গ্রন্থ আলোচনা : ‘জীবনের জলছবি’তে একজন নির্ঝর


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

আবদুস সবুর মাখন

শব্দ দু’টির সম্পর্ক যেন চিরন্তন- ‘নির্ঝর’ আর ‘জলছবি’ ‘নির্ঝর’ এর আভিধানিক অর্থ জলপ্রপাত। এই জলপ্রপাত আর জলছবি’র মিল এক জায়গায়; সেটা হলো ‘জল’। জল ঝর্ণাধারা হয়ে পাহাড় চিড়ে বয়ে যায়, জলধারা বয়ে যায় নদীর বুকে। এর সঙ্গে প্রাণীজগতের নিবিড় সম্পর্ক। ঝর্ণা-নদীর মতোই মানুষের জীবনও ছুটে চলে গন্তব্যের দিকে। মানুষের যাপিত জীবনের ছোট্ট পরিসরে কতোকিছুই না দেখতে হয়, শুনতে হয়। এই সব দেখা শোনার বিষয়গুলো সবার মনে দাগ কাটে না; আবার কারও কারও মনকে আন্দোলিত করে। তেমনি একজন সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর। তিনি ‘জীবনের জলছবি’ গ্রন্থে এঁকেছেন মানুষের ছবি, জীবনের ছবি। বিলেতে বসবাসকারী সাংবাদিক প্রাবন্ধিক সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝরের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা দিয়ে। শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা- দুটোই মননশীলতা চর্চার ক্ষেত্র। তাই তিনি জীবনকে দেখেছেন অতি কাছে থেকে; জীবন-বাস্তবতার ঘাত প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়ে আঁকাবাঁকা মসৃণ কিংবা পংকিল অনেক পথ তিনি মাড়িয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতারই ফসল হচ্ছে এই ‘জীবনের জলছবি’ গ্রন্থটি।

এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রকাশক ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। তিনশ’ ১২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ৫৫টি প্রবন্ধ বা কলাম। লেখাগুলোর বিষয় ভিন্ন। জনপ্রিয় স্লোগান, প্রবাদ, কবিতার পংক্তি, গানের পংক্তি দিয়েই শিরোনাম করা হয়েছে লেখাগুলোর। এখানে কয়েকটি শিরোনাম উল্লেখ করা যায়- সত্য পথে কেউ নয় রাজি সবই দেখি তা… না…., মেঘমেদুর বরষায় কোথায় তুমি? প্রতিটি মানুষই তার স্বপ্নের সমান বড়, আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে? ভালোবাসার মূল্য কতো আমি সে তো জানি না, অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই শুনি মানবের উত্তম কিছু নাই….., এই দুনিয়া মায়ার জালে বান্ধা….., বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মুজিব, আর কতোকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়, মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়…., আমি চিনেছি আমারে…., এই রাঙ্গামাটির পথে ইত্যাদি। প্রতিটি লেখায় সময়কে ধারণ করা হয়েছে ঠিকই, তবে লেখার বিষয়বস্তু সময়কে অতিক্রম করে গেছে। এই প্রসঙ্গে গ্রন্থের ভূমিকায় বিশিষ্ট সাহিত্যিক কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, ‘জীবনের জলছবি’র লেখক সিদ্দিকুর রহমান, নির্ঝরকে শুধু কলামিস্ট বললে ভুল হবে। তাঁর কোন কোন লেখায় সমসাময়িকতাকে অতিক্রম করে এমন বিষয়কে তুলে ধরেছেন, যা গত এবং বর্তমান প্রজন্মেরই শুধু সমস্যা নয়, হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্মেরও। তিনি সমস্যার চিত্রটি এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা সমাধানের পথও দেখায়। তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রগতিশীল এবং আধুনিক। অন্ধ এক দেশদর্শিতা তাতে নেই।’ একজন গবেষক, সমাজ সচেতন ব্যক্তি মানুষকে পথ দেখাবেন সব বাধা বিঘœ অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার। এটাই তার দায়বদ্ধতা সমাজের কাছে, সময়ের কাছে, সভ্যতার কাছে। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝরের ‘জীবনের জলছবি’ গ্রন্থে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়- ‘আমাদের সবারই উচিত নিজেকে চেনার চেষ্টা করা। নিজেকে চিনতে পারলে নিজের দেশ, মানুষ জাতি সবকিছুই চেনা যায়। নিজেকে জানলে মনের মধ্যে দেশপ্রেমও থাকে। আর দেশপ্রেম থাকলে দেশের মানুষের প্রতি কেউ খারাপ আচরণ করবে না।’

লেখক একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ; তবে রাজনীতিবিদ নন। প্রবাসে থেকেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের কষ্ট নিয়ে ভাবেন। কোন গোষ্ঠী দল বা কোন ব্যক্তির কাছে সমর্পিত না হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর সুখ-দুঃখ নিয়ে তিনি তার মতামত ব্যক্ত করেন এভাবে ‘যতোদিন না আমরা ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সহনশীলতার পরিচয় দিতে পারবো ততোদিন পৃথিবীতে শান্তি আসবে না। আমরা ব্যক্তিগতভাবে হিটলার মসোলিনি, চেঙ্গিস অথবা ট্রাম্প হতে পারবো না।….. আমরা ‘মানুষ’। আমাদের মনুষ্যত্ববোধ আছে। আমাদের বিবেকবোধ আছে। আমরা কিছু মানুষের মতো মানুষ হয়েও দানবীয় কাজ করতে পারি না।….. এটা মনুষ্যত্বের লজ্জা।’ তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশ এর চেষ্টা বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্বন্ধে লেখকের মূল্যায়ন- ‘মধ্য যুগের মনমানসিকতামুক্ত, কিন্তু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার সঙ্গে যুক্ত করে আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবধারা সমৃদ্ধ বাঙ্গালী জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। জাতির রাজনৈতিক শৃঙ্খল মোচনের সঙ্গে মনের মুক্তি অর্জনে তিনি বাঙালী জাতিকে পরিচালিত করেছেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু তার পূর্ববর্তী সবাইকে অতিক্রম করে গেছেন।’ আরেকটি নিবন্ধে এই মহান ব্যক্তি সম্বন্ধে লেখকের বক্তব্য এরকম ‘এই চির বিপ্লবী বীর নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল ঢেউয়ের মতো হৃদয় মন্দিরে আছড়ে পড়বেনই। আজকের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিটি দেশপ্রেমিক বাংলাদেশী নওজোয়ান কন্ঠস্বরের সব শক্তি নিংড়ে চিৎকার করে বলবেই- বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মুজিব।’

ছোট্ট কিংবা বিশাল একটা জীবনতরীর মাঝি আমরা সবাই। এ তরীর রূপ-মাধুর্য্য-জৌলুস যার যেমনই হোক, গতি সবার একই; নদীর স্রোতের মতো। এর যাত্রাপথে অনেক কিছুকেই অতিক্রম করে যেতে হয়; ঝড়-তুফান, বাধা-বিপত্তি। সেই পথে যারা পথ হারায়, তাদের হাত ধরে টেনে নেয়ার জন্য সব হাত না হলেও কিছু হাত প্রসারিত হয়। কিছুটা রবীন্দ্রনাথের এই কথাটির মতো- ‘হাত ধরে মোরে নিয়ে চলো সখা আমি যে পথ চিনি না।’- এরা হচ্ছে বন্ধু। লেখক ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বন্ধুত্বের উপলব্ধিটুকু প্রকাশ করেছেন; যাতে রয়েছে সর্বজনীন চিত্র। তিনি বলেছেন ‘যাঁরা সত্যিকারের বন্ধু তারা আসলেই ‘বন্ধুহৃদয়’ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সব সময়ই সত্যিকারের বন্ধুরা উদার হৃদয় নিয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকেন।…. হাজার হাজার অপ্রয়োজনীয় বন্ধু থাকার চেয়ে শুধু সারাজীবনে মাত্র একজন ‘প্রকৃত বন্ধু’ থাকলেই যথেষ্ট। কারণ একজন সত্যিকারের বন্ধুর প্রভাব সারাজীবনেও শেষ হয় না।’ বন্ধুত্বের মতোই পারিবারিক বন্ধন, সম্পর্কের টানাপোড়ন নিয়েও তার একাধিক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে এই গ্রন্থে। তেমনি একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মতো আমরাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করি মানুষের মন জয় করাই মহত্তম তীর্থযাত্রা। কারণ মানুষের মন থেকে আন্তরিক ভালোবাসা আদায় করা খুব সহজ ব্যাপার নয়।’

সমসাময়িক বাংলাদেশ কিংবা সারা বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষের মধ্যে আতংক সৃষ্টিকারী জঙ্গিচক্রের মানবতা বিরোধী নানা তৎপরতায় বিচলিত বিজ্ঞমহল। এই দুষ্টচক্রের দমনে সোচ্চার লেখক, বুদ্ধিজীবী, সচেতন সমাজ। লেখক সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝরের এই সংক্রান্ত মূল্যায়ন এরকম- ‘মানুষের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা অর্জিত হয় ধর্মীয় শিক্ষার ফলে। বাংলাদেশের শতকরা ৮৭ জন মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইসলাম তো শান্তির ধর্ম। বাংলাদেশে তো মসজিদ, নামাজী, নৈতিক শিক্ষক কোন কিছুরই অভাব নেই। তবু দেশে প্রতিদিন এতো অধিক হারে নীতিহীন, লোমহর্ষক আর হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটছে কেন? …. জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে গেলে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা অতি জরুরী।’ জীবনের জলছবি গ্রন্থের শেষদিকে লেখক তার ব্যক্তিজীবনের ঘাত প্রতিঘাত, জীবন সংগ্রামের নানা ঘটনা তুলে ধরেছেন। ‘জীবনের গল্প বলে যাই অল্প’ শিরোনামের এই নিবন্ধে ওঠে এসেছে লেখকের ব্যক্তি জীবনের কিছু অপ্রিয় অপ্রত্যাশিত ঘটনা; যা বোধ করি প্রতিটি মানুষকেই জীবন চলার পথে বাধা বিঘ্ন, প্রতিবন্ধকতা টপকে যেতে সহায়তা করবে। একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এ প্রকাশিত তিনশ’ ১২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের প্রকাশক ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা। প্রচ্ছদ সোহেল আনাম। মূল্য পাঁচশ’ টাকা।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *