নারী নয়, মানুষ হিসেবে দেখুন


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

IMG_3322  ইমতিয়াজ মাহমুদ

ধর্ষণ ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা করুন। ধর্ষণের জায়গা লক্ষ্য করুন। স্কুলে ধর্ষণ হয়েছে, মাদ্রাসায় হয়েছে, এই সেদিন মসজিদে এক ইমাম সাহেব একটি শিশুকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণের শিকার কারা হচ্ছে সেটা লক্ষ্য করুন। শিশুরা, কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার চিন্তা করুন। শিশু, কিশোর, কিশোরীরা। অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল ঘরের মেয়েরা। কর্মজীবী মেয়েরা, গৃহবধূরা। কেউ বাদ যাচ্ছে না। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা, স্বচ্ছল ঘরের মেয়েরাও। তবে স্বচ্ছল বিত্তবান ঘরের মেয়েরা ধর্ষণের শিকার একটু কম হয়, কিন্তু ওরাও একদম যে শিকার হয় না তাও নয়, হয়। নারী মাত্রই ধর্ষণের সম্ভাব্য শিকার।

আর ধর্ষক? ধর্ষক হচ্ছে পুরুষ। এখানে শ্রেণীভেদ নেই, ধর্মের ভাগ নেই, এলাকার ভাগ নেই। পুরুষমাত্রই একেকটি সম্ভাব্য ধর্ষক।

বনানী এলাকার একটি ধর্ষণের ঘটনা এখন সকলেই আলোচনা করছেন। ধর্ষণের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে এদের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। এরা বিত্তবান ক্ষমতাবান ঘরের ছেলে। এদের পারিবারিক পরিচয় মোটামুটিভাবে সকলেই এরমধ্যে জেনেছেন। পরিচিত পরিবার সব। আর ভিক্টিম? দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এরা দুইজন, খুব বিত্তবান না হলেও মোটামুটি স্বচ্ছল ঘরের মেয়ে তো হবেই।

আরেকটি ধর্ষণের খবর হচ্ছে মসজিদের ভিতরে একজন ইমাম সাহেব একটি শিশুকে ধর্ষণ করেছে। মসজিদের ভিতর। ভিক্টিম একটি শিশু। সারা দেশের মানুষ চমকে উঠেছে। এইটা কিরে ভাই! ইমাম সাহেবরা ধর্ষণ করে এই খবর নতুন না, কিন্তু মসজিদের ভিতর? সবাই ভাবছে এটা কি করে সম্ভব?

এই যে বিত্তবান, ক্ষমতাবান ঘরের ছেলেরা ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, এই ছেলেরা তো সম্ভবত শিক্ষিত ছেলে। উচ্চ শিক্ষিত কিনা জানিনা, কিন্তু স্কুল কলেজে তো নিশ্চয়ই গেছে। সেই শিক্ষা ওদেরকে ধর্ষণের মতো অপরাধ থেকে বিরত রাখেনি। আর ইমাম সাহেব? তিনি তো ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত। আবার ধর্মীয় শিক্ষা দেনও অন্যদেরকে। তিনি তো নৈতিকতার অভিভাবক হওয়ার কথা। তার শিক্ষা কোথায় গেল?

(২)
যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলির জন্যে অপরাধীদের বিচার হবে কিনা সেটা নিয়ে অনেকে সন্দেহ করছেন। বিচার তো আমরা সকলেই দাবী করি। বিচার হয়তো হবে। আবার প্রভাব প্রতিপত্তি টাকা পয়সা এইসব ব্যাবহার করে বিচারের ফাঁক গলে এরা বেরিয়েও যেতে পারে। অসম্ভব কিছু না। বিচারের দাবী তো আমরা সবাই করবোই, কিন্তু বিচার তো হবে যেসব ধর্ষণ হয়ে গেছে তার জন্যে। ধর্ষণ কেন হচ্ছে, কি করলে এটা বন্ধ করা যায় বা কমানো যায় সে চিন্তা কি করেছেন? সেই চিন্তাটা করা জরুরী না?

আগে দেখেন ধর্ষণ কি? তাইলেই ধর্ষণের মুল কারণটা অনেকটাই পাওয়া যাবে। ধর্ষণ মানে হচ্ছে একজনের সম্মতি ছাড়া তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক করা। আমাদের দেশের আইনে আর অন্যান্য দেশের আইনে ছোটখাটো নানারকম পার্থক্য আছে- ঠিক কতোটুকু কি করলে সেটাকে ধর্ষণ বিবেচনা করা হবে, কত বয়সের নিচে হলে আপাতদৃষ্টিতে সম্মতি থাকলেও সেটাকে সম্মতি বিবেচনা করা হবে না, নিজের স্ত্রীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করলে সেটা ধর্ষণ হবে কিনা, বিচার পদ্ধতি ইত্যাদি নানারকম বিষয়ে। কিন্তু সব দেশের আইনেই ধর্ষণের যে মৌলিক উপাদান, সম্মতি ছাড়া শারীরিক মিলন, সেটি একই।

তাইলে মুল প্রশ্নটাতেই আসেন। একজন নারীর সাথে একজন পুরুষ নারীটির সম্মতি ছাড়া শারীরিক মিলন কেন করবে? নারীটি যেই হোক, বন্ধু বা অপরিচিত, স্ত্রী বা অনাত্মীয়, এমনকি যদি যৌনকর্মীও হয়, নারীটির সম্মতি ছাড়া আপনি কি তার সাথে সঙ্গম করতে পারবেন?

হ্যাঁ, পারবেন। যদি আপনি মনে করেন যে নারীর সম্মতির কোন প্রয়োজন নাই। বা আপনি যদি মনে করেন যে নারীর হ্যাঁ কিংবা না এটার কোন গুরুত্ব নাই। এইরকম চিন্তা আপনার মাথায় আসবে কেন যে, একজন মানুষের সাথে সঙ্গম করার আগে তার সম্মতি আছে নাই সেটা জানার প্রয়োজন নাই? আসবে যদি আপনি মনে করেন যে নারী মানেই ভোগের বস্তু। নারীকে যদি আপনি একজন মানুষ মনে করেন, আপনার মতোই একজন মানুষ, তাইলে আপনি নারীর সম্মতি ছাড়া ওর শরীরে হাত দেবেন কি করে?

(৩)
এটাই মুল ব্যাপার। নারীকে মানুষ বিবেচনা করা হয়না। নারীকে মনে করা হয় ভোগের বস্তু। এমনকি যারা ধর্ষণকে নিন্দা করেন এদের মধ্যেও একদলকে পাবেন যারা ধর্ষণকে মন্দ কাজ মনে করেন ঠিকই, কিন্তু সেটা নারীর অসম্মতির জন্যে না। এরা মনে করেন যে নারী হচ্ছে মূল্যবান বস্তু, নারীকে ধর্ষণ করা ওদের দৃষ্টিতে অনেকটা একজনের ভোগের বস্তু আরেকজন মালিকের পারমিশন ছাড়া খেয়ে ফেললো এই ধরনের অপরাধ। এই কারণে এরা দেখবেন ব্যাভিচার আর ধর্ষণকে একইভাবে সমান অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করেন।

ব্যাভিচার আর ধর্ষণ এই দুইটা কি? ধর্ষণ কি সেটা আগেই বলেছি, নারীর সম্মতি ব্যাতিরেকে করা। আর ব্যাভিচার হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে অনুমোদিত না এইরকম শারীরিক সম্পর্ক। যেমন দুইজন নারীপুরুষ যদি বিবাহ ছাড়া মিলিত হয়। বা একজন বিবাহিত মহিলার সাথে তার স্বামী ছাড়া অন্য কেউ যদি মিলিত হয়। এখানে নারীর সম্মতি থাকলেও সেটাকে অপরাধই বিবেচনা করা হবে।

যারা ব্যাভিচার আর ধর্ষণকে সমান অপরাধ বিবেচনা করে ওদের দৃষ্টিতে নারীর সম্মতি থাকা না থাকা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। শারীরিক মিলনটি যদি সমাজের অনুমতিপ্রাপ্ত সম্পর্কের বাইরে হয়, সেটাই অন্যায়। তাইলে চিন্তা করে দেখেন, একটি নারী আর একজন পুরুষ যদি বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে পরস্পরের সম্মতিতে মিলিত হয় সেটাকে যারা অপরাধ মনে করবে ওদের কাছে কি নারীর সম্মতির কোন গুরুত্ব আছে? নাই।

এই যে আপনারা সৌদি আরব পাকিস্তান বা অন্যান্য মুসলিম দেশে মাঝে মাঝে দেখতে পান যে ধর্ষণের শিকার নারীটিকেও ধর্ষকের সাথে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটা হচ্ছে এই ব্যাপার। নারী পুরুষ যদি স্বেচ্ছায় মিলিত হয় তাইলে সেটা ওদের দৃষ্টিতে দুইজনেরই অপরাধ। সুতরাং কোন নারী যদি ধর্ষণের অভিযোগ করে তখন ধর্ষকের সাথে সাথে সেই নারীটিকেও শাস্তি দেওয়া হয় বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া শারীরিক মিলন করার অপরাধে।

(৪)
এখন দেখেন আমাদের দেশে কি ছেলেদেরকে আদৌ শেখানো হয় যে নারীও একজন মানুষ, পুর্নাঙ্গ মানুষ, ওর শরীরের মালিক নারীটি নিজেই। না, এই শিক্ষা আমাদের দেশে ছেলেদেরকে শিক্ষা দেওয়া হয়না। পরিবার বলেন, স্কুল বলেন, কলেজ বলেন, সবখানেই পুরুষ মানুষটি জানে যে নারী ভোগের বস্তু। নৈতিকতা যেটা শিখানো হয় ছেলেদেরকে যে, নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কের আগে সামাজিক বৈধতা নিতে হবে। শিখানো হয় যে যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি নারীটিকে বিবাহ করে তোমার মালিকানায় পাচ্ছ ততক্ষণ পর্যন্ত সে তোমার জন্যে হারাম। মানে কি? মানে হচ্ছে তোমার মালিকানা না থাকলে নারীটিকে তুমি ভোগ করতে পারবে না।

কোথাও কেউ শিখায় না যে শারীরিক মিলনের জন্যে নারীর সম্মতিই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উল্টা শিখানো হয় যে তোমার বৌয়ের মালিক তুমি- ওর সম্মতির দরকার নাই। তোমার বৌ না হলে সেটা অন্যের মাল, ওটা খাওয়া যাবেনা।

আর নারীকে কি শিখানো হয়? না, তুমি একটি মাল, মানুষ নও। মাল মানে কি? বস্তু, ভোগের বস্তু। শিখানো হয় যে তুমি সাবধানে থাকবে, তোমাকে দুষ্ট পুরুষের দল খেতে চাইবে। তুমি নিজেকে ঢেকে ঢুকে রাখবে। যার সাথে তোমার বিবাহ হবে সেই একমাত্র তোমাকে ভোগ করতে পারবে। অন্য কেউ না। নারীকে শেখানো হয় যে শারীরিক মিলন ব্যাপারটা হচ্ছে পুরুষের আনন্দের ব্যাপার। তুমি কেবল পুরুষকে করতে দিবে। একজন নারীর জন্যেও যে শারীরিক মিলনটা একটা আনন্দের ব্যাপার এই ভাবনাটা ট্যাবু। নারী সঙ্গম করবে না, নারী পুরুষকে করতে দিবে।

আমাদের মেয়েদেরকে আমরা শিখাই যে কোন পুরুষ তোমাকে ভোগ করতে পারবে সেটার বিধান সমাজ করে রেখেছে। এর বাইরে কাউকে করতে দিবে না। তাইলে সেটা হবে জেনা। তাইলে তোমাকে দোররা মারা হবে। তুমি কার সাথে করতে চাও বা কার সাথে চাও না সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। যে স্বামীর কাছে তোমাকে দেওয়া হবে, সেই হবে তোমার মালিক আর সে তোমাকে যখন খুশী তখন যেভাবে খুশী সেভাবে করবে। ঐটা নাকি তার অধিকার- কেননা স্বামী তো মালিকই হয়ে গেল এই মালটার।

(৫)
এইখানেই মৌলিক সমস্যাটা। আমাদের সামাজিক শিক্ষায় আমরা নারীকে একজন মানুষ বিবেচনা করি না। আমরা নারীকে কেবল ভোগের বস্তুই মনে করি। না, আমাদের দেশে নারীরা প্রধানমন্ত্রী আছেন, স্পিকার আছেন, বিস্ববিদ্যালয়ের ভিসি আছেন, র‍্যাবের শুটার আছেন, সবই ঠিক আছে। আধুনিকতার জোয়ারে নারীরা বাইরে আসছে, কাজ কর্ম করছে। ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছেনা। কিন্তু পুরুষের চোখে নারীর স্ট্যাটাস কিন্তু পাল্টায়নি। এবং নারীদেরকেও আমরা শৈশব থেকেই পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিটাই শিখাচ্ছি।

আমরা শিখাচ্ছি যে নারীর গায়ে অন্যায়ভাবে একজন পুরুষ যদি হাত দেয়, তাতে নারীর ইজ্জৎ নষ্ট হয়। আমরা শিখাচ্ছি একজন নারী আর একজন পরুষ মিলিত হলে নারীটিরই শুধু সতীত্ব নষ্ট হয়। আমরা শিখাচ্ছি ধর্ষণের শিকার হলে নারীটি নষ্ট হয়ে গেল, যে দুধের বাতিতে কুকুর মুখ দিয়েছে। আমরা কি আমাদের ছেলেদেরকে শিখাচ্ছি যে একটা মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওর গায়ে হাত দিলে ছেলেটির ইজ্জৎ চলে যাবে? আমরা কি শিখাচ্ছি যে নারী পুরুষ পরস্পরের সম্মতিতে মিলিত হলে তাতে কারো সতীত্ব চলে যায়না? আমরা কেন শিখাচ্ছি না যে ধর্ষণের শিকার মেয়েটি কোনোভাবেই নষ্ট হয়ে যায়না? এই কথাটা শিখানো কি খুবই কঠিন যে নারী কোন ফল না বা খাবার না যে নারী নষ্ট হবে? নারীও মানুষ। এই জায়গাটাতেই ঠিক করেন। ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষা দেন যে নারী পুরুষ দুইই মানুষ। নারী মানুষ হিসাবে পুরুষের অধীন না বা পুরুষের ভোগের বস্তু না। মেয়দেরকেও এইটা শিখাতে হবে, যে তুমি কোন বস্তু না, তুমি কোন হিরা জহরত না। তুমি মানুষ, তোমার শরীর তোমার। ছেলেমেয়েদেরকে শিখাতে হবে যে সম্মতিটাই আসল। না মানে না। একজন যখন বলে ‘না’ তখন থামতে হবে।

মনে রাখবেন, পরিবারে আপনি যখন নারী শিশুটিকে নারী করে তোলার জন্যে নারীসুলভ শিক্ষা দিচ্ছেন, ঢেকে ঢুকে রাখতে হবে, সতীত্ব চলে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে ইত্যাদি, তখন কিন্তু আপনি আপনার পরিবারের ছেলে শিশুটিকে শিখাচ্ছেন যে ওর বোনটি কেবলই একটি মাল। ওর জন্যে হালাল না, কিন্তু ওর বোনটিও নিতান্তই একটি ভোগের বস্তু।

এইখানে হাত দেন। ধর্ষণ কমবে।

ইমতিয়াজ মাহমুদ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *