হাওরের দুঃখের সুদীর্ঘ রজনী: অবসানে আর কত অপেক্ষা?
চৌধুরী ফরহাদভাটি বাংলার দিগন্তবিস্তৃত হাওর অঞ্চল যেন প্রকৃতির এক অপার রহস্য আর রূপের আঁধার।বছরের একটা বড় সময় জুড়ে যেদিকে চোখ যায়,শুধু অথৈ জলরাশি আর ঢেউয়ের খেলা।কিন্তু এই মায়াবী রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক সুদীর্ঘ ও নীরব কান্নার ইতিহাস।বর্ষায় সাগরসদৃশ আর শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ শ্যামল শস্যক্ষেত।বৃহত্তর ভাটির হাওরাঞ্চলের ৭টি জেলার ৪৯টি উপজেলার এই জনপদে প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস।প্রকৃতি যেখানে অকৃপণ হাতে তার সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে,আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের অবহেলা সেখানে ততটাই নির্মম।স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও যখন আমাদের প্রশ্ন করতে হয়—হাওর জনপদের মানুষদের দুঃখের সুদীর্ঘ রজনীর অবসান কবে ঘটবে? তখন তা সামগ্রিক উন্নয়ন ভাবনার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দেয়।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাওর অঞ্চলে উন্নয়নের এক মহাযজ্ঞ আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এই উন্নয়ন কতটা হাওরবান্ধব,আর কতটা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো—তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।উন্নয়নের নামে যত্রতত্র অপরিকল্পিত সড়ক ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। নদী ও জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে তৈরি করা এই অবকাঠামোগুলো এখন ভাটির বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক জলজ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় এর চরম কুপ্রভাবের শিকার হচ্ছেন সাধারণ কৃষক,প্রান্তিক মৎস্যজীবী এবং হাওর জনপদের সর্বসাধারণ।যে হাওর ছিল মাছের অফুরন্ত ভাণ্ডার এবং জীববৈচিত্র্যের চারণভূমি,তা আজ হুমকির মুখে।স্থানীয় জাতের বহু মাছ ও জলজ উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির পথে।জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কার পাশাপাশি এই মানবসৃষ্ট দুর্যোগ হাওরবাসীর জীবনকে আরও বিপন্ন করে তুলেছে।আগাম বন্যায় যখন কৃষকের একমাত্র ফসল বোরো ধান তলিয়ে যায়,তখন তাদের ঘরে আর অন্নের সংস্থান থাকে না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে,স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও হাওরের মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর কোনো স্থায়ী ও টেকসই উন্নয়ন হয়নি।আজও হাওরের দুর্গম জনপদগুলোতে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।বর্ষাকালে কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারী কিংবা গুরুতর অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার নৌকা আর ট্রলারে পাড়ি দিতে হয়।অনেক সময় পথেই নিভে যায় তাজা প্রাণ।শিক্ষার আলো পৌঁছানোর দাবি করা হলেও তা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। হাওরের দরিদ্র মানুষের সন্তানদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে কিছু বিদ্যালয় গড়ে উঠলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারিভাবে কার্যকর কোনো কর্মসূচি দৃশ্যমান নয়। শিক্ষকদের সংকট,প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিকূলতার কারণে ঝরে পড়ার হার এখানে উদ্বেগজনক।এর ওপর উচ্চ শিক্ষালাভের কোনো সুনির্দিষ্ট ও সহজলভ্য ব্যবস্থা না থাকায় হাওরের তরুণ প্রজন্ম মূলধারার প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
হাওরকে বাঁচাতে হলে এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাগ্যবদল করতে হলে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।এখানে যেমন কৃষি ও পরিবেশবান্ধব টেকসই শিল্পায়ন দরকার, ঠিক তেমনি হাওরের অনন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা এবং কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তি ও ঋণ সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। হাওরের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক।এর যেকোনো একটিকে বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব। বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রান্তিকতা ও অবহেলার অবসান ঘটাতে এখন একটি সমন্বিত ও বিশেষায়িত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।ঠিক যেভাবে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি হাওরাঞ্চলের টেকসই ও প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এখন একটি স্বাধীন ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি নিবেদিত মন্ত্রণালয় থাকলে হাওরের পরিবেশ রক্ষা,বন্যা নিয়ন্ত্রণ,মৎস্য সম্পদের টেকসই ও আধুনিক আহরণ,পর্যটনের বিকাশ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বিশেষায়িত সুযোগ সৃষ্টি করা সহজ হবে।যত্রতত্র বাঁধ বা রাস্তা না বানিয়ে পরিবেশবিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব উড়াল সড়ক বা নৌপথের আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে।হাওরের মানুষের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অপরিহার্য।রাষ্ট্র যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে চায়,তবে হাওরের বিশাল জনসংখ্যা ও তার অমূল্য সম্পদকে এভাবে অরক্ষিত রাখা যাবে না।নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, হাওর বাঁচলে তবেই বাঁচবে এ দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ।আমরা আশা করি, হাওরবাসীর এই যৌক্তিক দাবি পূরণ হবে এবং তাদের জীবনের দীর্ঘ অন্ধকারের অবসান ঘটে এক নতুন ভোরের সূচনা হবে।
লেখক পরিচিতি: কলামিস্ট ও সমাজকর্মী।