মুখে মধু অন্তরে বিষ: দ্বিমুখী স্বভাব ও আমাদের নৈতিক অবক্ষয়
◾চৌধুরী ফরহাদ◾
সমকালীন সমাজে মানুষের আচরণের গতিপ্রকৃতির দিকে তাকালে একটি চিরন্তন প্রবাদ বারবার মনে পড়ে—‘মুখে মধু অন্তরে বিষ’। মানুষের এই কপট স্বভাব বা তীব্র ভণ্ডামিকে বোঝাতে বিশ্বসাহিত্যেও অবিকল তুলনা রয়েছে। ইংরেজিতে যেমন দুটি প্রবাদ বহুল ব্যবহৃত—একটি হলো ‘An angel face with a devil’s mind’ (শয়তানের মন নিয়ে দেবদূতের মতো মুখাবয়ব), আর অন্যটি হলো ‘A wolf in sheep’s clothing’ (ভেড়ার চামড়া গায়ে নেকড়ে)। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের বাস্তবতায় এই প্রবাদগুলো কোনো দূরবর্তী উপমা বা নিছক রূপক নয়, বরং আমাদের আটপৌরে সমাজ ও চেনা মানুষের এক চরম ও নগ্ন সত্য প্রতিচ্ছবি।বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও করপোরেট সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যায়, মানুষের প্রকাশ্য মিষ্টি আচরণ এবং ভেতরের আসল অভিসন্ধির মধ্যে এক সুবিশাল ও অন্ধকার ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীকে জড়িয়ে ধরে আকাশচুম্বী প্রশংসা করার পরক্ষণেই তার ক্যারিয়ার ধ্বংসের নিখুঁত জাল বোনা এখন পেশাদার জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে পরম ধার্মিক ও সৎ সেজে ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে মারাত্মক ভেজাল মেশানো কিংবা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার উৎসব চলছে। এমনকি যে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল কেবলই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সেই পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনগুলোর মধ্যেও এই দ্বিমুখী রূপ আজ অবলীলায় দৃশ্যমান। সামনে পরম হিতৈষী সেজে পেছনে ভাই ভাইয়ের সম্পত্তি আত্মসাৎ করছে কিংবা পরম বন্ধুর আড়ালে কুৎসা রটনা করে তার সংসার ভাঙার ফাঁদ পাতছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই কপটতা এবং দ্বিমুখী আচরণের মূল উৎস হলো সামষ্টিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়। অতিরিক্ত ব্যক্তিস্বার্থ, রাতারাতি অবৈধ উপায়ে ধনী বা সফল হওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক ও আইনি জবাবদিহিতার তীব্র অভাব মানুষকে এই ছলনাময় পথে ঠেলে দিচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও অপরাধের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, সমাজে হিংস্রতা, প্রতারণা ও সামাজিক অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। একটি জাতীয় দৈনিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে পারিবারিক কলহ এবং নিকটাত্মীয় বা পরিচিতদের দ্বারা প্রতারণা ও অপরাধের হার বিগত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে (দৈনিক প্রথম আলো, মে ২০২৬)। এই কপটতার সবচেয়ে বড় খেসারত হলো মানুষের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস ও ভরসা পুরোপুরি উঠে যাওয়া, যা একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য সমাজের মেরুদণ্ডকে ভেতর থেকে ঝাঁঝরা করে দেয়।
এই সামাজিক পতন ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় রোধ করতে হলে আমাদের মানবিক ও ধর্মীয় মৌলিক মূল্যবোধের প্রকৃত চর্চায় ফিরে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি প্রধান ধর্মেই মুখের মিষ্টি কথা ও অন্তরের কলুষতার এই অমিলকে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে এই দ্বিমুখী স্বভাবের মানুষকে ‘মুনাফিক’ হিসেবে কঠোরভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পবিত্র কোরআনে এদের স্থানকে নরকের সর্বনিম্ন স্তরে ঘোষণা করে এই মানসিকতাকে অন্যতম বড় আত্মিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে (আল-কোরআন, সূরা আন-নিসা: ১৪৫)। একইভাবে সনাতন ধর্মে অন্তরের শুদ্ধতা ও ‘সত্যবাদিতা’র ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মহাভারতে কপট আচরণকে বিনাশের মূল কারণ বলা হয়েছে। খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্মেও পরনিন্দা, ছলনা বর্জন এবং অহিংস ও সরল হৃদয়ের মানুষ হওয়ার প্রতি সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।আজকের দিনে কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মোড়কে ধর্মকে সীমাবদ্ধ না রেখে, তার আসল অন্তর্নিহিত শিক্ষা তথা সততা, পরার্থপরতা ও সরলতাকে নিজের চরিত্রে ধারণ করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আমাদের সামগ্রিক সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যেখানে কেবল জিপিএ-৫ বা বস্তুগত সাফল্যই একমাত্র পরিমাপক হবে না, বরং একজন ভালো ও সৎ মানুষ হওয়াটাই হবে সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। সমাজে যদি আমরা আবার পারস্পরিক বিশ্বাস,পরমতসহিষ্ণুতা ও সত্যিকারের মানবিক বন্ধন ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে আমাদের চেহারায় সেঁটে থাকা এই দ্বিমুখী মুখোশগুলো সবার আগে খুলে ফেলতে হবে। প্রত্যেকের নিজস্ব আত্মশুদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধের সামষ্টিক জাগরণই পারে আমাদের সমাজকে এই গভীর নৈতিক সংকট থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে।
লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।