হৃদয়ের গহীন থেকে


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

তোফায়েল বাসিত তপু                                 অতিথি লেখক, সত্যবাণী

তোফায়েল বাসিত তপু। একসময় সিলেটের ছাত্ররাজনীতি  ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ। কবিতা গান অংকন শিল্প থেকে শুরু করে সবগুলো মাধ্যমে দখ্ল ছিলো তার। পাশাপাশি ছিলো আলোচনা সমালোচনা সিলেট জুড়ে। রাজনীতিতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনার বিস্তর অভিযোগ ছিলো তার বিরুদ্ধে। মামলা, কারাগার, আদালত এগুলো ছিলো তাঁর নিত্যদিনের সাথি। বর্তমানে বেশ কয়েক বছর ধরে বসবাস করছেন ব্রিটেনে। তাঁর অন্তরের ভেতরে সদা জাগ্রত মানুষটির ভাবের প্রকাশ  ‘হৃদয়ের গহীন থেকে’। লেখাটি সত্যবাণী পাঠকদের জন্য…।

স্বভাবত আমি একজন অগোছালো মানুষ। পারিবারিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বা পেশা ক্ষেত্রে খুব একটা পরিকল্পনা করে কিছু করিনা। কারন আমি জানি পরিকল্পনা করে কোন কাজ হয়না। ধর্য্য নিয়ে যখন যা করার ইচ্ছে, করে ফেলি। হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া আমার ছোট বেলা থেকে অভ্যাস, তবে সিদ্ধান্ত নিয়ে যে কাজই করতে চাই, ১০০% করার চেষ্টা করি। কোন সময় ব্যর্থ হলে এটিকে কোন এক সময় পাঁচ বছরের এক এতিম শিশুর আমাকে দেয়া অভিশাপ হিসেবেই দেখি।
অবশ্য ইদানিং নিজেকে একটা নিয়মের ভিতর আনার চেষ্টা করছি। তিন চার মাস থেকে খেয়াল করছি আমি মোটামুটি সফল। তবে এই সফলতার পেছনের কৃতিত্বটা আমারই পাওনা, তাই প্রতি সপ্তাহে একটা এওয়ার্ড বা
ট্রিট দেই নিজেকেই নিজে।

নিয়ম মোতাবেক পাঁচদিন কাজ করি রাতভর, তারপর নিরালা নিঝুম অন্ধকার। আমি, টিভি ও বিছানা।
রবিবার পরিবারের সাথে, সোমবার সামাজিক অর্থাৎ বন্ধুবান্ধব +সভা। কিন্তু রবিবারের সন্ধ্যা একান্ত আমার, এখানে কাউকে আমি অংশিদার করিনা আমার অতীত ছাড়া। অনেকেই মনে করেন নিঃসঙ্গতায় সময় কাটানো কঠিন। কিন্তু ইদানিং আমার কাছে সেটাই স্বর্গীয়,,,,,,,,,,,,,,,,,,।
IMG_3226কারন, রবিবারের সন্ধ্যা, এই সময়টি আমি একা একা হাটি। আমার ফোন বন্ধ থাকে, আমি আমার দুনিয়ায় চলে যাই। এমন সব রাস্তা দিয়ে এসময় চলি, যেন আমাকে কেউ চিনতে না পারে। একটা ফানটার ড্রিংকস হাতে নিয়ে হাটতে হাটতে কল্পনায় চলে যাই অনেক দুরে। এই কল্পনায়  একেক দিন থাকে আমার একেকটা সোনালী অতীত।যেমন, প্রথম যখন প্রাইমারি স্কুলে গিয়েছিলাম সেই একমাস কেমন ছিলো? কিংবা প্রথম প্রেম কিভাবে হয়েছিলো, বা স্কুলের হাফটাইমে বাসায় এসে শুধু ভাত রেডি, তরকারির বিলম্ব দেখে আবার স্কুলের পথে ফুটবল খেলার আশায় ছুটে চলার চেষ্টা। কিন্তু আম্মার বাধায় গরম ভাতে সামান্য শরসে তেল আর লবন মেখে দু’মুটো খাবার খেতে বাধ্য হওয়া। এখন বুঝি কি অকল্পনীয় স্বাদ ছিলো সেই দু’মুটো খাবারে, যে স্বাদ আজ অবদি কোন খাবারে পাইনি।  বৃষ্টির বিকালে দু’ঘন্টা ধরে ফুটবল খেলে আবারও মহল্লার পুকুরে এসে দু’ঘন্টার জল খেলা, কিংবা স্কুল শেষ করে বাসায় এসে আরবী শিক্ষক এর কাছে না বসার হাজারো ছলচাতুরি, খেলতে যাওয়ার জন্য আপাকে নানান আকুতি, কিংবা রাজনীতিতে প্রথম মিছিল, প্রথম নেতৃত্ব, প্রথম বিদ্রোহ, প্রথম প্রতিবাদ। নাটকে, কবিতায়, কৌতুকে প্রথম পুরস্কার, কিংবা ঢাকায় বইমেলায় টি এস সিতে প্রথম একা একা ঘুরে বেড়ানো, স্বৈরচার বিরোধী পথ নাটক দেখা, ইত্যাদি। সেসব ফেলে আসা স্মৃতিতে ফিরে যাওয়াই হলো আমার রবিবারের কল্পনার রাজ্যের অংশ।

আগের অনেক কষ্টের স্মৃতিও এখন সুখের মনে হয়।পাড়ায় কাউকে জ্বালাতন করার জন্য ভাইয়ের হাতে বেল্টের বাড়ী খেয়েছিলাম পুরো একঘন্টা, সেই অনুভুতিও এখন আমার কল্পনা রাজ্যের সম্পদ। এলাকার অনেককে যত কষ্ট দিয়েছি, বিপরিতে তাদের কাছ থেকে ভালবাসা পেয়েছি অনেক বেশি, এটিও এখন বুঝতে পারি। চান্দু ভাইয়ের চায়ের টংগে বসে চুরি করে খিছুড়ী খাওয়া, নালার পাশে পশ্রাব করা অবস্থায় রিক্সা ড্রাইভারদের জ্বালাতন করা, দিনে এলাকাবাসির একশ একটা নালিশ এর কারনে আম্মা ও ভাইজানের কাছ থেকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি, এই সময়গুলো রবিবারের আমার একান্ত সময়ে বারবার হানা দিতে থাকে মনের গহীনে।

অনেক সময় আগের দিন থেকে ঠিক করে রাখি কাল সন্ধায় এক ঘন্টা কাদের স্মৃতি নিয়ে কাঠাবো। এলাকার বার্ষিক প্রতিযোগিতা, নাকি বার্ষিক পিকনিক, নাকি রমজানের ডাব চুরি কিংবা নানির বাসার ইক্ষু চুরির কাহানি। সারা রাত ঘুরে রিক্সার ড্রাইভারকে আসি বলে না আসা কিংবা এলাকার মসজিদের ২নং মিয়াসাব কে বিয়ে দেবো বলে দুলাল কে কন্যা সাজিয়ে উনার কাছ থেকে টাকা নেয়া, ঠিলায় ঠিলায় অনিদ্রায় রাত জাগা, বৃষ্টির রাতে একচিলতে বারান্দায় অপেক্ষায় থাকা, আমার এই সোনালি অতীত থেকেই কোন একটিতে ফিরে যাওয়ার প্লান করে রাখি আগের দিনই।
ইদানিং দেশের প্রতি ভালবাসাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে মনে হয়, কিন্ত এটাই বাস্তব। প্রথম ব্যান্ড এর রিহার্সাল সাপ্লাই ক্লাবে পুলিশের রেইড, গিটার রেখে দৌড়ানো, তারপরও চালিয়ে যাওয়া দুর্দান্ত জীবনের গতিময় কমিটমেন্ট, এগুলো কি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়?
আজও মনে পড়ে গেইটের নুর ইসলাম ভাই, শহিদুল্লা ভাই, লালচান্দ, দুলাল, তোতা, ডানো, মখলিছ, এখলাস, আজিজ বা সেই বন্ধুদের, যারা একদিন চোখ দেখে বলে দিতে পারতো আমার চাহিদা। মৃত্যুকে উপেক্ষা করত তারা আমার খুশির জন্য। গোয়াইপাড়া, চৌকিদেখী, ঈদগাহ, কাজিটুলা ও কুমারপাড়াবাসি যারা সবকিছু দিয়েও আমাকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, তাদের কথা কি ভুলা যায়? আম্মার পাঠানো জাসুশ লিটন, আমাদের ঘরের কাজের ছেলে। যার কাজ ছিলো দুর থেকে দাড়িয়ে আমাকে দেখা, আমি কি করছি ঘন্টায় ঘন্টায় আম্মাকে তা রিপোর্ট করা। ইদানিং খুব বেশী তাকেও ফিল করি।

ছোট বেলায় প্রিয় আরেকটা শখ ছিলো চারাদিঘির পারের খালাম্মার বাসায় রাত কাটানো। প্রাইমারি স্কুল থেকে বাবুর সাথে (খালাতো ভাই, তালতো ভাই এবং বর্তমানে ছোট বোনের স্বামি) আমি পিঠাপিঠি বড় হয়েছি। সহজ সরল কোমল বাল্যকালের সাথি বন্ধু। এক বিছানায় শুয়ে শুয়ে কল্পনা করতাম সিলেটের ব্যাডমিন্টনের বেষ্ট জুটি হওয়ার। একদিন নাস্তার টেবিলে মামা (বাবুর আব্বা) বলেই ফেললেন আমাদের, ‘দুইটারে দেখ, মাসাল্লাহ যেন একটা দুধের তৈরী, আরেকটা হলুদের’।
সেই স্বর্নালী ছোট ছোট স্মৃতি নিয়ে রবিবার এক ঘন্টা কাটে আমার আমিত্বে। আমার হাটার গন্ডিটা অনেকটা গোলকারের মতো। বাসা থেকে বাম পাশ দিয়ে হাটা শুরু করলে ডান পাশ থেকে এসে শেষ হয়। মাঝে মাঝে দু একটা গলি ছাড়া প্রায় সমান রাস্তা। আসল কথা হলো, এক ঘন্টায় পার্কের পাশের শিয়াল এর প্রেম ছাড়া আরেকটা বিষয় নজর কাড়ে। সেটা হলো, দোকানের বারান্দা কিংবা বিল্ডিং এর ছিপায় গৃহহীন বৃদ্ধদের পড়ে থাকা। এগুলো অবশ্য মাঝে মাঝে স্মৃতি হাতরানোতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটায়। অনেক সময় ইচ্ছে করে তাদের পাশে বসে তাদের ছোটবেলা, কৈশোর, যৌবন নিয়ে কথা বলি। তাদেরও তো একদিন বাল্যকাল ছিলো, ছিলো কৈশোর, যৌবন। প্রেমিকা ছিলো, প্রেম ছিলো, ভালোবাসা ছিলো, সোনালী অতীত ছিলো, ছিলো হাস্যজ্জল পরিবারও তাদের। এদের মধ্যে একজন আছেন, তার প্রতি আমার কৌতুহলটা একটু বেশী। বয়স ৮০/৯০ এর কোঠায় হবে। চার্চের বারান্দায় থাকেন, মাথার কাছে কোন শপিং মলের বাইরে থেকে আনা ট্রলি। তাতে ভর্তি আবর্জনা (আমার দৃষ্টিতে)। কিন্তু ট্রলিটি বড় একটা শিকল দিয়ে বাধা এবং শিকলের তালাটা তার বালিশ নামক বস্তুটার নীচে সযত্নে রাখা। আমার খুব ইচ্ছে হলো উঁকি মেরে দেখি ট্রলির ভিতরে কি? কৌতুহলবসত যা দেখলাম তা হলো কয়েকটা পুরনো কাপড়, ফটো এলবাম, পুরনো ব্যাগ, মেডেল, বাচ্চাদের জুতো, কাঠের খেলনা, হেংগার, কাপ, বুক, কয়েকটা চাবি ও টুকটাক আরো অনেক কিছু।
সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিলো চমৎকার। লন্ডনের স্যাতস্যাতে হাড় কাপানো শীত ছিলোনা। পুরোপুরি দেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। আচমকা আমার মনে হলো ঐ বৃদ্ধের সাথে আমার অনেক মিল।  উনি তার অমূল্য স্মৃতি ট্রলিতে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যেমন এলবামে রয়েছে তার বাল্যকাল, পরিবারের স্মৃতি। হয়ত তার প্রথম স্কুল সার্টিফিকেট, কলেজের প্রথম মেডেল, তার ছেলের প্রথম জামা, প্রেমিকার গিফট দেয়া তার সার্ট, চাকুরিতে পাওয়া তার জীবনের প্রথম চেক, কলেজের প্রথম মেডেল ,আরও অজানা অনেক মধুর স্মৃতি ট্রলিতে নিয়ে সময় কাটিয়ে যাচ্ছেন তিনি আমার মতই। উনি ও আমি আমাদের জীবনের সোনালী স্মৃতিগুলো নিয়েই এখনও বেঁচে আছি। এখানেই তার সাথে আমার মিল। উনি প্রতি সন্ধ্যায় বসে ট্রলি থেকে খুঁটে খুঁটে তার সোনালী স্মৃতিগুলোকে ঝেড়ে মুছে আবার নতুন করেন। আর আমি প্রতি রবিবার সপ্তাহে একবার হাটতে হাটতে স্মৃতির দরজা খুলে দেই। রবিবারের এই এক ঘন্টা আমি বেশ আরামেই থাকি।
এতো বছর পর নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি। একঘন্টা নিরিবিলি হাটি অতীত নিয়ে।
তবে আপাতত সুন্দর ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তা এখনও নেই। হয়ত শুরু হবে কোন একদিন…..।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *