সংহতি সাহিত্য পরিষদের ৩০ বছর পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী

লন্ডন: বিলেতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন সংহতি সাহিত্য পরিষদ পার করেছে গৌরবের ৩০ বছর। ২৮ এপ্রিল সোমবার এ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ণাঢ্য ৩০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি ও লেখক শামীম আজাদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি ও লেখক কাদের মাহমুদ, সাংবাদিক ইসহাক কাজল এবং সংগঠক ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব রহমান জিলানী। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিলেতের কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য অনুরাগীদের ছিল সপ্রাণ উপস্থিতি ।

বক্তারা বলেছেন, বিলেতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বর্তমানে আলো ছড়ালেও সত্তর ও আশির দশকে এমনটি ছিল না। অনেক বৈরী পরিবেশের মধ্য দিয়েই বাঙালিরা এখানে তাদের সময় পার করেছেন। ত্রিশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সংহতি, লন্ডনে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি শুরুতে যেমন বর্ণবাদ বিরোধিতাসহ কমিউনিটির নানা আন্দোলনে যুগপথ কাজ করেছে, ঠিক তেমনি এর ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান, যা খুব প্রসংশনীয়। সংহতি কবিতা উৎসবসহ সাহিত্য ও সংস্কৃতির শাখাগুলোতে তাদের ধারাবাহিক কাজগুলো অনুকরণীয়।

সংহতি বিলেতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে উল্লেখ করে প্রধান অতিথি কবি ও লেখক শামীম আজাদ বলেন,  অনেক সময় কথায় ও কাজের সমন্ধয়হীনতা দেখা গেলেও সংহতির সাংগঠনিক কাজের ধারাবাহিকতা প্রসংশনীয়। সংহতি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখাতে কাজ করছে এবং বিলেতে লেখক -পাঠকদের কাছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কাজগুলোও অনেক প্রসংসার দাবী রাখে।

90C2BC08-A049-4198-902F-01305E9506C3শামীম আজাদ- সংহতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ফারুক আহমেদ রনি, সাধারণ সম্পাদক ছড়াকার আবু তাহেরসহ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল কর্মকর্তাদের অভিনন্দন, শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন- ত্রিশবছর ধরে ধারাবাহিক ভাবে একটি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যাওয়া সংশ্লিষ্টদের যোগ্যতা ও আন্তরিকতার প্রকাশ।

লেখক ,অনুবাদক কাদের মাহমুদ লেখক ও পাঠকদের সম্পর্ক অটুট রাখতে অনলাইন লেখক আর্কাইভ তৈরীর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেন- বিলেতে অনেক ভালো লেখক আছেন এবং প্রতি বছর বিলেতের লেখকদের প্রচুর বই প্রকাশিত হয়। কিন্তু দূ:খজনক হলেও সত্যি , এখানে একটিও বাঙালি বই এর দোকান নেই। অতীতে যে দু একটি ছিল, সব বন্ধ হয়ে গেছে। সংহতি সহ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় জড়িতদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্ববান জানান তিনি। সংহতির সাথে তার হার্দিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে কাদের মাহমুদ বলেন-সংহতির মৌলিক ও সৃজনশীল নানা কাজে আমি আন্তরিক ভাবে জড়িত আছি এবং এটা অটুট থাকবে।

সংহতি গ্রন্থমেলা’র মাধ্যমে বিলেতে লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধন তৈরীতে সংহতি অনন্য ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন লেখক, সাংবাদিক ইসহাক কাজল। বিলেতের লেখক ও পাঠকের সাথে একটি যোগসূত্র তৈরী করতে সংহতি সফল হয়েছে। লেখক ইসহাক কাজল বিলেতে বাংলাভাষী বই পাঠ ও সংরক্ষণের জন্য একটি লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে সংহতিকে এই উদ্যোগটি নেবার অনুরোধ করে তাঁর সর্বাত্নক সহযোহিতার আশ্বাস দেন।

সংগঠক ও কমিউনিটি এক্টিভিস্ট রহমান জিলানী সংহতি প্রতিষ্ঠার সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন- ১৯৮৯ সালে যখন সংহতি সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তখন চারদিকে ছিল বর্ণবাদ ও নানা বৈরী পরিবেশ। সেই সময়ে ফারুক আহমেদ রনি‘র নেতৃত্বে একদল তারুণ্যদের নিয়ে সংহতি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। সংগঠনটি জন্মলগ্ন থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা শাখায় কাজ করেছে। ত্রিশ বছরের উৎসবে দাড়িয়ে আমার পুরনো দিনগুলো যেমন মনে পড়ছে, তেমনি সংহতির বর্তমান জাগরণটিও আমাকে আপ্লুত করছে। সংহতির সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন- ভবিষ্যতে সাহিত্যের যে কোন কাজে সংহতির সাথে সংহতি প্রকাশের প্রত্যয় রাখছি।

সংগঠনের সভাপতি ছড়াকার আবু তাহের তাঁর বক্তব্যে সংহতির প্রতিষ্ঠালগ্নের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ও আন্তরিকতার কথা বর্ণণা করে বলেন- একটি সাহিত্যের কাগজ প্রকাশের উদ্যোগ থেকেই কবি ফারুক আহমেদ রনি‘র নেতৃত্বে সংহতি সাহিত্য পরিষদের জন্ম। ত্রিশ বছর পূর্তি উৎসবে সংহতির পক্ষ থেকে সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন। আগামী দিনে আমাকের উদ্যোগগুলো হবে আরও সাহিত্যবান্ধব এবং সৃজনমুখর।

সংহতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা তুহীন চৌধুরী ত্রিশ বছর পূর্তি উৎসবে উপস্থিত সকল আমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বলেন –সংহতি বিলাতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অনেকগুলো শাখায় কাজ করেছে এবং আগামী পথ চলায় তাদের কার্যক্রম আরও বেগবান হবে। তিনি সংহতির অগ্রযাত্রায় সকলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন-অতীতের মতো সংহতি আগামী দিনগুলোতে বিলেতের সাহিত্যও সংস্কৃতির অন্যান্য সংগঠনগুলোর সাথে বিভিন্ন কর্মকান্ডে যুগপথ কাজেও সম্পৃক্ত থাকবে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠাতা পর্ষদের অন্যতম সদস্য সাংবাদিক জাহেদি ক্যারল, শামসুল হক এহিয়া, সৈয়দা নাজমিন হক, চলমান কার্যকরী পরিষদের কবি আনোয়ারুল ইসলাম অভি ও আরাফাত তানিম।

সাংবাদিক জাহেদী ক্যারল প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন- সংহতি বিলেতে সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকিত দিকগুলো তুলে ধরতে প্রবীনদের সাথে নবীনদের সমন্ধয় করে সামনে এগুচ্ছে। এটা খুব আলোকিত দিক যে, দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে সংহতি পরিবারে সকলের মধ্যে সম্পর্ক খুব আন্তরিক এবং যার যার দায়িত্বে সবাই আন্তরিক হয়েই কাজ করছেন। নবগঠিত কার্যকরী পরিষদ আরও উজ্জ্বীবীত হয়ে সাহিত্যের নানা শাখায় কাজ করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

কবি আনোয়ারুল ইসলাম অভি ২০০৮ সাল থেকে অনুষ্ঠিত সংহতির কবিতা উৎসব ও সংহতি পদক প্রসঙ্গ টেনে বলেন- সংহতি মৌলিক ও সৃজনশীল কাজে আরও সরব হবে। সাহিত্যবান্ধব কাজে বাঙালি ও বাংলাদেশকে তুলে ধরতে বিলেতে সংহতি সাহিত্য পরিষদ মৌলিক অর্থে উচ্চকণ্ঠ হয়েই কাজের প্রত্যয় রাখছে।

অনুষ্ঠানে অতিথিদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠা সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংহতির কর্মকর্তাদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে সংহতি। সংগঠনের সভাপতি ছড়াকার ও নাট্য নির্মাতা আবু তাহের এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা ৭:৩০টায়।

প্রাণজ অনুষ্ঠানমালার সঞ্চালনায় ছিলেন জনপ্রিয় আবৃত্তিশিল্পী রেজুয়ান মারুফ ও মুনিরা পারভিন।

উৎসব আয়োজনে ছিল নানা সৃজনশীরতার ছাপ। ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে ‘সংহতি উৎসব স্মারক গ্রন্থ’। সেখানে স্থান পেয়েছে সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত নানা আয়োজন এবং মৌলিক কর্মের আলোচনা ,স্মৃতিচারণ ও প্রবন্ধ- নিবন্ধ। মোড়ক উন্মোচণে অতিথিদের সাথে যোগ দেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন- বিলেতের জনপ্রিয় আবৃত্তি শিল্পী রেজুয়ান মারুফ, মুনিরা পারভিন, পলিন মাঝি, সালাউদ্দিন শাহীন, ফখরুল আম্বিয়া,ফয়েজ নুর ও শতরুপা চৌধুরী, ।

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম কবিদের জনপ্রিয় কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠানে হল ভর্তি দর্শকদের মুগ্ধতা ছড়িয়েছে।

সংঙ্গীত পরিবেশন করেন- জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আলাউর রহমান, মিতা তাহের, শেখ রানা ও মৃদুল, মহিমা ও কাজল। মৌলিক ও লোকগাণে দর্শকরা উৎসব আনন্দে ডুবে থাকেন সংঙ্গীতের পুরো সময়।

ত্রিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সংগঠনের প্রতিষ্টালগ্ন থেকে বর্তমান পর্যন্ত সংহতির সকল কর্মকর্তাদের নিয়ে কেক কেটে উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করা হয়। যেখানে যোগ দিয়েছেন সংহতির প্রতিষ্ঠাকালীন অনেক সদস্যবৃন্দ।

উৎসবে প্রীতিভোজেও ছিল বাঙালিয়ানা ছোয়া- ইলিশভাজি, নানা পদের ভর্তা, ভুনা খিচুড়ি, বিরুন চাউল ইত্যাদি ঐতিহ্যিক খাবার দিয়ে উপস্থিত অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়।

প্রসঙ্গত ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত সংহতি সাহিত্য পরিষদ নাটক, মঞ্চনাটক থেকে শুরু করে প্রকাশনায় সক্রিয় ছিল। বিলেতে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে ইয়ুথ ফোরামগুলোতেও সক্রিয় ছিল সংহতি সাহিত্য পরিষদ এর সদস্যরা। ২০০৮ সাল থেকে সংহতি নিয়মিত কবিতা উৎসব এবং সংহতি পদক প্রদান করে আসছে। বাংলা সাহিত্যের প্রধানতম কবি সাহিত্যিকরা সংহতি কবিতা উৎসবে অংশগ্রহন করে থাকেন। এছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা,কানাডার কবি সাহিত্যিক কবিতা উৎসবে যোগ দিয়ে থাকেন আমন্ত্রিত অথিতি হয়ে।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবদি সংহতি প্রকাশ করেছে ৯টি সম্পাদনা গ্রন্থ। বিলেতের লেখক –পাঠকদের মধ্যে সৃজনশীল সেতুবন্ধন তৈরীর প্রয়াসে সংহতি গ্রন্থমেলা করে আসছে ধারাবাহিক ভাবে। এছাড়াও বিলেতে সাহিত্য সংস্কৃতি বান্ধব সকল আয়োজনে সংহতি একক ও যৌথ ভাবে অংশ গ্রহন করে থাকে।

যুক্তরাজ্য ছাড়াও সংহতি ‘র পরিধি বিস্তৃত হয়েছে নানা দেশে। বাংলাদেশ এবং আরব আমিরাত চ্যাপটার ধারাবাহিক ভাবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছে যা লেখক, পাঠক,সাহিত্যঅনুরাগীদের কাছে প্রসংশিত।

৩০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও শুভানুধ্যায়ীদের কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি কবি ফারুক আহমেদ রনি‘র উদ্যোগ এবং সংহতির দীর্ঘদিন ধরে মৌলিক ও সৃজনশীল কাজগুলো চালিয়ে যাবার আলোকিত কর্মযজ্ঞের প্রসঙ্গটি। উৎসবের আনন্দ ও উচ্ছাসের বলা যায় ষোল আনা সংহতির সাফল্যের পুটুলিতে জমা পড়েছে।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *