২০২৬ সালে বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা
নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী
ঢাকাঃ অর্থনীতিতে ঝুঁকি একটি স্বাভাবিক বাস্তবতা। তবে আগাম ঝুঁকি চিহ্নিত করা গেলে তার প্রভাব মোকাবিলা করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) মনে করছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হবে অপরাধ ও অবৈধ অর্থনৈতিক তৎপরতা।বুধবার (১৪ জানুয়ারি) প্রকাশিত ডব্লিউইএফ প্রকাশিত গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট-২০২৬-এ বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য পাঁচটি করে প্রধান ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত— যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক আর বিনিয়োগে কঠোর যাচাই-বাছাই। তৃতীয় ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দেশে প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের চতুর্থ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অর্থনৈতিক ধীরগতি। ডব্লিউইএফের মতে, মন্দা কিংবা স্থবিরতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আর পঞ্চম ঝুঁকি হিসেবে রয়েছে ঋণের চাপ— সরকারি, করপোরেট ও পারিবারিক ঋণ।বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের দেশি ও বিদেশি ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জাতীয় বাজেটের বড় একটি অংশ এখন ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে— যা ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
জরিপে উঠে এসেছে ঝুঁকির চিত্র
ডব্লিউইএফের এই প্রতিবেদনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎকারভিত্তিক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডব্লিউইএফের অংশীদার হিসেবে জরিপ পরিচালনা করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, দেশের ১০২টি কোম্পানির নির্বাহী ও উদ্যোক্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই জরিপ করা হয়। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়কালে ৩৪টি সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্য থেকে আগামী দুই বছরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি চিহ্নিত করতে বলা হয়েছিল।তিনি বলেন, তখন দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখেছিলেন— এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ওই সময়ে চাঁদাবাজি, লুটপাট, ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল।তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কিছুটা কমলেও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহারের ঝুঁকি নতুন করে বাড়ছে।নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় অর্থনৈতিক ধীরগতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে বলেও মত তাঁর। বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
গণঅভ্যুত্থান ও আস্থার সংকট
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।এতে বলা হয়েছে, মানুষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। উন্নত জীবনের আশা ফিকে হয়ে যাওয়ায় ক্ষোভ ও বঞ্চনা থেকে এই অভ্যুত্থান ঘটে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈশ্বিক ঝুঁকি বাড়ছে
বৈশ্বিক পরিসরে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত।ডব্লিউইএফ বলছে,নতুন প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।এর পরের ঝুঁকিগুলো হলো— রাষ্ট্রীয় সংঘাত, চরম আবহাওয়া,সামাজিক মেরুকরণ এবং ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ছে। স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি— উভয়ই বেড়েছে। একইসঙ্গে এআই নিয়ে উদ্বেগও তীব্র হচ্ছে।
বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা
ডব্লিউইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শক্তি হারাচ্ছে। পারস্পরিক আস্থা কমে যাচ্ছে, স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনের প্রতি সম্মান দুর্বল হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তে থাকা সুরক্ষাবাদ। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হচ্ছে এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।এই বাস্তবতায় জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কাছে ভূ-অর্থনৈতিক সংঘাত এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন,এ ধরনের জরিপ মূলত কোনো দেশের অর্থনীতির কাঠামো বোঝার জন্য করা হয়।কাঠামো রাতারাতি বদলায় না।তবে বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।উদীয়মান দেশগুলোর ক্ষেত্রে যেখানে একসময় অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জই মুখ্য ছিল,সেখানে এখন সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন