রাষ্ট্রিয় সম্মান নিয়ে শেষ শয্যায় শায়িত মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ হায়দার চৌধুরী


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

কমিউনিটি করেসপন্ডেন্ট
সত্যবাণী

লন্ডন: রাষ্ট্রের পক্ষে লন্ডন বাংলাদেশ হাই কমিশনের আনুষ্ঠানিক সম্মাননা নিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন সিলেটের প্রবীণ রাজনীতিক, একাত্তরের রনাঙ্গনে ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা গ্রুপের সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ হায়দার চৌধুরী। বুধবার স্থানীয় সময় বাদ জোহর পূর্ব লন্ডন মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে গ্রেটার লন্ডনের হ্যানল্ট মুসলিম কবরস্থান ‘গার্ডেন অফ পিস’-এ সমাহিত হন একাত্তরের রনাঙ্গনের বীর এই মুক্তিযোদ্ধা। পূর্ব লন্ডন মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে  কফিনে পুস্পস্তবক অর্পণ করে প্রয়াত ফরিদ চৌধুরীকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লন্ডন বাংলাদেশ মিশনের ডেপুটি হাই কমিশনার মোহাম্মদ জুলকার নাইন। এর আগে তিনি জাতীয় পতাকায় ঢেকে দেন প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ হায়দার চৌধুরীর কফিন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে হাই কমিশনার সাঈদা মুনা তাসনিমের শোকবার্তার একটি কপি প্রয়াত ফরিদ চৌধুরীর পরিবার সদস্যদের হাতে তুলে দেন ডেপুটি হাই কমিশনার। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হাই কমিশনের প্রটোকল অফিসার ইসমাইল হোসেইন, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি এমদাদুল হক চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসন, হামিদ মোহাম্মদ, সত্যবাণীর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা, সিপিবি যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক অব: শিক্ষক সৈয়দ রকিব, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক জামাল খান ও লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের এসিস্টেন্ট সেক্রেটারী মতিউর রহমান চৌধুরীসহ প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সদস্য ও কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। 

রাষ্ট্রিয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদ হায়দার চৌধুরীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রমফোর্ডের হ্যানল্ট মুসলিম কবরস্থান গার্ডেন অফ পিস’-এ। সেখানেই শেষ শয্যায় শায়িত হন বাঙালীর শ্রেষ্ট সন্তানদের একজন বীর এই মুক্তিযোদ্ধা।

লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার মোহাম্মদ জুলকার নাইন জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত ফরিদ হায়দার চৌধুরীর কফিনে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন
লন্ডনে বাংলাদেশের ডেপুটি হাই কমিশনার মোহাম্মদ জুলকার নাইন জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত ফরিদ হায়দার চৌধুরীর কফিনে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন

উল্লেখ্য, প্রবীন রাজনীতিক ফরিদ হায়দার চৌধুরী গত শনিবার স্থানীয় সময় সকালে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিলো আনুমানিক ৭৬ বছর। ২০১১ সাল থেকে স্ত্রী ও পরিবার পরিজন নিয়ে লন্ডনের কেন্টে বসবাস করছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী জাহানারা চৌধুরী, পুত্র তালাল হায়দার চৌধুরী ও কন্যা ফাবেহা খালেদ চৌধুরীসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন ও গুনগ্রাহী রেখে যান।

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কানীহাটি গ্রামের সন্তান ফরিদ হায়দার চৌধুরী এক সময় সিলেটে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপ রাজনীতিতে একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। ৮০র দশকের শুরুতে তিনি যোগদান করেন মহিউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন বাকশাল-এ। পরবর্তীতে বাকশাল আবার আওয়ামী লীগে বিলুপ্ত হলে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে সক্রিয় হন এই মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিক। ৮০র দশকে সিলেট জেলা বাকশালের অন্যতম শীর্ষ নেতা জনাব চৌধুরী ১৫ দলীয় জোটের নেতা  হিসেবে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় তৎকালীন এরশাদ সরকারের কোপানলে পড়ে জেলও খেটেছেন। সজ্জন ও সৎ রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ফরিদ হায়দার চৌধুরীর জীবনের গর্বিত অংশ ছিলো মুক্তিযুদ্ধের রনাঙ্গন। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সুযোগকে তিনি মনে করতেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

‘গার্ডেন অফ পিস’-এ নির্ধারিত কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফরিদ হায়দার চৌধুরীর মরদেহ
‘গার্ডেন অফ পিস’-এ নির্ধারিত কবরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফরিদ হায়দার চৌধুরীর মরদেহ

প্রয়াত ফরিদ হায়দার চৌধুরীর এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, বিশিষ্ট ব্যাংকার মনিরুজ্জামান চৌধুরী সত্যবাণীকে বলেন, আত্মপ্রচার বিমূখ এই নেতা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে তাঁর  মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার বা প্রচার না করলেও নিজের এই গৌরবগাঁথার কথা নাতি নাতনীসহ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গল্প করতে খুব স্বাচ্ছন্ধ্য বোধ করতেন। তিনি জানান, ন্যাপ-কমিউনিষ্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা গ্রুপের সদস্যরা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি আদায় করেন আদালতের দ্বারস্থ হয়ে। সম্প্রতি এই গ্রুপকে আদালত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বেশ কিছুদিন পর সম্প্রতি ফরিদ হায়দার চৌধুরী এসেছিলেন দেশে। ঐসময় তিনি সংগ্রহ করেন তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও দুই মাসের ভাতা। এগুলো হাতে পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন। হেসে হেসে বলেছিলেন, ‘এবার বিনা প্রমানে গল্প নয়, প্রমানসহ নাতি নাতনীদের সাথে গল্প করতে পারবো আমার জীবনের গৌরবময় সেই দিনগুলোর কথা’।

কিন্তু উত্তর প্রজন্মের কাছে প্রমানাদিসহ সেই গল্প আর করা হয়ে উঠেনি ফরিদ হায়দার চৌধুরীর। দেশ থেকে ফিরে আসার পরই তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গমন করেন। এরপর আর বাসায় ফিরে আসেননি, চির দিনের জন্য চলে গেছেন পরপারে।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *