলাক॥
ঘুচে যাক গ্লানি, ঘুচে-যাক জ্বরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।”
তাপস নিশ্বাস বায়ে মূমূর্ষকে উড়িয়ে দেয়ার মাহেন্দক্ষণ, বছরের আবর্জনা দূর করে নতুন উদ্যমে আত্ম শক্তিতে বলীয়ান হয়ে প্রগতির পথে সামনে এগোনোর অঙ্গীকারে উদ্দীপিত হয় নববর্ষ। সঙ্কট, কুপমন্ডূকতা, দৈন্য, অজ্ঞতা, কুসংস্কার, হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস, হানাহানি, সাম্প্রদায়িকতা দূর করে অগ্নিস্নানে শুচি হওয়ার দীক্ষা ও প্রেরণা দেয় বাংলা নববর্ষ।
বছরের সবকটি দিনের মধ্যে একটি বা দুটি দিন বিশেষ মর্যাদা পায়, সেগুলো যেন চির পুরাতনের মধ্যে নতুন করে দেখা দেয়। এরকম একটি দিন হচ্ছে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বর্তমানে পহেলা বৈশাখের উৎসব একটি জাতীয় উৎসব। পহেলা বৈশাখের উৎসবের অঙ্গীকার হচ্ছে আমাদের জীবন বোধের অঙ্গীকার।
প্রবাসেও বাদ যায় না বৈশাখের আনন্দ। পূর্ব লন্ডনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদের ব্যানারে নারী চেতনার কর্ণধার নাজনিন সুলতানা শিখার উদ্যোগে ও টি এম কায়সারের পরিচালনায় শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী বৈশাখী উৎসব। ১২ এপ্রিল রিচ মিক্স সেন্টারে উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। আজ ১৩ এপ্রিল পূর্ব লন্ডনের কবি নজরুল সেন্টারে বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তিতে আয়েজন করা হয় কবিতা ও সঙ্গীত সন্ধ্যা, ১৪ এপ্রিল পপলার ইউনিয়ন পালিত হবে পহেলা বৈশাখ । অপরদিকে সাউদার্ন গ্রব কমিউনিটি সেন্টারে ১৪ এপ্রিল বৈশাখের প্রথম দিনে সম্মিলিত বাংলা নববর্ষ উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন পালন করছে বর্ষবরনের নানা উৎসব। ব্যক্তিগত উদ্যোগেও চলছে বর্ষবরণ আয়োজন। তবে প্রবাসে পহেলা বৈশাখে নববর্ষকে সীমিত পরিসরে পালন করলেও প্রতি বছর জুন মাসে বাংলা টাউনের বৈশাখী মেলায় প্রকাশ ঘটে প্রাণের স্পন্দন। সেদিন বাংলা টাউন হয়ে উঠে হাজারো বাঙালীর মিলন মেলা। বৈশাখের উৎসবে নিয়ে আসে ভিন্ন এক ব্যঞ্জনা। বৈশাখী ঝড়ের মতই এই দিনটি সব মালিন্য দূর করে আমাদের অস্তিত্বে ঝাকুনি দিয়ে মনে করিয়ে দেয় কোথায় প্রোথিত আছে আমাদের শিকড়।

 EC18F4FF-DD85-40DB-ACC1-CFBE32D568D1ষড় ঋতু
এই উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশেই বোধহয় ছয়টি ঋতু আছে – গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। ইউরোপের দেশগুলোতে চারটি ঋতু । বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু দু’টি করে মাস গণনা করা হয়। বৈশাখ+জৈষ্ঠ্য=গ্রীষ্মকাল, আষাঢ়+শ্রাবণ=বর্ষাকাল, ভাদ্র+আশ্বিণ=শরৎকাল, কার্তিক+অগ্রহায়ণ=হেমন্তকাল, পৌষ+মাঘ=শীতকাল, ফাল্গুন+চৈত্র=বসন্তকাল। কিন্তু শরৎ এবং হেমন্ত এই দুটি ঋতু চার মাস থাকেনা। শরৎ যখন হেমন্তকে পথ ছেড়ে দেয় তখন পূর্ণ দু‘মাস হয়না। বসন্তকাল সবচেয়ে কম স্থায়ী। বসন্তের পাখি কোকিল যখন ডাক দেয় তখন জানা যায় বসন্ত এসেছে। ষড়ঋতুর মধ্যে গ্রীষ্ম হলো পুরুষ, গ্রীষ্মের দাপটে বর্ষা কেঁদে ফেলে, বর্ষার অভিমান ভাঙ্গাতে শরৎ আসে কাশফুলের উপহার নিয়ে আর হেমন্ত আনে শিশিরের গহনা। শীত ঢেকে দেয় কুয়াশার আঁচল। ক্ষণবসন্ত দখিনা বাতাসে ফুঁ মেরে উড়িয়ে দেয় সেই আঁচল। ঋতুরাজ গ্রীষ্ম জ্বলন্ত সন্ন্যাসীর মতো ফিরে আসে পদব্রজ শেষ করে। আর রবীন্দ্রনাথ ’বর্ষ শেষ’ কবিতায় বৈশাখের মনোমুগ্ধকর রূপটি তুলে ধরেন – ’হে নতুন এসো তুমি সম্পূর্ণ গগন পূর্ণ করি পুঞ্জ পুঞ্জ রূপে/ ব্যপ্ত করি লুপ্ত করি স্তরে স্তরে স্তবকে স্তবকে ঘনঘোর স্তূপে।’
যে বৃষ্টির অবিরাম বর্ষণ মানুষের বিরক্তি, সে-ই ধরণীকে অমল বর্ষণে করে শস্যশালিনী। খরাদগ্ধ চৈত্রের চৌচির মৃত্তিকা যেন খুঁজে পায় বৈশাখের গুরু গুরু মেঘের হৃদয় ছেঁড়া অমল বর্ষণ। চৌচির মাটিকে বৃষ্টি পলিময় করে তোলে শষ্যে যেন ভরে উঠে কৃষকের শূন্য আঙ্গিনা প্রান্তর। এ ঋতুচক্রের আবর্তেই সুখ-দুঃখের চক্রাকারে ফিরে ফিরে আসাকে মেনে নিয়েই নিরাশাবাদী হতে পারিনা আমরা। এজন্যই কবির সাথে সাথে আমরাও আশাবাদী ও স্বাপ্নিক।
বৈশাখ এই আশা ও স্বপ্নকে জন্ম দেয় নবজীবনের দ্বারোদ্ঘাটন করে। তাইতো প্রান্তিক কৃষক নববর্ষে সেই পুরোনো প্রার্থণাটুকু আবার করে – আগামী বছর যেন ভালো যায়। নিত্য দুঃখের তরঙ্গসঙ্কুল জীবননদী পাড়ি দেবার জন্য বোধকরি স্বপ্নই একমাত্র ভেলা। এ স্বপ্ন একটি সুন্দর বছরের, যা অতীতের অপ্রাপ্তি আর ব্যর্থতাকে অতিক্রমে সম্ভাবনাময় উজ্জ্বলতর হবে।

বহু প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নববর্ষ উদযাপিত হয় সাড়ম্বরে। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দেও মেসোপটেমিয়ায় নববর্ষ পালিত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জুলিয়াস সীজারের সময় থেকে ইউরোপে নববর্ষ পালিত হচ্ছে জানুয়ারী মাসে। চীন ও জাপানেও নববর্ষ পালনের রীতি প্রচলিত আছে প্রাচীনকাল থেকেই। ইরানের নওরোজ (নববর্ষ) শুধু খুশিরই দিন ছিলনা, এদিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তরুণ সমাজের কাছে। এ দিন তরুণ-তরুণীরা বেছে নিত যার যার জীবন সঙ্গী।

92E0C116-4C63-4DEA-BDDD-272A1A635207জ্ঞান-বিজ্ঞানের যখন এত প্রসার ঘটেনি, যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই মন্থর গতির, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ নিজস্ব দিন-মাস বছর গোনার পদ্ধতি তৈরি করেছিল। প্রাচীনকালে যাদের জ্ঞানচর্চার অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, যাদের অর্থনীতি ছিল ক্রমবর্ধিষ্ণ, তারাই প্রয়োজনের তাগিদে দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং রাজকার্যের সুবিধার জন্য তৈরি করেছিল পঞ্জিকা।

গৌরবময় ইতিহাস
বৈশাখ হচ্ছে বাংলা বছর গণনায় বছরের প্রথম মাস। বাংলা সাল তথা বঙ্গাব্দ প্রচলনের আছে গৌরবময় ইতিহাস। বাংলা সনকে কেউ বলেন ফসলী সন বা এলাহী সন, কেউ বলেন বঙ্গাব্ধ। মোগল স¤্রাট মহামতি আকবরের শাসনামলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাংলা সন। সে সময় মোগল সা¤্রাজ্যে প্রচলন ছিল বিভিন্ন সনের। যেমন – লক্ষ্মণাব্দ, বিক্রমাব্দ, শালিবাহন সন, জালালি সন, সেকান্দর সন, শকাব্দ, গুপ্তাব্দ প্রভৃতি। এই সঙ্কট নিরসনে স¤্রাট আকবর সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। রাজস্বমন্ত্রী আবুল ফজলের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ফসলি সন প্রবর্তনের দায়িত্ব অর্পন করেন রাজসভাষদ আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর ওপর। হিজরী সনের হিসাব ধরে আগে খাজনা আদায় হতো। যেহেতু সেকালে কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় খাজনা আদায়ের সঙ্গে কৃষকের ফসলের সংযোগ ছিল, তাই কররূপা দেয় ফসলের অংশ ’ফসলী খাজনা’ হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু হিজরী সনের সঙ্গে ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে ১২ দিনের একটি গোলমাল প্রতি বছরই খাজনা আদায় করতে গিয়ে বিবাদ লেগেই থাকতো। তাই সম্রাট আকবর হিজরী সন থেকে ১২ দিন ছেঁটে যে বৎসর গণনা শুরু করেন, তাই কালক্রমে ফসলী সন বা বঙ্গাব্দ হিসেবে খ্যাত হয়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২১ এপ্রিল থেকে বাংলা সাল গণনা শুরু হয়, হিজরীতে তখন চলছে ৯৬৩ সাল।
৯৬৩ হিজরীতে যখন বাংলা সন শুরু করা হয়, তখন হিজরী সনের প্রথম মাস ’মহরম’ বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে পহেলা বৈশাখই বাংলা নববর্ষের শুরু হিসাবে পরিচিতি হয়। বাংলাদেশে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের শাসনামল থেকে ১৪ এপ্রিলই পহেলা বৈশাখ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে কিন্তু কলকাতায় আগের নিয়মে চলছে পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশেও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে আগের পঞ্জিকার নিয়মেই পালন করে থাকে।

বারো মাসের নামকরণ
বারো রাশির প্রথম রাশি ’মেষ’। মেষরাশির পূর্ণলোকিত নক্ষত্র বিশাখা। এ বিশাখা থেকে বাংলার প্রথম মাস বৈশাখ। নক্ষত্রিক নিয়মে বাংলা সনের মাসগুলোর নাম। যেমন জ্যৈষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়ি থেকে আষাঢ়, শ্রাবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা থেকে ভাদ্র, আশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রহায়ণা থেকে অগ্রহায়ণ, পৌষা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাগুনী থেকে ফাগুন, চিত্রা থেকে চৈত্র।

সপ্তাহের নাম
সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রতিটি দিনের জন্য পৃথক পৃথক নাম ছিল। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এ জটিল প্রথা পরিহার করে সপ্তাহের সাতদিনে সাতটি নাম নির্ধারণ করেন। বর্তমানে ব্যবহৃত এ সাতটি নামের সাথে রোমান সাপ্তাহিক নামগুলোর সাদৃশ্য সহজেই অনুমেয়। কথিত আছে বাদশা শাহজাহানের দরবারে আগত কোন ইউরোপীয় (সম্ভবত পর্তুগীজ) মনীষীর পরামর্শক্রমে মূলত গ্রহপুঞ্জ থেকে উদ্ভুত নামগুলোর প্রচলন হয়। ’সান’ বা সূর্য্য থেকে রবি। ’মুন’ অর্থাৎ চাঁদ থেকে সোম। ’মার্স’ বা মঙ্গল গ্রহ থেকে মঙ্গল। ’মারকারি’ বা বুধগ্রহ থেকে বুধ। ’জুপিটার’ বা বৃহস্পতি গ্রহ থেকে বৃহস্পতি। ’ভেনাস’ থেকে শুক্র। ’স্টার্ণ’ বা শনি গ্রহ থেকে শনিবার।

বৈশাখকে ঘিরে উৎসব
বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের গুরুত্ব নিঃশোষিত হয়ে যায়নি আমাদের সমাজ জীবনে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাস করে গ্রামে। এই জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ অংশ কৃষক। কৃষির সাথে নিবিড় সংযোগ আছে বাংলা সনের। কৃষকের ফসল বোনা ও ঘরে ফসল তোলা হয় বাংলা মাসের হিসাবে। ঘরে ফসল তোলা হলে কৃষক মেতে ওঠে আনন্দ উৎসবে। ঘরে ঘরে অনুষ্ঠিত হয় নবান্ন উৎসব।
হালখাতা ঃ বৈশাখকে ঘিরে অনুষ্ঠিত হয় নানা রকম উৎসব আনন্দের। ’হালখাতা’ উৎসব এ ধরনেরই একটি উৎসব। হালখাতা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা। সারাবছর মহাজনরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সাথে ব্যবসা বাণিজ্য করে, এতে অনেক টাকা বকেয়া পড়ে। হালখাতা উপলক্ষ্যে বকেয়া টাকাগুলো শোধ করে দিয়ে খাতায় নতুনভাবে নাম লেখাতে হয়। সেদিন ক্রেতাদের মিষ্টি খাওয়ানোর আয়োজন করা হয়।
মেলা ঃ নগর জীবনের যান্ত্রিকতার মাঝেও বৈশাখী মেলা স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের পরিচয়। নতুন বছর আগমনের বেশ কিছু সময় আগ থেকেই গ্রাম বাংলায় শুরু হয় উৎসবের পালা। দোল, অষ্টমী, নবমী, বারণী, চৈত্র সংক্রান্তির মেলা, চরকপূজার ধারাবাহিক উৎসবের মাঝেই এসে পড়ে নববর্ষ। চৈত্রের শেষ দিনটিতে হয় চৈত্র সংক্রান্তির উৎসব। গ্রাম-গঞ্জে বসে মেলা। হিন্দু ধর্মাবলাম্বীরা চৈত্রসংক্রান্তির দিন চরক পূজা করে।
বাঙালি জাতির নিজ ঐতিহ্যের মধ্যে গ্রামীণ মেলা অন্যতম। এসব গ্রামীণ মেলার উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন কাহিনী বিদ্যমান। প্রাচীন বাংলার নৌ-বন্দরগুলোতে কৃষিজ পণের সমারোহ এবং বিনিময় পর্যায় থেকে এ মেলার উৎপত্তি ঘটে। পরবর্তীতে মানুষ তার জীবন-জীবিকার তাগিদে হস্তশিল্পজাত পণ্যের উৎপাদন, পণ্য বিনিময়ের জন্য মেলায় আসে। তবে জমিদারি আমলে খাজনা আদায়কে আনুষ্ঠানিক রূপ দেবার জন্য জমিদার এবং প্রজারা মিলে বিশেষ ঐতিহ্যের সাথে বৈশাখি মেলা পালন করতো।
গ্রামাঞ্চলের মেলায় শৌখিন দ্রব্যাদির তুলনায় নিত্য ব্যবহার্য সম্ভার থাকে বেশী। মেলা যে শুধু বেচাকেনার বাজার তাই নয়, সেখানে নানা রকমের আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা থাকে। এককালে গ্রামীণ মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিল লাঠি খেলা, হা-ডু-ডু, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই ইত্যাদি। মেলায় যাত্রা ও পালা গানের ব্যবস্থা থাকে। নানা ধরনের মিষ্টি, গুড়ের জিলাপী সন্দেশ, বাতাসা, মুড়ি-মুড়কি, গুড়-চিড়া-দই বিক্রি হয়।

