বিনম্র শ্রদ্ধায় শহীদ জননীকে নির্মূল কমিটি নিউইয়র্ক চ্যাপ্টারের স্মরণ

নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী

নিউ ইয়র্ক: ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক শাসক আর যুদ্ধাপরাধীদের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশ যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ঠিক সেই সময় আলোর দিশারির ভূমিকা পালন করেছেন কথা সাহিত্যিক,শিক্ষাবিদ ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক শহীদ জননী জাহানারা ইমাম।২৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধায় এই মহীয়সী নারীকে স্মরণ করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

২৭শে জুন শনিবার বিকাল ৪টায় জুম ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, নিউইয়র্ক চ্যাপ্টার। সংগঠনের সভাপতি শহীদ সন্তান ফাহিম রেজা নূর-এর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক স্বীকৃতি বড়ুয়ার সঞ্চালনায় সভায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ছারাও নিউইয়র্কের অন্যান্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে নেতৃবৃন্দরা অংশগ্রহণ করেন।

জাহানারা ইমামের জীবনের শেষ লগ্নে তার পাশেই ছিলেন নির্মূল কমিটি নিউইয়র্কের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. নুরুন নবী। নিজের লেখা বই ‘জাহানারা ইমামের শেষ দিনগুলি’ থেকে শহীদ জননীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার বার আবেগাপ্লুত হয়ে পরেন ড. নুরুন নবী। তিনি বলেন জাহানারা খালাম্মাকে যখন শেষ বারের মত মিশিগানের এক হাসপাতালে দেখতে যাই, তিনি কাগজে লিখে দেশের কথা জিজ্ঞেস করলেন, আন্দোলনের কথা জানতে চাইলেন। মৃত্যুর পরে তার অবর্তমানে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলন দেশবাসীর উপর অর্পণ করার কথা জানালেন শহীদ জননী। সংগঠনের উপদেষ্টা সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ বলেন ৭৫-এর পর থেকে ৯৬-সাল পর্যন্ত স্বাধীনতা বিরোধীরা নিজেদেরকে যেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল, আমার সেভাবে নিজেদেরকে সুসংগঠিত করতে পারিনি, তাই বঙ্গবন্ধু যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলেছিলেন তা আর হয়ে উঠেনি। সেই দুঃসময়ে শহীদ জননী অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। শহীদ জননীর সেই আন্দোলন আজ কেন জানি ম্লান হয়ে গেছে, আমরা পারছিনা সেই আন্দোলনকে বেগবান করে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে। সংগঠনের উপদেষ্টা শহীদ সন্তান কবি হাসান আল আবদুল্লাহ বলেন যে আদর্শ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের পিতারা মুক্তিযুদ্ধে রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ আজও আমরা দেখতে পাচ্ছি না। যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানেরা আজ আস্ফালন দেখিয়ে কথা বলে। পাঠ্য পুস্তকে আজ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার লেখা উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হেফাজতের প্রেসক্রিপসনে দেশ চালানো হচ্ছে। আমি তাই উদ্বেগ প্রকাশ করছি। তিনি শহীদ জননীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন।

নির্মূল কমিটি সুইজারল্যান্ডের সভাপতি খলিলুর রহমান তার বক্ত্যবে বলেন শহীদ জননীর আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। অতীতে অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে লক্ষ্যে আন্দোলন করতে গিয়ে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনসহ আমাদের অনেক নেতাকর্মী রাজপথে নির্যাতনের স্বীকার হয়েছে, পূর্ণিমারা ধর্ষিত হয়েছে। সেই বাংলাদেশে আজ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার থেকেও আওয়ামী লীগের একাংশ বাহাত্তরের সংবিধানের আলোকে অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশে আদও বিশ্বাস করে কিনা আমার সন্দেহ। আওয়ামী লীগের সেই একাংশ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিকে তাদের প্রতিপক্ষ কেন ভাবেন তা আমার বোধগম্য নয়। বোস্টন থেকে নির্মূল কমিটি নিউ ইংল্যান্ড শাখার সভাপতি মাহফুজুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন মিশিগানে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় যদিও শহীদ জননীর সাথে ফোনে কয়েকবার আলাপ হয়েছিল, উনার সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সাক্ষাৎ না করতে পারার দুঃখটা আমার রয়েই গেল। তিনি শহীদ জননী যে আদর্শ ও উদ্দেশ্য নিয়ে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন সেই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন আজমল তার বক্তব্যে বলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং মহীয়সী নারী জাহানারা ইমামের আদর্শ বাস্তবায়নে জননেত্রী শত প্রতিকূলতার মাঝেও দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। সেই স্বপ্ন ও আদর্শ বাস্তবায়নে সহায়কের ভূমিকা পালন করে জননেত্রীর হাতকে শক্তিশালী করার জন্য সবাইকে তিনি আহ্বান জানান। বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তাহমিনা শহীদ জাহানারা ইমামকে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি গান পরিবেশন করেন। নিউইয়র্কের আর একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শহীদ উদ্দিন তার বক্তব্যে বাহাত্তরের সংবিধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান।

সভায় অন্যান্যদের মাঝে বক্ত্যব রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য যথাক্রমে কণ্ঠযোদ্ধা শহীদ হাসান, সাংবাদিক শীতাংশু গুহ ও সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ, সহসভাপতি অধ্যাপিকা নাজনীন সিমন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রওশন আরা নিপা, প্রমুখ। সর্বশেষে সংগঠনের সভাপতি ফাহিম রেজা নূর বলেন শহীদ জননী যে মশাল জ্বালিয়েছিলেন সেই মশাল আমরা আজও বহন করে চলেছি, ধৈর্য হারা না হয়ে আমাদের পথ চলতে হবে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্ব যে পথ দেখাচ্ছে সেই পথ ধরেই নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক করতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস। তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

You might also like