‘আমাদের দেশ এখন কার হাতে’


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Akbar hussain আকবর হোসেন

‘আমাদের দেশ এখন কার হাতে’ শিরোনাম দেখে হয়তো কেউ চমকে উঠবেন। দেশতো আমাদের হাতেই, এটা আবার বলে কী! হ্যাঁ, কথাটি অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ শিরোনামেই সাপ্তাহিক ২০০০ একটি প্রচ্ছদ কাহিনী করেছিলো ২০০৮ সালের ২১ মার্চ। এটি লিখেছিলেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবি ও অর্থনীতিবিদ, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আনু মোহাম্মদ। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ২০০৮ সালের সেই প্রচ্ছদ কাহিনীই আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলো বলে এর গুরুত্ব বিবেচনায় তার লেখার উল্লেখযোগ্য অংশ আজকের এই নিবন্ধে উপস্থাপন করা হলো। সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিলো। লেখক আনু মোহাম্মদ তার লেখায় দেশ কারা চালায়, কিভাবে পরাশক্তির সাথে আমাদের চুক্তি হয়, এখানে কার স্বার্থ প্রাধান্য পায়, আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, রাজনীতিবিদদের কারা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের উপর কর্পোরেট শক্তির প্রভাব ইত্যাদির চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন কিছু বাস্তব উদাহরণ দিয়ে।
বাংলাদেশে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই একটি কথা চালু আছে যে, দেশকে আবার পাকিস্তানের সাথে এক করার ষড়যন্ত্র চলছে অথবা পাকিস্তানের পরাজিত শক্তি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে আর এর বিপরীতে বলা হয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আমাদের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেবে অথবা ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। কেউ পাকিস্তানের দালাল আবার কেউ ভারতের দালাল। আবার কেউ আমেরিকার কিংবা রাশিয়ার দালাল বলেও অনেক কথা বাজারে চালু আছে। এভাবে পাল্টাপাল্টি কাঁদা ছোড়াছোড়িতে আমাদের রাজনীতিবিদ এবং তাদের সমর্থকগোষ্ঠি সদা ব্যস্ত রয়েছেন। গেলো মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করে বেশকিছু চুক্তি ও মেমোরেন্ডামে স্বাক্ষর করায় এই বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভারতের কাছে দেশবিক্রিরও অভিযোগ উঠেছে। সত্যিকার অর্থে দেশ বিক্রি হয়েছে কিনা তা’ আমাদের জানার কোন উপায় নেই। আমরা শুধু নীরব দর্শক হিসেবে উভয় পক্ষের অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগ শুনেই যাচ্ছি। আসলে রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে এমনকিছু কাজ করেন যার কাছে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতেও তাদের এতোটুকু বক কাঁপে না। দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেন। সংসদে আলোচনা ছাড়াই বিভিন্ন চুক্তি সাক্ষরিত হয়; সংসদের কোন আলোচনা হয় না। আর বিদেশীরাও দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে অনায়াসে। আসুন এবার আনু মোহাম্মদের লেখার দিকে নজর দেই।
লেখার শুরুতে তিনি যা’ বলেছেন তা’ হলো, “গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ যে সমস্ত নীতিমালা দিয়ে চলেছে সে সব নীতিমালার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে লুস্পেন শাসকগোষ্ঠী। তারা রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী কিংবা কনসালটেন্ট যাই হোক, তাদের শিকড় এ দেশে নেই। তারা এদেশে বসবাস করে এ দেশ থেকে সম্পদ আহরণের জন্য কিন্তু তারা তাদের ভবিষ্যৎ দেখে অন্য দেশে। —– এ রকম একটি শাসকগোষ্ঠীর কারণেই বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও নীতি প্রণয়নের দিক থেকে বিভিন্ন বিদেশি শক্তির হাত ক্রমান্বয়ে জোরদার হচ্ছে। বিদেশি শক্তির আধিপত্য বাড়ছে, নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে তারা ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কেমন হবে, সন্ত্রাসের পরিস্থিতি কী হবে, পার্লামেন্ট কীভাবে চলবে, বিচার ব্যবস্থায় কী ধরনের সংস্কার দরকার, আমলা প্রশাসনে কী ধরনের সংস্কার দরকার, রেলওয়ে কী হবে, ব্যাংক কী হবে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা কী হবে, কোথায় সেতু হবে, তেল-গ্যাসের কী হবে, সমদ্রে কাদের দখল থাকবে, মন্ত্রীসভা কীভাবে পরিচলিত হবে ইত্যাদি সব বিষয়েই আমরা দেখি বিদেশিদের হাত বা নাক। কোনও না কোনও দুতাবাস কিংবা বিশ্বব্যাংক কিংবা এডিবি কিংবা সরাসরি কতিপয় রাষ্ট্র যেমন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এদেশে এসে তাদের বিভিন্ন ধরনের নসিহত কিংবা নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন।”
এরপর তিনি গ্যাট চুক্তি সম্পর্কে বলেন, “১৯৯৪ সালে গ্যাট চুক্তি হয়েছে যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্ব পুঁজির কাছে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এই চুক্তির ওপর পুরো দেশ ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হলেও বাংলাদেশের সংসদে এ নিয়ে আলোচনা হয়নি। ৮০ ও ৯০ এর দশকে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে জনগণের সম্পদ তেল গ্যাস তাদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এইসব চুক্তির জন্য আমাদেরকে প্রতি বছর লোকসান, ভর্তুকি ইত্যাদি দিতে হচ্ছে। তাদের লোভের কাছে পুরো বাংলাদেশ এখন জিম্মি এবং তারা তাদের অবস্থান জোরদার করতে পেরে এখন সেটার সম্প্রসারণ করছে। এই তেল-গ্যাস চুক্তিও সংসদে আলোচনা হয়নি। এবং এটি এখন পর্যন্ত গোপন আছে। বাংলাদেশে পিআরএসপি নামে একটি দলিল গ্রহণ করা হয়েছে। এই দলিল চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়নি। আমি নিশ্চিত দু-একজন মন্ত্রী, এমপি ছাড়া কেউ এই পিআরএসপি সম্পর্কে জানে না। এসব চুক্তিতে যারা স্বাক্ষর করেন তারাও এগুলো ঠিকভাবে জানেন না। বাংলাদেশে এমন একটি অবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে যারা দেশ পরিচালনা করে, মন্ত্রণালয় পরিচালনা করে তাদের মাথায় দেশ থাকে না, তাদের মূল মাথাব্যাথা যেন বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করা।”
মন্ত্রী, আমলা ও উপদেষ্টা সম্পর্কে তিনি বলেন, “যাদেরকে আমরা দেশের মন্ত্রী, আমলা বা উপদেষ্টা হিসাবে দেখি তারা তাই বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, তারা প্রতিনিধিত্ব করে বিদেশি সংস্থা বা আন্তর্জাতিক সংস্থার। এবং তাদের এই ভূমিকার মধ্য দিয়েই এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে আমাদের দেশ আর আমাদের হাতে নেই। এমন একটা ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছে।” উন্নয়ন নীতিমালা ও পরিবেশ সম্পর্কে তিনি বলেন, “বাংলাদেশে এ যাবৎ যেসব উন্নয়ন নীতিমালা গৃহীত হয়েছে সেসব নীতিমালা বাংলাদেশের জনগণের কথা বলেই প্রণয়ন করা হয়েছে। দারিদ্র বিমোচনের কথা বলা হয়েছে নারীর উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, সুশাসনের কথা বলা হয়েছে, পরিবেশ উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে; কিন্তু দেখা গেছে যে এসব কথা বলে যে সমস্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা এ দেশে এসেছে তারা পরিবেশের অধিকতর অবনতি তৈরি করেছে, নারীর অবস্থা আরও বেশি নাজুক হয়েছে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠির অসহায়ত্ব আরও বেশি হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে অর্থনীতি নড়চড়ে অবস্থানে গেছে। সমাজ ও অর্থনীতির তার ভিত্তি মজবুত করার সুযোগ পায়নি।”
বন্যা নিয়ন্ত্রণেল জন্য বিদেশী সংস্থাগুলোর সাহায্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “বন্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলে বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা কাজ করেছে, বহু তহবিল এখানে আনা হয়েছে, বহু আমলা কনসালটেন্ট ধনী হয়েছে। কিন্তু এসব কার্যকর করে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। যেমন ১৯৫৪ সালে একটা ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, বিদেশিদের কর্তৃত্বে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এরপর জোরদার হয়। এর বিশ বছর পরে ১৯৭৪ সালে আর একটা বড় বন্যা হয়েছে। এই বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি আরও জোরদার হলো, বাঁধ প্রকল্প ইত্যাদির বাস্তবায়নের পর বন্যা এসেছে ১৩ বছর পর, ১৯৮৭ সালে আবার এর এক বছর পর ১৯৮৮ সালে। আরও তহবিল ব্যয় হলো, কর্মসূচি জোরদার হলো, কিন্তু এর পরের বন্যাটা হলো দশ পরে ১৯৯৮ সালে এবং এর ছয় বছর পরে ২০০৪ সালে আবারও বন্যা হলো। তার মানে হচ্ছে যতো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নানা প্রকল্প হয়েছে তাতে বিদেশি সংস্থা আর বাংলাদেশি লোভী নানা গোষ্ঠির লাভ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে বন্যার বছরের ব্যবধান কমেছে।”
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি সম্পর্কে কিছু স্পর্শকাতর ও ভয়ংকর তথ্য তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন এভাবে, “বাংলাদেশের ভবিষ্যত গতিপথ নির্ধারণের অনেক নীতিমালা আছে, যেগুলোর সঙ্গে নির্বাচিত সংসদের ও জনগণের কোনও সম্পর্ক আমরা দেখিনি। বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেকগুলো গোপন চুক্তি আছে। তার মধ্যে একটা চুক্তিতে বলা আছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য যেকোনও সামগ্রী বাংলাদেশে আনতে পারবে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কোনও মনিটরিং করতে পারবে না। আমরা জানিনা এই চুক্তির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে এবং কী কী এসেছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থবিরোধী প্রত্যেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করতে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে সাহায্য করবে। সেই চিহ্নিতকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে হাতের আঙুলের ছাপ, চোখের রঙ, গায়ের রঙ ইত্যাদি তাদের প্রজেক্টের অংশ। আমি জানিনা, ভোটার তালিকার প্রজেক্টের সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে কিনা।” “আরও একটি চুক্তি আছে সেটা আরও ভয়ঙ্কর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও সামরিক ব্যক্তি বাংলাদেশে এসে যদি অপরাধ করে কিংবা বিদেশে অপরাধ করে যদি বাংলাদেশে আসে, বাংলাদেশের কোর্টি তার কোন বিচার করা যাবেনা। তার মানে বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক বাহিনী এসে যা’ খুশি তাই করতে পারে, এটা আইনগতভাবে মেনে নিয়েছে বাংলাদেশেরই সরকার। এসব চুক্তির পরেও এই দেশের সার্বভৌমত্ব আছে কি বলা যাবে?” “বাংলাদেশের জনগণকে না জানিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তার কথা যে বলা হয়, বলতে হবে যে এর চেয়ে প্রতারণামূলক আর কিছু হতে পারে না। মার্কিন বাহিনী নিজেই তো আমাদের দেশের নিরাপত্তার হুমকি।”
এর পর তিনি শেভরনের কাছে বাংলাদেশের পাওনার কথা উল্লেখ করে বলেন, “শেভরনের কাছে মাগুরছড়ার জন্য আমাদের পাওনা আছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। সেটা নিয়ে কোনও সরকার চেষ্টা করেনি, এই সরকারও (২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার) চেষ্টা করেনি। শেভরনের কাছে আমরা টাকা পাই কিন্তু মার্কিন কুটনীতিকেরা বলেন, শেভরনের কাছে আমাদের টাকা বকেয়া আছে এবং এটা নিয়ে সরকার কোনও প্রতিবাদও করে না। সেই শেভরনের সঙ্গে পেট্টোবাংলার মামলা নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদারকি করেছেন যাতে এই মামলাটি তুলে নেওয়া হয়।”
এশিয়া এনার্জি সম্পর্কে তিনি বলেন, “বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন যে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে শুধু ওই অঞ্চলই ধ্বংস হবে তা নয়, পুরো বাংলাদেশের পানি, মাটি সবকিছুর ওপর এর ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী প্রভাব পড়বে। মরুকরণ হবে উত্তরবঙ্গে; সে অঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ভয়াবহ প্রতিকুলতার মধ্যে পড়বে। কর্মসংস্থান, বাসস্থান যাবে। লক্ষ মানুষের জীবন ছিন্নভিন্ন হবে। উপরন্তু আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বিপর্যস্ত হবে। — এই বিধ্বংসী প্রকল্পে এশিয়ান ডেভেলাপমেন্ট ব্যাংকের ফিনান্স করার কথা। এ ব্যাপারে এডিবির লিখিত যত শর্ত আছে এশিয়া এনার্জির প্রকল্প সেগুলোও পূরণ করে না। কারণ সে জনগণের মতামত নেয়নি, জনগণের মানবাধিকার লংঘন করেছে, তথ্য গোপন করেছে, দুর্নীতি করেছে, আইন ভঙ্গ করেছে, জালিয়াতি করেছে। এডিবির বোর্ড মিটিংয়ে এশিয়া এনার্জির এই প্রকল্প এখনও পাস হয়নি, বিশ্বের বহু সংগঠন এর বিরুদ্ধে এখন সোচ্চার।”
বিশ্বব্যাংকের খবরদারি সম্পর্কে আনু মোহাম্মদ লিখেন, “আমাদের প্রতিটি বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের খবারদারি আছে, মাসে মাসে তাদের কাছে জবাবদিহি করে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের এখন এমন অবস্থা যে অনুগত, বোধহীন, আত্মমর্যাদাবোধহীন, অনুচর লোক পাওয়া খুব সহজ। লোকদের কিনতে এখন আর বেশি পয়সাও লাগেনা। প্রাক্তন বা বর্তমান আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সাংবাদিক নামের কনসালটেন্ট পাওয়া মোটেই কঠিন নয়। কিছু ফিনান্স দিয়ে টেকনিক্যাল এসিস্টেন্স নামে কোনও প্রজেক্টে ঢুকিয়ে বিশ্বব্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠান যা দরকার সেই নীতি দাঁড় করায়।” আরো একটু এগিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ”বিশ্বব্যাংকের দরকার এখানে শিক্ষার মধ্য দিয়ে কোনও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা নয়, দরকার তৈরি করা মানুষ নামের নাট-বল্টু যেটা তাদের কর্পোরেট ক্যাপিটালের জন্য দরকার। এবং সেই রকমভাবে পূনর্বিন্যাস করার জন্য তারা চাপ দিচ্ছে। সুতরাং এভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের প্রতিটি খাতে বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাংখা বা কর্তৃত্ব ভবিষ্যৎ কোনোটাই তাদের হাতে নেই। সম্পদটা কার হাতে যাবে সেটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গোপন চুক্তি হচ্ছে।”
তারপর তিনি সরকারের দায়িত্ব সম্পর্কে লিখেন, “সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল দুর্নীতি দমনের প্রধান অংশ হিসাবে দূর্নীতিগ্রস্ত বিদেশি কোম্পানিকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা, সেটা না করে নানারকম সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। নাইকো নামে যে কোম্পানী এখানে দূর্নীতিগ্রস্ত ছিল তার পক্ষে ওকালতি করার জন্য কানাডা থেকে মন্ত্রী এসেছে। কানাডার হাইকমিশনার দরকার করেছেন। দূতাবাসগুলো এখানে একটা লবিষ্ট হিসাবে কাজ করে। নাইকো যে দূর্নীতি করেছে তা অনেক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং দুই প্রধানমন্ত্রী এটার জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন। এই রকম একটি দূর্নীতিবাজ কোম্পানিকে বিচারের দরবারে দাঁড় করানো হচ্ছে না কেন? বিদেশি সংস্থা, কোম্পানি কিংবা প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ তাদের বিচার করার ক্ষমতা বাংলাদেশের যদি না থাকে তাহলে বাংলাদেশকে কীভাবে সার্বভৌম বলা যাবে?”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, “১৯৭১ সালে টিক্কা খান বলেছিল, এখানে তার কোন মানুষ দরকার নেই, দরকার মাটি। বর্তমানে বহুজাতিক যেসব সংস্থা এদেশে আসে তাদেরও মানুষ দরকার নেই তাদের মাটি দরকার, সম্পদ দরকার এবং মুনাফা দরকার। মানুষ, নদীনালা, বাতাস শেষ হয়ে যাক তাদের কিছু যায় আসে না, তাদের মুনাফা হলেই হলো। কয়েক দশকে গড়ে উঠা এ দেশের লুটেরা শাসকগোষ্ঠী তাদের সেই কাজেরই সহযোগী।”
সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে আমেরিকার দুমূখী ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট আজ বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলে কিন্তু সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ভূমিকা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে তার আধিপত্যের জন্য ইসলামপন্থি জঙ্গিদের তৈরি করেছে, লালন পালন করেছে, পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তাদের পকেটে বেশ কিছু জঙ্গি গ্রুপ আছে। যাদেরকে তারা তৈরি করে বা তাদের কাহিনী তৈরি করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী জঙ্গি তৎপরতা বাড়ে ও আবার তারাই তার দমনের নামে হামলা করে আধিপত্য বাড়ায়। এইক্ষেত্রে পাকিস্তান হচ্ছে সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত এবং বাংলাদেশেও তারা সেই ধরনের প্ল্যান করছে এটা মোটামুটিভাবে বোঝা যাচ্ছে।”
সবশেষে আনু মোহাম্মদ জনগণকে সংগঠিত হবার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “এরকম একটি অবস্থায় আন্তর্জাতিক দখলদারিত্ব, খবরদারি কিংবা লুটপাট থেকে জনগণের সজাগ ও সংগঠিত অবস্থা থেকে আমাদের বেরুতেই হবে, কারণ এই দেশটা হচ্ছে আমাদেরই এবং এ দেশের যে সম্পদ এই সম্পদের মালিক হচ্ছে জনগণ। সুতরাং নিজেদের জীবন এবং সম্পদের ওপর মালিকানা পূনঃ প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে নতুন কোনও যাত্রা আমরা তৈরি করতে পারব না এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যে ভবিষ্যত তৈরি করা দরকার সেটাও আমরা করতে পারবনা।”

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *