১৭ মাস ধরে বন্ধ দেশের একমাত্র মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা জাদুঘর, চালুর উদ্যোগ নেই

নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী

খুলনা: মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার দুর্লভ সংগ্রহ নিয়ে খুলনা নগরীর সাউথ সেন্ট্রাল রোডে তৈরি হয় দেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর।২০২৪ সালে প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয় করে সেখানে আধুনিক জাদুঘর ভবন নির্মাণ করে সরকার।ওই বছরের মে মাসে দৃষ্টিনন্দন জাদুঘর ভবনটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।এটি চালু ছিল মাত্র এক মাস।২০২৪ সালের ২০ জুলাই সংস্কার কাজ করা ও কারফিউর কারণে জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলনের কারণে সেটি আর চালু হয়নি।৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে জাদুঘরের সামনে একটি হাসপাতালে ভাঙচুর চালায় বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা।তখন জাদুঘরের প্রধান ফটকও ভাঙচুর হয়।গণঅভ্যুত্থানের পর নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রধান ফটক টিন ও বাঁশ দিয়ে বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।গত ১৭ মাসেও সেই তালা খোলা হয়নি।এখন পুরো জাদুঘর বন্ধ।

জাদুঘরের ভেতরে মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা,শহীদদের চিঠিসহ ১৯২ ধরনের নিদর্শন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সাড়ে তিন শতাধিক ছবিও আছে। আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে ১০ হাজারের বেশি ছবি, দুই হাজারের মতো ভিডিওসহ অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য নথি। তালাবদ্ধ থাকায় অধিকাংশ নিদর্শনই নষ্ট হচ্ছে।জাদুঘর-সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রধান ফটক মেরামতের জন্য গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। জাদুঘর ও আর্কাইভ পরিচালনার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই টাকাও ছাড় হয়নি। এতে আর্থিক সংকটে প্রথম পর্যায়ে আট কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়। নিরাপত্তা, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে জাদুঘরটি এখন বন্ধ রয়েছে।

১৯৭১ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় গণহত্যার তথ্য নতুন প্রজন্মসহ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে ২০১৪ সালে খুলনায় গড়ে তোলা হয় ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। শুরুতে নগরীর শেরেবাংলা রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে আর্কাইভ ও জাদুঘরের কার্যক্রম শুরু হয়। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এর প্রধান উদ্যোক্তা। ট্রাস্টি বোর্ডের নামে ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের সুদ, বই বিক্রি ও সরকারি অনুদান থেকে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। শুধু বাংলাদেশই নয়, এশিয়ায় এ ধরনের জাদুঘর এটাই প্রথম।২০১৫ সালে জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে নগরীর ২৬, সাউথ সেন্ট্রাল রোডে জমিসহ একটি বাড়ি বরাদ্দ দেয় সরকার। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে সেখানে প্রায় ৩২ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে ছয়তলা ভবন নির্মাণ হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থে গণপূর্ত অধিদপ্তর ভবনটি নির্মাণ করে।খুলনার দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয়।

গত বছর চালু থাকা অবস্থায় জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে বাড়িতে প্রিয়জনদের উদ্দেশে লেখা শহীদদের চিঠি, তাদের পোশাক, ডায়েরি, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র, রাজাকার ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা নির্যাতনের সরঞ্জাম, মুক্তিযুদ্ধকালীন অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য নথি সাজিয়ে রাখা। গ্যালারিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের লেখা দুই লাইনের একটি চিঠি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ত।একাত্তরের উত্তাল-অস্থির সময়ে স্ত্রীকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘জোহুরা, পারলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেয়ো।’ সে সময়ের বকমার্কা সিগারেটের (করহমঝঃড়ৎশ) প্যাকেটের গায়ে লেখা চিঠিটি সাজানো ছিল ১ নম্বর গ্যালারিতে।সম্প্রতি জাদুঘরে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবেশমুখে মুক্তিযুদ্ধে নৃশংস গণহত্যার সাক্ষী প্লাটিনাম জুট মিলের বয়লার। এই বয়লারে ফেলে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষকে। জাদুঘরের প্রবেশপথটি টিন ও বাঁশ দিয়ে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া রয়েছে। ফটকের পাশে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসংবলিত টেরাকোটা অযত্নে পড়ে আছে। গণহত্যার শিকার এক রিকশাচালকের অবয়ব ঢেকে আছে লতাপাতায়।আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্টি সম্পাদক ডা. বাহারুল আলম বলেন, ‘রাজনৈতিক কারণে জাদুঘরের অনুদান ও চালুর উদ্যোগ বন্ধ। এটি চালু করতে আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। জাদুঘরে একাত্তার, নব্বই, চব্বিশ– সব গণআন্দোলনের ইতিহাস রাখার প্রস্তাব দিয়েছি।তেমন আশানুরূপ সাড়া পাইনি।’

তিনি বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডই জাদুঘর পরিচালনা করে।বিদ্যুৎ বিল,স্টাফ বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বছরে ৬০-৬৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়।সরকারিসহ সব ধরনের অনুদান বন্ধ। চালানোর অন্য কোনো উপায় নেই।মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খুলনা মহানগর কমান্ডার মনিরুজ্জামান মনি বলেন, জাতীয় জাদুঘরের তত্ত্বাবধানে সরকারিভাবে গণহত্যা জাদুঘরটি পরিচালনা করা প্রয়োজন। ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু রাজনৈতিক কার্যক্রমের কারণে উদ্যোগটির গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা কমে গিয়েছিল। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরতে জাদুঘরটি দ্রুত চালু করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে আমরা আগের জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তেমন সাড়া পাইনি। নতুন জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলব।খুলনার জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, ‘আমি নতুন এসেছি। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

You might also like