উপমহাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ: একটি কর্মময় জীবনের আলেখ্য

উপমহাদেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও বাম-প্রগতিশীল রাজনীতির প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের আজ ১০৫ তম শুভ জন্মদিন। ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই নির্লোভ ও ত্যাগী রাজনীতিক তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে কেবল একটি আদর্শের নাম নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন।

ভাষা আন্দোলনে রাজপথের যোদ্ধা
অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির এই তরুণ শিক্ষক ছাত্রদের সংগঠিত করতে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে পুরোপুরি জনমানুষের রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ: কূটনীতি ও রণাঙ্গনের সেনানী
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক ও কৌশলগত। প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে ভারত সরকারের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা এবং বিশেষ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে নিরঙ্কুশ সমর্থনে রাজি করাতে তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ছিল অনবদ্য। তাঁর বলিষ্ঠ প্রচেষ্টায় সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়। রণাঙ্গনে তাঁর সরাসরি তত্ত্বাবধানে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ‘বিশেষ গেরিলা বাহিনী’ পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালায়। এছাড়াও ১৯৭১ সালে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বিশ্বনেতৃবৃন্দের সামনে স্বাধীনতার যৌক্তিকতা ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন।

রাজনীতি কোনো পেশা নয়, বরং ‘ব্রত’
রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত কঠোর ও আদর্শিক। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন, “রাজনীতি কোনো পেশা নয়, রাজনীতি হলো ব্রত।” তাঁর মতে, রাজনীতি হবে মানুষের সেবার মাধ্যম, ব্যক্তিগত আখের গোছানোর হাতিয়ার নয়। এই দর্শনের কারণেই ১৯৮৩ সালে তিনি ঢাকার মদনপুরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ’। এটি ছিল মূলত আদর্শিক রাজনীতির এক অনন্য পাঠশালা, যেখানে তরুণ ও রাজনৈতিক কর্মীদের নির্লোভ, দেশপ্রেমিক ও তাত্ত্বিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তোলার দীক্ষা দেওয়া হতো।

ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র তত্ত্ব: এক মৌলিক রাজনৈতিক দর্শন
অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের এক দেশজ ও মানবিক রূপরেখা দিয়েছিলেন, যা তাঁর ‘ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র’ তত্ত্ব হিসেবে পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, এ দেশের মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে ধারণ করেই কর্মসংস্থান ও সামাজিক সমতা ভিত্তিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাঁর এই দর্শন ছিল উগ্রবাদ ও শোষণমুক্ত এক আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন।

সংসদীয় রাজনীতি ও নিরাসক্ত জীবন
১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘কুঁড়েঘর’ প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ ছিল তাঁর সুস্থ ধারার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। ‘সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা’ (১ম ও ২য় খণ্ড), ‘মুক্তির পথ’, ‘কিছু কথা’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের লেখক এই মনীষী ২০১৫ সালে সরকারের দেওয়া সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, কোনো প্রাপ্তির আশায় তিনি রাজনীতি করেননি, করেছিলেন মানুষের মুক্তির জন্য।

উপসংহার
‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ হিসেবে পরিচিত এই বিরলপ্রজ নেতা আমৃত্যু সাধারণ জীবনযাপন করে প্রমাণ করে গেছেন যে, আদর্শ ও সততাই রাজনীতির আসল শক্তি। বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর মতো নির্লোভ ও দূরদর্শী নেতার জীবন দর্শন নতুন প্রজন্মের জন্য হতে পারে শ্রেষ্ঠ পাথেয়। আজকের এই দিনে মহান এই নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, হবিগঞ্জ জেলা ন্যাপ।

You might also like