মহান মে দিবসের চেতনা ও বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ: সংকট ও উত্তরণ
চৌধুরী ফরহাদ
১৮৮৬ সালের ১লা মে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকদের বুকের রক্তে ভেজা দিনটি আজ বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের অক্ষয় প্রতীক। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে মুখরিত এই দিনটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়,বরং এটি শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের এক রক্তঝরা ইতিহাস।১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১লা মে-কে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্তের পর থেকে আজও বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
শ্রমজীবী মানুষ বলতে আমরা কাদের বুঝি?
সহজ কথায়, যারা নিজেদের কায়িক বা মানসিক শ্রম অন্যের কাছে বিক্রয় করে জীবনধারণ করেন, তারাই শ্রমজীবী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শ্রমজীবী মানুষের পরিসর অত্যন্ত বিশাল। এর মধ্যে যেমন রয়েছেন— গার্মেন্টস শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, চা-শ্রমিক, কৃষি মজুর, মৎস্যজীবী, রিকশা ও পরিবহন শ্রমিক; তেমনি সেবা খাতের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, সংবাদপত্রের হকার, ডেলিভারি রাইডার ও হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মীরাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক খাতের নিম্নপদে কর্মরত কেরানি, পিয়ন, সিকিউরিটি গার্ড এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরাও শ্রমজীবী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।মূলত যারা মেধা বা শ্রম দিয়ে উৎপাদনের চাকা ও সেবার মান সচল রাখেন কিন্তু নিজেরা উৎপাদনের উপায়ের মালিক নন, তারাই এদেশের অর্থনীতির মূল কারিগর।
শ্রমজীবী মানুষের পুঞ্জীভূত সমস্যা
বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিকের অধিকার স্বীকৃত থাকলেও স্বাধীনতার পাঁচ দশকেও এক বিশাল জনগোষ্ঠী মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বর্তমানে আমাদের শ্রমিকরা প্রধানত তিনটি সংকটে জর্জরিত:
মজুরি বৈষম্য: উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বর্তমান ন্যূনতম মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের জীবন ধারণ প্রায় অসম্ভব।
নিরাপত্তাহীনতা: রানা প্লাজা বা তাজরীন ফ্যাশনের স্মৃতি আজও আমাদের তাড়া করে। কলকারখানায় অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধসের ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবহেলা: এদেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে (যেমন- গৃহকর্মী, দিনমজুর) কাজ করেন, যাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা আইনি সুরক্ষা নেই।
বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষ ও বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিশেষ করে পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ এক উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে পিষ্ট শ্রমিক যখন তার ন্যায্য মজুরি পায় না বা মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকে, তখন সে অস্তিত্বের টানে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়। বর্তমান বাস্তবতা হলো— অনেক কারখানায় বেতন-ভাতা বকেয়া রাখা এবং ঠুনকো অজুহাতে কারখানা বন্ধ (লে-অফ) করে দেওয়া শ্রমিকদের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে। মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সংলাপের অভাব এই অসন্তোষকে আরও উসকে দিচ্ছে। প্রায়শই দেখা যায়, শ্রমিকের যৌক্তিক দাবিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের জন্য আত্মঘাতী। শ্রমিকরা রাজপথে নামলে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তার দায় কেবল শ্রমিকের ওপর চাপানো অন্যায্য; বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং মালিকপক্ষের একরোখা মানসিকতাই এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।
বঞ্চনা থেকে মুক্তির দাবিদাওয়া
একটি মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিনের কিছু মৌলিক দাবি জানিয়ে আসছে:দ্রব্যমূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে ‘রেশনিং ব্যবস্থা’ চালু করা।প্রতিটি কারখানায় অবাধে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।কর্মস্থলে মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের শিকার হলে আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ প্রদান।নারী শ্রমিকদের জন্য ৬ মাসের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি ও নিরাপদ শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন।
সমাধানের পথ: কেমন বাংলাদেশ চাই?
শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে হলে কেবল দিবস পালন যথেষ্ট নয়। সরকারকে বাজারদরের সাথে মিল রেখে নিয়মিত মজুরি বোর্ড গঠন করতে হবে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জন্য সুলভ মূল্যে আবাসন ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শ্রমিকদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই- শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দেওয়া যেমন নৈতিক বিধান, তেমনি শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা মহান মে দিবসের মূল শিক্ষা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারিগর এই বিশাল শ্রমশক্তিকে অবহেলিত রেখে একটি বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়। তাই মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছাই পারে মে দিবসের রক্তভেজা চেতনাকে সার্থক করতে।
লেখক পরিচিতি: প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী।