অনিয়ম-দুর্নীতি উন্নয়নের জন্য হুমকি


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page
Rayhan Ahmed 
রায়হান আহমেদ তপাদার



দুর্নীতি সব উন্নয়নশীল দেশেই কমবেশি দেখা যায়। ভারত ও চীনের মতো দেশেও ব্যাপক দুর্নীতির কথা শোনা যায়। চীনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে রীতিমতো জিহাদ ঘোষণা করতে হয়েছে। গত বছর তিনি যখন প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচিত হলেন, তখন তাঁর মূল স্লোগানই ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। এ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কয়েক হাজার কর্মীকে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চীনে যে ধাঁচের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, মার্কিন প্রবাসী চীনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিন ঝিন পির মতে, তা হলো ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। বাংলা করলে এর অর্থ দাঁড়ায় স্বজনতোষী পুঁজিবাদ। এই ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, এখানে রাষ্ট্রের কর্মচারী-দালাল-রাজনৈতিক নেতারা সব মিলেমিশে দুর্নীতি করেন। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই দুর্নীতি হয়ে থাকে। সবাই যার কমবেশি ভাগ পেয়ে থাকেন। ব্যাপারটা হলো, আগে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘুষ খাওয়ার যুগে অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়াও সরকারি কার্যালয়ে কাজ করানো যেত। কিন্তু এখন সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন এই সিন্ডিকেটের দ্বারস্থ না হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করানো সম্ভব নয়। আগে যার কিছু সম্ভাবনা ছিল, এখন তাও নেই। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ার এটি অন্যতম কারণ। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, এতে সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়ে গেছে। বিমান আর দুর্নীতি যেন অবিচ্ছেদ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। দুর্নীতির রাঘববোয়ালরা সহস্র আরব্য রজনীর থিপ অব বাগদাদের মতো বিমানে জেঁকে বসায় লোকসান এ সংস্থার নিয়তির লিখনে পরিণত হয়েছে। 

যে দেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ বিদেশে কর্মরত বা অবস্থান করে সে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থার হতশ্রী অবস্থা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এলোমেলো করে দে মা লুটেপুটে খাইয়ের প্রবক্তারা বিমানকে জাতীয় অপমান আর লোকসানের প্রতীক বানিয়েছেন নিজেদের অপকর্মের মাধ্যমে। দুর্নীতির কারণে বিমানের বেহাল দশার কথা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। সম্প্রতি সংস্থাটির ৮ খাতে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে দুদক। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব খাতে সীমাহীন দুর্নীতি হচ্ছে। বিমানের অসাধু কর্মকর্তা এবং বোর্ডের অসৎ পরিচালকরা এসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বিমানের যেসব খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- এয়ারক্রাফট কেনা ও লিজ নেয়া, রক্ষণাবেক্ষণ, ওভারহোলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, কার্গো আমদানি-রফতানি, টিকিট বিক্রি, ক্যাটারিং ইত্যাদি। সম্প্রতি টিকিট ও কার্গো কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর মার্কেটিং ও কার্গো শাখার দুর্নীতিবাজদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিমানের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগ, কার্গো শাখা ও প্রকৌশল শাখার দুর্নীতির তদন্ত করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শাখাকেও আনা হবে তদন্তের আওতায়।বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সব শাখার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, এটি স্বস্তিদায়ক। এর অংশ হিসেবে এ সংস্থার দুর্নীতিবাজ মাফিয়া চক্র ও গডফাদারদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ চক্রের সদস্যদের তালিকাসহ দুর্নীতির দলিল-দস্তাবেজ ও তথ্য-উপাত্ত পাঠানো হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। 

জানা গেছে, দুদক ইতিমধ্যেই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ শুরু করেছে। বস্তুত সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিমানকে প্রতি বছর বিপুল অংকের অর্থ লোকসান দিতে হচ্ছে। সেবার মানও হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ।

সত্য বলতে কি আসলেই সেবার মান বৃদ্ধির কোনো প্রয়াসও নেই কর্তৃপক্ষের। ফলে পারতপক্ষে কেউ বিমানের উড়োজাহাজে চড়তে চান না এখন। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে সে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার বিকল্প নেই।এদিক থেকে বিমানের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অদক্ষতা, অযোগ্যতা আর দুর্নীতি এ সংস্থাটির পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি এয়ারলাইন্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিমানের পিছিয়ে পড়ার এটাই অন্যতম কারণ।অতীতে জনবল কমিয়ে আনা এবং বিদেশিদের সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়াসহ বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত করার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। তাই দাবি উঠেছে বিমানকে গতিশীল করতে একটি পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ গঠনের। এ লক্ষ্যে সরকার পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য। বিমানকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি ও ভাবমূর্তির প্রশ্ন জড়িত। এসব বিষয় খাটো করে দেখার ন্যূনতম সুযোগ নেই।ইতিপূর্বে বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক ১৯ দফা সুপারিশ করেছিল। সুপারিশনামায় বলা হয়েছে, দুর্নীতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। অতীতে ক্রয়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বড় অসঙ্গতির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। 

এযাবৎকালের অডিট আপত্তিগুলো গুরুত্বসহ বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া আরও নানা পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মানুষ দেখছে ভিন্নতা।দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে যেমন, বিমানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জাম ক্রয়ের তালিকা, কখন কেনা হয়েছে, কী দামে কেনা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়েছে, কত টাকা মূল্য পরিশোধ করা হয়েছেএসব রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দুর্নীতির পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও ওভারহলিং খাতে কেনাকাটার সময় আন্তর্জাতিক দরপত্রের নিয়ম সঠিকভাবে পরিপালন হচ্ছে কি না তা পর্যালোচনার জন্য বিষেশজ্ঞ টিম গঠন করা যেতে পারে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনয়নের লক্ষ্যে ই-টেন্ডারিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে বিমানের বড় ধরনের আয় এবং বিপুল রাষ্ট্রীয় কর্মসংস্থান সম্পৃক্ত। এ জন্য আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারের সঙ্গে ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করা যেতে পারে। চুক্তিবদ্ধ কম্পানি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং পরিচালনার পাশাপাশি এক্সপার্টাইজ শিফটের মাধ্যমে বিমানকে দক্ষ করে গড়ে তুলবে। চুক্তিবদ্ধ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলারের তত্ত্বাবধানে স্টাফ রোস্টারিং/এটেন্ডেন্স, ফ্লাইট হ্যান্ডলিং ম্যানেজমেন্ট এবং সার্ভিস বিলিং ম্যানেজমেন্টের জন্য সফ্টওয়্যার ইনস্টলেশনসহ কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য যথাযথ গোডাউন ও অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করা যেতে পারে। আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ক্যাজুয়াল শ্রমিক নিয়োগ প্রথার পরিবর্তে কোয়ালিফায়েড সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক জনবল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। 

আর তাতে করে নিয়োগ-দুর্নীতি রোধের পাশাপাশি কাজের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এমনকি কার্গো ওজনের কাজটি নিয়মিত মনিটরিং করা প্রয়োজন। 

এ ছাড়া ওজনপ্রক্রিয়া ডিজিটালাই জেশনের মাধ্যমে এ দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। ট্রানজিট বা লে-ওভার প্যাসেঞ্জারের হিসাব বর্তমানে ম্যানুয়ালি সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে। এটিকে ফ্লাইটের সঙ্গে লিংক করে মানসম্মত সফ্টওয়্যারের মাধ্যমে ডিজিটালাইজড করতে হবে। হোটেলে প্রতি রুমে বাস্তবে কতজন অবস্থান করে তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য মনিটরিং টিমের মাধ্যমে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত ব্যাগেজের চার্জ আত্মসাৎ রোধে মনিটরিং জোরদার করা যেতে পারে। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে আগমনী যাত্রীদের বুকিং ট্যাগ ও বহনকৃত ওজন পরীক্ষা করে মিল না পাওয়া গেলে বোর্ডিংপাস ইস্যুকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ কাজের জন্য একটি নিরপেক্ষ টিম গঠন করে কার্যকর রাখা যেতে পারে। এছাড়া বিমানকে সার্বক্ষণিক ওয়েবসাইট আপটেড রাখতে হবে, যাতে করে গ্রাহকরা ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ এবং পরিপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন। বিমানকে সার্বিকভাবে ই-টিকেটিং, ই-রিজার্ভেশন এবং ই-প্রকিউরমেন্ট পদ্ধতিতে যাওয়া প্রয়োজন।এ ছাড়া ফলস বুকিং বন্ধ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এজেন্টদের বুকিং-কোটা এবং বুকিং সময় কমিয়ে অনলাইন টিকিটের প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিকমানের শেফ নিয়োগ দিয়ে খাবারের মান উন্নত করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিএফসিসি শাখার নজরদারি বৃদ্ধি করা যেতে পারে, যাতে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

উল্লেখ্য কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে মানুষের জন্য তা এতটা সমস্যা নয়, যদি সেই সরকার মানুষকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দিতে পারে বা তার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে। সেটা করতে গেলে অবশ্যই দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে হবে এবং মানুষকেও মনোভাব বদলাতে হবে। তবে সরকারকেই মূল ভূমিকা নিতে হবে। তাহলে জনসাধারণের সমর্থন পেতে অসুবিধা হবে না। জাতীয় পতাকাবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিমান দুর্নীতিমুক্ত হয়ে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক এবং উন্নতি হোক দেশের তথা মানুষের।

রায়হান আহমেদ তপাদার: লেখক ও কলামিস্ট।

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *