এটি আমাদের পরাজয় নয়


Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

IMG_3322  ইমতিয়াজ মাহমুদ

 

আমাকে ওরা ট্যাগ করেছে একটা পোস্টে। একটা কবিতা সেটা, যার বক্তব্য হচ্ছে আমরা সবাই হেরে গেলাম। বায়ান্ন হেরেছে, একাত্তর হেরেছে, আমরা সবাই হেরে গেছি ইত্যাদি। একজন ইনবক্সে বলেছেন, ‘খুব হতাশ লাগছে, অসুস্থ বোধ করছি।’ একজন রূপবতী শিক্ষিকা ম্যাসেজ করেছেন ‘ইমতিয়াজ ভাই, মূর্তিটা কি সরিয়েই দিল? সত্যি?’ বুঝতেই পারছেন, এগুলো হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিক্রিয়া। সরকার রোজার মাস শুরু হওয়ার আগের শুক্রবারেরর সকাল বেলাটায় সুপ্রিম কোর্টের সামনের অঙ্গনটা মূর্তিমুক্ত করেছে।

প্রথমেই বলে রাখি, গতরাতে সরকার যে ভাস্কর্যটি সরিয়েছে, সেটি আমার পরাজয় না। এটিকে আমি পরাজয় মনে করিনা। চোর যদি চুরি করে আপনার মূল্যবান সম্পদ নিয়ে যায় সেটি কি আপনার পরাজয়? ডাকাত যদি বন্দুক নিয়ে আপনার সন্তানকে হত্যা করে সেটি কি আপনার পরাজয়? একজন আইসিসের জ্বেহাদি যদি বোমা মেরে আমার বাড়ী উড়িয়ে দেয় সেটি কি আমার পরাজয়? না, এগুলো আমাদের পরাজয় নয়। আমরা হেরে যাইনি। আমাদের সাথে অপরাধ হয়েছে। আমরা আপরাধের  শিকার। আমরা প্রতারণার শিকার। আমাদের সম্পদ চুরি হয়েছে।

আফসোসের কথা, আমাদের সাথে এই প্রতারণাটা করেছে যারা, ওরা আমাদের অপছন্দের মানুষ না, আমাদের চিহ্নিত শত্রু না। অবশ্য, প্রতারণা মানেইতো আপনার সাথে মিথ্যা কথা বলে আপনাকে বিভ্রান্ত করা। এরপর আপনার ক্ষতিটা করা। আমাদের মূল্যবান সম্পদ চুরি করেছে আমাদের বন্ধু। এটা আফসোসের কথা। কিন্তু বন্ধু যদি তস্করে পরিণত হয় সেটিতো আপনার/আমার পরাজয় না। আমরা হেরে যাইনি। আমাদের স্বাধীনতাটি চুরি হয়েছে, এটি পরাজয় না। কেবল একটা কাজ বাড়ল, আবার স্বাধীনতাটা উদ্ধার করতে হবে।

(২)
শুনুন, এটি একটি মূর্তি সরানোর বিষয় না। এটি একটি চুরি। কি চুরি হল এখানে? আমার স্বাধীনতা। কিভাবে? বলতেই পারেন, যে একটা মূর্তি সরালে আমার স্বাধীনতা কিভাবে চুরি হয়? বা জিজ্ঞেস করতে পারেন, কে আমাদের সাথে কি এমন প্রতারণা করল?

চুরিটি কি বলি। এই যে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নিয়ে গেল, এটার কারণ কি? হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থী নানারকম সংগঠনের দাবী ছিল যে বাংলাদেশে যেহেতু মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেহেতু এই দেশে কোন মূর্তি স্থাপন করা যাবেনা। কেন? কারণ ইসলামে নাকি এরকম মূর্তি স্থাপন অনুমোদিত না। অনেকে এখানে মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য টানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মোল্লাদের মতে ভাস্কর্য আর মূর্তি এইগুলো সব একই। আর এসব ইসলামে নিষিদ্ধ। সরকার সেটা মেনে নিয়েছে এবং ফলে ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

দেখুন, একটি ভাস্কর্য বা মূর্তি রাখা বা সরানো নিয়ে কথা না। সুপ্রিম কোর্ট বা সরকার নিজস্ব বিবেচনায় যে কোন স্থাপনা প্রয়োজনে ভাঙতে পারেন বা স্থাপন করতে পারেন। কিন্তু আপনি যখন ওদের দাবীটি মেনে নিচ্ছেন তখন আসলে আপনি কি সিদ্ধান্ত নিলেন। আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে এই দেশে সখ্যাগুরুর পছন্দ না এরকম কোন কাজ করা যাবেনা। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ইসলাম অনুমোদন করেনা এরকম কোন কাজ বাংলাদেশে করা যাবেনা। এটিই হলো অন্যায়।

আমাদের দেশটা স্বাধীন হয়েছে তার মুল কারণ কি? আমরা বাঙালীরা যখন বুঝতে পারলাম যে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে একটি জাতী গঠিত হতে পারে না, তখনই আমরা পাকিস্তানের সাথে একসাথে থাকতে অস্বীকার করলাম। আমরা বললাম যে এই দেশ হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃস্টান সকলের। সবাই যার যার ইচ্ছেমতো যে কোন ধর্মীয় বিধান মানতে পারবে কিংবা অস্বীকার করতে পারবে। কেউ কাউকে বাধা দেবেনা। আর রাষ্ট্রের কাজ হবে সকলের এই অধিকারটুকু নিশ্চিত করা।

তাহলে আমার অধিকার আছে আমি ইচ্ছে করলে ইসলামী বিধান মানতেও পারি বা মানতে অস্বীকারও করতে পারি। আমি ইচ্ছে করলে অন্য যে কোন ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে পারি বা চাইলে সকল ধর্মকেও ত্যাগ করতে পারি। এটি আমার ইচ্ছে। এখন সরকার যখন স্বীকৃতি দিল যে সংখ্যাগুরুর পছন্দের ধর্মীয় বিধানের বিরোধী হয় এরকম কোন কাজ আমি করতে পারব না, তখন আমার এই অধিকারটুকু থাকে কোথায়? আমার সেই মুক্তিযুদ্ধের অর্জন যায় কোথায়? আমার জাতি গঠনের যে মৌলিক ভিত্তি সেটা কোথায় থাকে?

সুতরাং এটিই হলো চুরি। আমার অধিকার হলো চুরি, চুরি হলো আমার স্বাধীনতা, আর  চুরি হলো আমার জাতি সৃষ্টির যে মৌলিক ভিত্তি সেটি।

(৩)
আর প্রতারণাটি কি? প্রতারণাটি হচ্ছে, আমার মুক্তিযুদ্ধের মুল যে ভিত্তি সেটি হলো, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতি হবে না, সেই মতটার যে চ্যাম্পিয়ন দল, সেই দল ওদের পুরনো ট্রেড মার্ক ব্যাবহার করে আমাদের কাছ থেকে আমার মুক্তিযুদ্ধের অর্জনটা নিয়ে গেল। ওরা বাইরে দেখাচ্ছে সেক্যুলার, আর সেক্যুলার পরিচয়ে আমাদের কাছ থেকে ভোট নিল, সেই একই কথা বলে আমাদেরকে বারবার বলছে ওদেরকে যেন ক্ষমতায় রাখি। ওরা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে গিয়ে আমার অধিকারটি কেড়ে নেয়, তখন সেইটিতো আমার সাথে  প্রতারণাই।

এরা বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর রক্তের পরিচয় বহন করে, বঙ্গবন্ধুর মূল আদর্শটি জলাঞ্জলি দিয়ে দিল। এটি স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক প্রতারণা, রাজনৈতিক চুরি। এই প্রতারণা ও চুরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী। দলের নেতা ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এর সকল দায় দায়িত্ব অবশ্যই তাঁর নিজের।

ট্রাজেডি দেখুন,  বঙ্গবন্ধুর কন্যার দিকেই আঙ্গুল তুলে আজকে আমাকে বলতে হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের অধিকারটি আপনি চুরি করেছেন।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

Share on Facebook0Tweet about this on TwitterShare on Google+0Email this to someonePrint this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *