উৎসব, আবেগ আর শিকড়ের টান: ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার বর্ণাঢ্য সমাপ্তি
নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
সত্যবাণী
নিউ ইয়র্ক: উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ‘৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬’ অত্যন্ত উৎসবমুখর, প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্যপ রিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ মে (শুক্রবার) থেকে ২৫ মে(সোমবার) পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে (Jamaica Performing Arts Center) চার দিনব্যাপী প্রবাসী বাঙালিদের এই প্রাণের মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়।এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল– “যত বই তত প্রাণ’’। টানা দুই দিনের বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রতিদিন মেলা প্রাঙ্গণে ছিল সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়। সমাপনী দিনে আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে উজ্জ্বল রোদ ওঠায় দর্শনার্থীদের সমাগম ও বই বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা প্রবাসের মাটিতে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগেরই বহিঃপ্রকাশ।
প্রথম দিন (২২ মে, শুক্রবার): প্রাক–উদ্বোধন, স্মরণ ও বর্ণাঢ্য শুভ সূচনা
মেলার প্রথম দিনটি ছিল আবেগ এবং ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। বিকেল থেকেই নিউ ইয়র্কসহ দূর–দূরান্তের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য (যেমন: নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডা) থেকে বই প্রেমী, লেখক, পাঠক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা পরিবার–পরিজন নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ জড়ো হতে থাকেন।
প্রাক–উদ্বোধনী ও জন্ম শতবর্ষে গুণীজন স্মরণ পর্ব
আজ দখিন দুয়ার খোলা: সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের সামনের খোলা মাঠে ঐতিহ্যবাহী ঢোলের বাদ্যের মাধ্যমে প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বিশ্বজিত সাহার পরিকল্পনায় এবং মো. এহসান উদ্দিনের সঞ্চালনায় কোনো প্রকার পূর্ব–ঘোষণা ছাড়াই সরাসরি শুরু হয় সমবেত সংগীত। মালবিকা চ্যাটার্জির নির্দেশনায় ‘সংগীত সাধনা’র শিক্ষার্থীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন “আজি দখিন দুয়ার খোলা” এবং “বাউলা কে বানাইলো রে’’। সংগীতের এই আবহে পুরো প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে বাংলা সংস্কৃতির শিকড় ও লোকঐতিহ্য।
বিনম্র নিবেদন ও মোমবাতি প্রজ্বলন: ‘আগুনের পরশমণি’র আবহ সংগীতের সাথে স্মারকচিত্রে মোমবাতি প্রজ্বলন করে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তিন মহান ব্যক্তিত্ব– মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায় চৌধুরী–এর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। মোমবাতি প্রজ্বলন করেন ইমদাদুল হক মিলন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও নজরুল ইসলাম। স্মৃতিচারণ ও পাঠ: ‘বিনম্র নিবেদন’ পর্বে রোকেয়া রফিক বেবী কথা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর রচনার অংশবিশেষ এবং শহিদুল আলম সাচ্চু ইতিহাসবিদ তপন রায় চৌধুরীর ‘বাঙাল নামা‘ থেকে পাঠ করেন। এছাড়া শামসুদ্দীন আবুল কালাম স্মরণে সংগীত পরিবেশন করেন পাপি মনা ও তাঁর দল।
নৃত্যানুষ্ঠান: চন্দ্রা ব্যানার্জির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ‘নৃত্যাঞ্জলি’র শিল্পীরা “আলোকের এই ঝরনা ধারায়”, “হৃদয় আমার নাচেরে” এবং “বাগিচায় বুলবুলি তুই” গানের সঙ্গে মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করেন।
বইমেলায় আহ্বান: অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মহিতোষ তালুকদার তাপস “নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে বইমেলায় যাব গো” স্লোগানে দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে পুরো বইমেলা প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করেন, যা মেলায় এক প্রাণবন্ত ও উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি তিনি সমবেত কণ্ঠে “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” গানটির পরিবেশনায় নেতৃত্ব দেন, যা পুরো আয়োজনকে আরও আবেগঘন ও উদ্দীপনাময় করে তোলে।
মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও মঙ্গল প্রদীপ
প্রাক–উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ওসাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন ফিতা কেটে ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
৩৫ বছরের মাইলফলক
মেলার ৩৫ বছর পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বইমেলা প্রাঙ্গণের মূল প্রবেশ পথে বাংলা ও ইংরেজি– দুই ভাষায় তুলে ধরা হয় নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। সেখানে ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতি বছরের উদ্বোধকদের নাম, ছবি ওপরিচিতি নান্দনিক বিন্যাসে প্রদর্শন করা হয়। বর্ণিল এই প্রদর্শনী শুধু দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণই করেনি, বরং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রবাসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক অভিযাত্রার এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন
প্রাক-উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং উদ্বোধকের ঘোষনার পর মিলনায়তনে দেশ–বিদেশের খ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, প্রকাশক ও গুণীজনসহ মোট ৩৫ জন সম্মাননীয় অতিথি একসঙ্গে মেলার ‘মঙ্গলপ্রদীপ’ প্রজ্বলন করেন। এরপর আমন্ত্রিত অতিথি ও দর্শকবৃন্দ সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, ড. দীপেন ভট্টাচার্য, সিনিয়র সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, কবি সুবোধ সরকার, ফারুক মঈনউদ্দীন, জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন, প্রকাশক মনিরুল হক, অধ্যাপক মোস্তফা সারওয়ার, জাফর আহমদ রাশেদ, গৌতম দত্ত, শামস আল মমীন, ফারুক আহমেদ, রোকেয়া হায়দার, ফেরদৌস সাজেদীন, খোরশেদুল ইসলাম, আশরাফ কায়সার, গোলাম ফারুক ভূঁইয়া, রাজু আলাউদ্দিন, সৈয়দ জাকি হোসেন, বিরূপাক্ষ পাল, নজরুল মিন্টু, আশরাফ আহমেদ, মহিতোষ তালুকদার তাপস, মেজবাহ উদ্দিন আহমদ, হুমায়ূন কবীর ঢালী, জহিরুল আবেদীন জুয়েল, জসিম উদ্দিন, সজল আহমেদ, রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল, দীপংকর তালুকদার, রতন চন্দ্রপাল এবং নাহিদা আশরাফী প্রমুখ।
উদ্বোধনী আলোচনা ও আজীবন সম্মাননা
প্রধান অতিথির বক্তব্য: প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন,“গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে; আগামী ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা এদেশের সমাজ–সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে।” তিনি ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করে আজকের প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস চর্চার মধ্য দিয়ে জাতীয় ইতিহাসের বহু বিতর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যের প্রয়াস চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।
বিশেষ সংলাপ: বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বর্তমান বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের একটি অংশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলেরপ্রতি সমর্থন জানানোর প্রবণতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশকরেন। রেহমান সোবহান ও রওনক জাহানের এই বিশেষ সংলাপ পর্বটি সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বানকারী ড.নজরুল ইসলাম।
বিশ্বজিত সাহাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও বিশেষ সম্মাননা
মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিত সাহা–এর ঐতিহাসিক অবদানকে সম্মান জানিয়ে প্রথম দিনেই একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন প্রামাণ্যচিত্র (Documentary) প্রদর্শন করা হয়। এতে দেখানো হয়, কীভাবে ১৯৯২ সালে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, অত্যন্ত সীমিত পরিসরে তিনি নিউ ইয়র্কে এই বইমেলার বীজ বপন করেছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘ ওনিরলস পথচলাকে সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।