চাঁদার বিনিময়ে দোকান, মেট্রো স্টেশনে যাত্রীদের চলাচলে ভোগান্তি
নিউজ ডেস্ক
সত্যবাণী
ঢাকাঃ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সন্ধ্যা।রাজধানীর কাওরানবাজার মেট্রো স্টেশনের সিঁড়ির নিচে ভাজাপোড়ার ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে বসেছেন বাদল।প্রতিদিন বিকালের পর থেকেই এখানেই বসে তার ব্যবসা।বাদলের মতো আরও অন্তত ছয়টি দোকান সিঁড়ির সামনেই সারিবদ্ধভাবে বসেছে।দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছেন ক্রেতারা।ফলে স্টেশনে ওঠানামার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।যাত্রীদের অনেককেই ধাক্কাধাক্কি করে সিঁড়ি ব্যবহার করতে হচ্ছে।সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নারী,শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা।অথচ মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ কিংবা সিঁড়ির আশপাশে এ ধরনের দোকান বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।যাত্রী চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারির কথা থাকলেও বাস্তবে তার চিত্র ভিন্ন।শুধু কাওরানবাজার নয়,রাজধানীর প্রায় প্রতিটি মেট্রো স্টেশন ঘিরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ দোকান।কোথাও ঝালমুড়ি, কোথাও ছোলা-ভুট্টা,আবার কোথাও ভাজাপোড়া বিক্রি হচ্ছে।দোকানগুলোর সামনে ক্রেতাদের ভিড়ে স্টেশনে ওঠানামা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।অনেক যাত্রী অভিযোগ করলেও উল্টো দোকানিদের রোষানলে পড়তে হয়।ফলে অধিকাংশই নীরব থাকেন।সম্প্রতি এ পরিস্থিতির প্রতিবাদ জানিয়ে আলোচনায় আসেন সমাজকর্মী সোহানী শিফা। মেট্রো স্টেশনের নিচে হকারদের দখলের প্রতিবাদে তিনি সচিবালয়ের সামনে প্রতীকীভাবে ১০ টাকায় ভাত-ডাল বিক্রি শুরু করেন।পরে পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।স্টেশনজুড়ে হকারের দখলযানজটের নগরী ঢাকায় স্বস্তির পরিবহন হিসেবে পরিচিত মেট্রোরেল।নিয়ম অনুযায়ী স্টেশনের নিচের অংশ যাত্রী চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকার কথা।কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ স্টেশনের নিচেই অস্থায়ী দোকান বসেছে।মেট্রোরেল চালুর পর থেকেই এসব দোকানের সংখ্যা বাড়ছে।এতে যেমন যাত্রী চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে, তেমনি নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।অভিযোগ রয়েছে,এসব দোকান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে।
‘ভাড়া না দিলে বসা যায় না’
মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ স্টেশনের নিচে সবচেয়ে বেশি হকারের উৎপাত বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।তাদের ভাষ্য,তাড়াহুড়ার সময় দোকানের ভিড়ের কারণে দ্রুত চলাচল করা যায় না।আবার ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও থাকে।দোকানিদের দাবি,স্টেশন হওয়ার আগেও তারা ওই এলাকায় ব্যবসা করতেন।মেট্রোরেল চালুর পরও ব্যবসা চালিয়ে যেতে হলে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিতে হয়।স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীরাই নিয়মিত এ টাকা তোলেন।কাওরানবাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে ভ্রাম্যমাণ দোকানি বাদল বলেন,এখানে বসতে প্রতিদিন ১০০ টাকা দিতে হয়।যারা বসেন সবাই টাকা দেন।টাকা না দিলে এখানে বসা যায় না।আরেক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,একটা ছোট দোকান চালাতে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়।স্থানীয় দখলদারদের টাকা না দিয়ে এখানে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।’মিরপুর-১০ স্টেশনের আরেক দোকানির অভিযোগ,এই টাকার ভাগ শুধু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাই নয়,আনসার ও পুলিশ সদস্যরাও পান।তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সব স্টেশনেই একই চিত্র
সরেজমিনে দেখা যায়,কাওরানবাজার,ফার্মগেট,আগারগাঁও,মিরপুর,উত্তরা,সচিবালয় ও মতিঝিলসহ প্রায় সব মেট্রো স্টেশনেই একই চিত্র।মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও বাংলাদেশ সচিবালয় স্টেশনের নিচে সবচেয়ে বেশি দোকান রয়েছে।এর মধ্যে মিরপুর-১০ স্টেশনের দুই পাশের সিঁড়ি,লিফটের নিচ ও আশপাশ মিলিয়ে প্রায় ৩০০ অস্থায়ী দোকান রয়েছে। সচিবালয় ও মিরপুর-১১ স্টেশনের নিচেও শতাধিক দোকান দেখা গেছে।নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগযাত্রী রায়হান খান বলেন,মিরপুর-১০ স্টেশনে নামলেই ভয় লাগে।কয়েক দিন আগে আমার এক বন্ধুর মোবাইল ছিনতাই হয়েছে।স্টেশনের এই ঘিঞ্জি পরিবেশ দ্রুত দূর করা উচিত।তিনি বলেন,আগে শুধু মিরপুর-১০ স্টেশনের নিচে দোকান ছিল।এখন বিভিন্ন স্টেশনেই দোকানের সংখ্যা বাড়ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।আরেক যাত্রী আরাফাত হোসেন বলেন,মেট্রোরেল রাজধানীর সবচেয়ে ভালো গণপরিবহন।কিন্তু স্টেশনের নিচে অস্থায়ী দোকান যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এসব জায়গা হকারমুক্ত রাখা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) পরিচালক (প্রশাসন) এ কে এম খায়রুল আলম বলেন,অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করি।কিন্তু উচ্ছেদের পর আবারও তারা বসে পড়ে।আমরা বিষয়টি নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি।’তিনি দাবি করেন,আগের তুলনায় ভ্রাম্যমাণ দোকানের সংখ্যা কিছুটা কমেছে।ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন,আমরা মূলত সড়কের শৃঙ্খলা দেখি।মেট্রো স্টেশনের নিচের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের।তারপরও প্রয়োজন হলে আমরা ভ্রাম্যমাণ দোকান উচ্ছেদে সহযোগিতা করি।তবে উচ্ছেদের পর তারা আবার বসে।সূত্র: বাংলাট্রিবিউন