মুখোশের ব্যবহার
কৃষিভিত্তিক সমাজে কৃষকেরা কর, খাজনা প্রভৃতি নিয়ে জমিদারদের দ্বারা নানাভাবে নিপীড়িত হতো। কর প্রথা বিলুপ্তির পর সমাজে মঙ্গলবিনাশী শত্রু দমনের উদ্দেশ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হতো। এই শোভাযাত্রায় নানারকম পশু পাখি ও বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রের উপস্থাপন করা হয়। যা সমাজের অসঙ্গতিসহ নানা দিক তুলে ধরে।

মঙ্গল শোভাযাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পহেলা বৈশাখে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয় তা এবার ৩০ বছরে পা দিল। মঙ্গল শোভাযাত্রাটি শুরু হয়েছিল ১৮৮৯ সালে।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি
২০১৬ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ‘ এর স্বীকৃতি মিলেছে মঙ্গল শোভাযাত্রার।

অসাম্প্রদায়িক উৎসব ঃ তৎকালীন পাকিস্তান আমলে যখন বাঙালীর ভাষা ও সংস্কৃতির উপর একের পর এক আঘাত হানতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী, তখন অনেকটা প্রতিবাদ হিসাবেই সংস্কৃতিমনা সচেতন বাঙালী নববর্ষ বরণের প্রস্তুতি নেয়। ১৯৬৭ থেকে আজ পর্যন্ত এ অনুষ্ঠান অব্যাহত আছে। আর এখন তো বাংলা নববর্ষ আমাদের জাতীয় উৎসব। এত উৎসবের ভিড়েও নববর্ষের স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে এটি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান মিলিত বাঙালী জাতির একান্ত নিজস্ব অসাম্প্রদায়িক উৎসব।
বাহুতে জড়ানো লাল পাড়ে সাদা শাড়ী, চুলের বেণীতে ঠাঁই নেয় বেলী ফুলের থোকা। কপালের মধ্যবিন্দুতে টুকটুকে লাল টিপ। কর্ণে রুপোর কুন্দন। হাতে লাল আর রূপালী রঙের চুড়ি পড়া বাঙালী নারী পহেলা বৈশাখের উৎসবে নিয়ে আসে ভিন্ন এক ব্যঞ্জনা। গ্রাম বাংলার নিত্যদিনের পান্তাভাত একটি দিনের জন্য হয়ে উঠে বেশ উপভোগ্য। কেউ কেউ হয়ে উঠেন একদিনের ব্যবসায়ী। ইলিশ-পান্তার পসরা নিয়ে বসে পড়েন। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে নগরীর বুটিক হাউসগুলোর থাকে বিচিত্র আয়োজন। পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শাড়ি, টি-শার্টে কারা কত বৈচিত্র আনতে পারে এ নিয়ে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। নববর্ষের আজকের যে রূপ, এর নেপথ্যে আছে ছায়ানট, উদিচীসহ বাঙালী সংস্কৃতির লালনকারী অসংখ্য সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। এক্ষেত্রে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উদ্যোগ ও ভালবাসা অনুষ্ঠানকে করে আরো উজ্জ্বল।
তবে আমাদের জীবনে আনন্দের উৎসগুলো ক্রমশঃ সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। প্রায় আঠার বছর আগে রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় অনেক তাজা প্রাণ ঝরেছে, তা আজো আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।

বাংলা ১৪২৬ সালের প্রত্যাশা – নতুন এই বছরটি সুন্দর হোক, শুভ হোক, সবার জন্য হোক আনন্দময় ও কল্যাণকর।

লেখক: সত্যবাণীর বার্তা সম্পাদক

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *