আড্ডা: স্মৃতি,বন্ধুত্ব আর লড়াইয়ের গল্প

নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী

নিউইয়র্ক: নিউইয়র্কের ব্যস্ত নগরজীবনে একেকটা দিন যেন ছুটে চলে কেবল কাজ আর বেঁচে থাকার হিসাব মেলাতে।কিন্তু হঠাৎ করে কোনো একটি সন্ধ্যা এসে ভিড় জমায় ভিন্ন রঙে—যখন পুরনো সহপাঠী, প্রিয় বন্ধু আর সাথিরা একত্রিত হন।তখন শহরের কোলাহল ছাপিয়ে উঠে আসে স্মৃতি,হাসি,আড্ডা আর অমলিন বন্ধুত্বের আবেগ। ১৭ বুধবার সেপ্টেম্বর ছিল এমনই এক সন্ধ্যা। জ্যাকসন হাইটসের প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা কার্যালয়ে শুরু হওয়া আড্ডা শেষ পর্যন্ত গড়ায় নবান্ন রেস্তোরাঁর উষ্ণ সান্ধ্যভোজে। সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরীর যে কোন আড্ডা আয়োজন এমনিতেই অনন্য হয়ে উঠে। বুধবারের আড্ডা আলোচনাও তেমনি হয়ে উঠে এক অনন্য দ্রুত বলা গল্পের মতো।

আড্ডার সূচনায় ইব্রাহীম চৌধুরী বললেন,“যারা দেশে থেকে দেশের অগ্রযাত্রার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে,তাদের পথটাই কঠিন। আমরা অনেকেই একসময় সেই লড়াইয়ে ছিলাম। পরে কান্ত-শ্রান্ত শরীর নিয়ে প্রবাসে আশ্রয় খুঁজেছি। কিন্তু দেশের ভালোমন্দ এখনও আমাদের ভেতর নাড়া দেয়।

তাঁর কথায় অনেকেই নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কারও চোখে জল, কারও ঠোঁটে বিষণ্ন হাসি। লন্ডন থেকে এসেছেন সাংবাদিক ও সংগঠক সৈয়দ আনাস পাশা—যিনি জন্মভূমির লড়াই থেকে প্রবাসের সংগ্রাম, দুই জায়গাতেই ছিলেন অটল সঙ্গী। দেশ থেকে যোগ দিলেন খন্দকার সিপার আহমেদ—কৈশোরে বিয়ে করা সহপাঠী, আজ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

সঙ্গী হলেন সাবেক ছাত্রনেতা আজাদ উদ্দিন, দীর্ঘ অসুস্থতা কাটিয়ে অনেক দিন পর কোনও আডায় তাঁর উপস্থিতি। ছিলেন আশরাফ কালাম—সফল ব্যবসায়ী, আবার বন্ধুত্বের নির্ভরযোগ্য নাম। আর চল্লিশ বছর পর দেখা হলো মুহিত উদ্দিনের সঙ্গে—একসময় জ্বালানি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা,আজ নিউইয়র্ক প্রবাসী। এমন আড্ডায় কারা কারা ছিলেন, তালিকাটি যেন নিজেই এক কাব্য— আবু তাহের,মনজুরুল হক,মাহবুব রহমান,ভায়লা সালিনা,সৈয়দ ইলিয়াস খসরু,শেলী জামান খান,ফারমিস আখতার, এমডি হেনা সিদ্দিকী,মোঃ বদরুল ইসলাম সোহেল,শজল রওশন,আফরোজা ইসলাম, সৈয়দ উতবা, মোঃ আব্দুল কুদ্দুস,অনির্বাণ খন্দকার,এ কে এস আশরাফ,জ্ঞান রঞ্জন দাশ, মুহিত উদ্দীন আহমেদ,সৈয়দ উতবা,আফরোজা ইসলাম,আবুল কালাম,নুরুল খান, এমদাদ চৌধুরী দীপু,সামিউল সিপন,জাকির হোসেন,মামুন রশীদ চৌধুরী,দীপক কুমার আচার্য্য,বিমান দাশ,শাহ ফরিদ আহমেদ, দিলদার হোসেন প্রমুখ।

কেউ কেউ বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছেন, কারও মাথায় পাকা চুলের ছাপ। তবুও চোখের ঝিলিক আর হৃদয়ের উষ্ণতায় একটুও ভাঁটা পড়েনি।কথার ফাঁকে হঠাৎ হাসির রোল উঠছে, আবার কোনো মুহূর্তে দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসছে।সেই নীরব চাহনিতেও যেন সবাই খুঁজে ফিরছে হারানো মুখ,খুঁজে ফিরছে তরুণ দিনের অজস্র স্বপ্ন।

একজন হেসে বললেন—“বন্ধুরা, মনে হচ্ছে যেন আবার কলেজ ক্যাম্পাসে ফিরে গেছি।” অন্যজন সপ্রতিভ উত্তর দিলেন—“না, আমরা ক্যাম্পাসে ফিরিনি, ক্যাম্পাসকেই এখানে টেনে এনেছি।” নবান্ন রেস্তোরাঁয় সুস্বাদু খাবারের টেবিল ভরে উঠল হাসি-আলাপে। প্রেসক্লাব সভাপতি মনোয়ারুল ইসলামের আপ্যায়নে অতিথিরা যেন আরও এক দফা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলেন। কেউ বললেন—“আড্ডা যদি হয়, তবে তার সাথে ভোজন চাই-ই চাই।আড্ডা আলোচনা ভাষা, সংস্কৃতি আর বন্ধুত্বের বন্ধন প্রবাস জীবনের কঠোর বাস্তবতাকে আলোকিত করে তোলে। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও এই মিলন শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং জীবনের শক্তি,আনন্দ আর আশ্বাসের উৎস। এমন সন্ধ্যা হয়তো বারবার আসে না। কিন্তু একবার এলেই তা থেকে যায় হৃদয়ের গভীরে, স্মৃতির ভাঁজে, ঠিক যেমন থেকে যায় যৌবনের গান।

You might also like