ডলারের পতনের ঘনঘটা: ব্রিকসের পালে হাওয়া

চৌধুরী ফরহাদ

আমেরিকার একটা দারুণ রোগ আছে—পৃথিবীর কোথাও একটু শান্তি দেখলেই তাদের হাত-পা নিশপিশ করে।তখন তারা সেখানে গণতন্ত্র ফেরি করতে বের হয়।আর তাদের এই গণতন্ত্রের বাক্সে কী থাকে? থাকে বারুদ, ড্রোন আর যুদ্ধবিমান।ইরাকের কথাই ধরুন। সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে—এই ধোঁয়া তুলে তারা পুরো দেশটা ছারখার করে দিল।পরে দেখা গেল,মারণাস্ত্র তো দূরের কথা,সাদ্দামের পকেটে একটা সাধারণ দেশলাইও ঠিকমতো ছিল না।কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে—তেলসমৃদ্ধ একটা দেশ এখন লাশের স্তূপ।এরপর আসুন লিবিয়ায়।গাদ্দাফিকে সরিয়ে তারা এমন এক গণতন্ত্র দিল যে,আজ এক দশক পরও লিবিয়ার মানুষ জানে না তাদের আসল সরকার কোনটা।আফগানিস্তানের কথা তো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়।বিশ বছর ধরে সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে,লাখ লাখ মানুষ মেরে,শেষমেশ এক রাতে মার্কিন সেনারা ল্যাজ গুটিয়ে পালাল।আর ক্ষমতা কার হাতে দিয়ে গেল? যাদের তাড়াতে এসেছিল, সেই তালেবানদের হাতেই! একেই বলে- মহৎ উদ্দেশ্য।

শুধু যুদ্ধবিগ্রহ নয়, আমেরিকার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো তাদের স্যাংকশন বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। কোনো দেশ তাদের কথায় না নাচলেই তারা তার ব্যাংকের চাবি বন্ধ করে দেয়। কিউবা, ইরান, ভেনিজুয়েলা—এই দেশগুলোকে তারা বছরের পর বছর ভাতে মারার চেষ্টা করছে। তাদের এই ‘স্যাংকশন কালচার’ এখন এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, পৃথিবীর অর্ধেক দেশই এখন আমেরিকার ব্ল্যাকলিস্টে পড়ার ভয়ে কাঁপে। এই যে বিশ্বজুড়ে একটা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, এটার বিরুদ্ধেই এখন মানুষের ক্ষোভ দানা বাঁধছে।নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধের এই খেলা খেলতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে আমেরিকা এখন হাসপাতালের আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে।পুরো দুনিয়ার বাণিজ্য চলে একটা কাগজের নোটের ওপর ভিত্তি করে—তার নাম মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ডলার হয়ে উঠেছে পৃথিবীর অলিখিত রাজা।আপনি যদি বাংলাদেশ থেকে আমদানির জন্য কোনো জিনিস কিনতে চান,আপনাকে ডলার দিতে হবে। আপনি যদি সৌদি আরব থেকে তেল কিনতে চান,তাও ডলারে কিনতে হবে।আমেরিকা এই সুযোগটারই অপব্যবহার করেছে। তারা যখন খুশি তখন টাকা ছাপে,আর তাদের দেশের মূল্যস্ফীতি পুরো পৃথিবীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে গিয়ে আমেরিকা রাশিয়ার ৩০০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ এক ঝটকায় ফ্রিজ করে দিল। এই ঘটনা দেখে পৃথিবীর বাকি দেশগুলোর চোখ চড়কগাছ! সবাই ভাবল,“আজ রাশিয়ার টাকা আটকেছে, কাল তো আমার টাকাও এভাবে মেরে দিতে পারে!

ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম অস্থিতিশীল।ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে, আর আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর টাকার মান কমছে।জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। বিশ্ব বাণিজ্য এখন আর মুক্ত বাণিজ্য নেই,এটা হয়ে গেছে আমেরিকার পকেটের খেলনা।এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে বাঁচতেই দুনিয়ার মানুষ এখন বিকল্প খুঁজছে।ঠিক এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতির মধ্যেই আশার আলো হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্রিকস (BRICS)।ব্রাজিল,রাশিয়া, ইন্ডিয়া,চীন আর সাউথ আফ্রিকা—এই পাঁচ দেশের হাত ধরে যে জোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল,তা এখন আর ছোট নেই। এবার এই জোটের পরিধি আরও বাড়ছে। এবারের ব্রিকস সম্মেলন তাই শুধু এক টেবিলে বসে চা-বিস্কুট খাওয়ার আড্ডা নয়, এটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গালে একটা বড়সড় থাপ্পড় দেওয়ার প্রস্তুতি।এবারের সম্মেলন থেকে কী কী বড় সিদ্ধান্ত আসতে পারে,তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সবচেয়ে বড় যে আলোচনাটা বাতাসে ভাসছে, তা হলো ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার বর্জন। ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে নিজেদের মুদ্রায় ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত পাকা করছে। যেমন চীন ও রাশিয়া এখন রুবল আর ইউয়ানে বাণিজ্য করছে। ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রুপিতে তেল কিনছে।এবারের সম্মেলনে আরও বড় সিদ্ধান্ত আসতে পারে ব্রিকসের নিজস্ব একটা সাধারণ মুদ্রা (Common Currency) চালুর ব্যাপারে। যদি এটা সত্যি সত্যি ঘটে,তবে ডলারের সাম্রাজ্যে ধস নামা কেবল সময়ের ব্যাপার। এছাড়া, ব্রিকসের নিজস্ব ব্যাংক ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (NDB)-কে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে, যাতে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের কড়া শর্তযুক্ত ঋণের মুখে ছাই দিয়ে গরিব দেশগুলো এখান থেকে সহজে ঋণ পেতে পারে। এক কথায়, এবারের সম্মেলন বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন একাধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার আয়োজন করছে।

ইতিহাসের একটা অমোঘ নিয়ম আছে—যে রাজবংশ বা সাম্রাজ্যই আসুক না কেন, তার পতন নিশ্চিত। রোমান সাম্রাজ্য গেছে,ব্রিটিশদের সূর্য অস্ত গেছে,এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদেরও বিদায়ঘণ্টা বাজছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সেই আগের অর্থনৈতিক পরাশক্তি নেই। তাদের নিজেদের ঋণের বোঝা এখন ৩৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি! তাদের সমাজ বিভক্ত, রাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই পতনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা বা মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড। আগে দুনিয়া ছিল একমেরু বিশিষ্ট—আমেরিকা যা বলত, সেটাই আইন।এখন দুনিয়া হবে বহুমেরু বিশিষ্ট।চীন হবে অর্থনৈতিক পরাশক্তি,রাশিয়া সামরিক দিক থেকে প্রভাব ধরে রাখবে, ব্রিকস হবে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর।এই নতুন বিশ্বব্যবস্থায় কোনো একজন নির্দিষ্ট মোড়ল থাকবে না।ক্ষমতা ভাগাভাগি হয়ে যাবে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে। এটা শুনতে যতটা ভালো শোনায়, রূপান্তরকালটা কিন্তু ততটাই বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ, ডুবন্ত বাঘ কিন্তু মরণকামড় দিতে পছন্দ করে।

এই যে হাতির লড়াই, এর মধ্যে শ্যাওলার কী দশা হবে? অর্থাৎ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা কী হবে? সত্যি কথা বলতে,পরিস্থিতি বেশ নাজুক।আমরা না পারছি আমেরিকার হাত ছাড়তে,না পারছি ব্রিকসের ট্রেন মিস করতে।আমেরিকার তৈরি করা বর্তমান ব্যবস্থায় আমরা এমনভাবে জড়িয়ে আছি যে, হুট করে ডলারের ব্যবহার বন্ধ করলে আমাদের অর্থনীতি থমকে যাবে।আবার আমেরিকার কথামতো চলতে গেলে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে, স্যাংকশনের ভয় থাকে, চড়া সুদে আইএমএফের দাসত্ব করতে হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো এখন এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, রিজার্ভ কমছে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ধনী দেশগুলো নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত, আর গরিব দেশগুলো ঋণের জালে তলিয়ে যাচ্ছে।

তাহলে এই বৈশ্বিক দাবা খেলায় বাংলাদেশের মতো দেশের করণীয় কী? একজন প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি, আমাদের এখন অত্যন্ত চতুর এবং সাহসী হতে হবে। বোকার মতো কোনো এক পক্ষের অন্ধ গোলাম হওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলে গেছেন—‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’। এই নীতিটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল।

প্রথমত,আমাদের ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি’ (Balanced Diplomacy) বজায় রাখতে হবে। আমেরিকার বাজারে আমাদের তৈরি পোশাক যায়, তাই তাদের চটানো যাবে না। আবার আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনের টাকা আর সস্তা জ্বালানির জন্য রাশিয়ার সহযোগিতা দরকার। সুতরাং, আমাদের এমনভাবে চলতে হবে যেন সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।

দ্বিতীয়ত,আমাদের ‘ডলার পরনির্ভরশীলতা’ কমাতে হবে। ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য পদ আমরা অলরেডি পেয়েছি, এটাকে কাজে লাগাতে হবে। বিকল্প মুদ্রায় বা কারেন্সি সোয়াপের (Currency Swap) মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। ভারতের সাথে রুপিতে বা চীনের সাথে ইউয়ানে বাণিজ্যের পরিধি আরও বাড়াতে হবে, যাতে ডলারের ওপর চাপ কমে।

তৃতীয়ত,নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে হবে। পরনির্ভরশীলতা কমানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো নিজের পায়ে দাঁড়ানো। কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং স্থানীয় শিল্পকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে যেন বাইরের কোনো নিষেধাজ্ঞায় আমাদের পেটে লাথি না পড়ে।

পৃথিবী বদলাচ্ছে। যে আমেরিকা একসময় পুরো দুনিয়াকে নিজের আঙুলের ইশারায় নাচাত, আজ তারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে মক্কা জোট বা প্রক্সি ওয়ারের মতো সস্তা চাল চালছে। কিন্তু জোয়ারের জল যেমন আটকে রাখা যায় না, তেমনি ইতিহাসের পরিবর্তনকেও রোধ করা যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পতন আজ হোক বা কাল—অবশ্যম্ভাবী।একটি নতুন, বহুমেরু কেন্দ্রিক ও প্রগতিশীল বিশ্বব্যবস্থার উদয় হচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে চোখ-কান খোলা রেখে নিজের স্বার্থ সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। আবেগ দিয়ে নয়, ঠান্ডা মাথার বাস্তবসম্মত ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিই পারে আমাদের এই বৈশ্বিক ঝড় থেকে রক্ষা করতে। মোড়লদের দাদাগিরি চলতেই থাকবে, কিন্তু আমাদের টিকে থাকার লড়াইটা আমাদের নিজেদেরই লড়তে হবে।

লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী।

You might also like